উন্নয়নের পথে SIR বাধা? নবান্নের পাল্টা ২৩ আধিকারিকের ‘স্পেশাল মনিটরিং স্কোয়াড’
মুখ্যসচিবের স্বাক্ষর করা নির্দেশ অনুযায়ী, কোন আইএএস কোন জেলায় যাবেন তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) চলছে পুরোদমে। সাধারণত নির্বাচনের প্রাক্কালে এই ধরনের প্রশাসনিক ব্যস্ততায় সরকারি উন্নয়নমূলক প্রকল্পের গতি কিছুটা শ্লথ হয়ে পড়ে। তবে এবার সেই প্রথা ভেঙে কড়া পদক্ষেপ নিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোট প্রস্তুতি এবং উন্নয়ন- দুটি কাজকেই সমান্তরালভাবে সচল রাখতে রাজ্যের ২৩টি জেলা এবং কলকাতা পৌরনিগম এলাকার জন্য একঝাঁক সিনিয়র আইএএস অফিসারকে বিশেষ পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ করল রাজ্য সরকার।

নবান্নের নির্দেশিকা
এসআইআর-এর চাপে যাতে জনমুখী প্রকল্পের কাজ ব্যাহত না হয়, তার জন্য আগেই ডিএম-সহ জেলাস্তরের আধিকারিকদের আগেই সতর্ক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার নবান্নে ‘উন্নয়নের পাঁচালি’ প্রকাশ করে সেই বক্তব্য আরও স্পষ্ট করে দেন তিনি। মুখ্যসচিব মনোজ পন্থকে নির্দেশ দেন, এর জন্য শীর্ষ আধিকারিকদের বিশেষ দল গড়ে দেওয়ার। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশের পর বুধবারই রাজ্যের মুখ্যসচিবের দফতর থেকে একটি নির্দেশিকা জারি করা হয়। মুখ্যসচিবের স্বাক্ষর করা সেই নির্দেশ অনুযায়ী, কোন আইএএস কোন জেলায় যাবেন তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মুখ্যসচিব ওই নির্দেশ জানিয়েছেন, বাংলার বাড়ি প্রকল্পের যে কাজ চলছে, পথশ্রী ও রাস্তাশ্রী প্রকল্প বাস্তবায়িত করা, আমাদের পাড়া আমাদের সমাধানের অধীনে পরিচালিত কাজ তদারকি করার লক্ষ্যে এবং জনসাধারণের অভিযোগের প্রতিকার পর্যবেক্ষণের জন্য, রাজ্য সরকারের সিনিয়র অফিসারদের জেলাগুলিতে মোতায়েন করা হচ্ছে।
জেলায় গিয়ে এই অফিসাররা কী করবেন, সে বিষয়েও মুখ্যসচিব দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। মনোজ পন্থের নির্দেশ, সিনিয়র আমলারা জেলাগুলি পরিদর্শন করবেন এবং নির্ধারিত জেলার জেলাশাসকদের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবেন। প্রকল্পগুলির কাজ নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করবেন। কোথাও প্রকল্পে দেরি হলে বা মানুষের কোনও অভিযোগ থাকলে তার দ্রুত এবং নিশ্চিত সমাধান করবেন। জনঅভিযোগের নিষ্পত্তি যাতে সঠিক সময়ে ও যথাযথভাবে হয়, তার জন্য বিশেষভাবে নজর রাখতে হবে। প্রয়োজনে নবান্নে ফিডব্যাক, রিপোর্ট ও সুপারিশও পাঠাবেন এই শীর্ষ আধিকারিকরা।
জেলায় দায়িত্ব বন্টন
নবান্নের তালিকা অনুযায়ী রাজ্যের বরিষ্ঠ এবং অভিজ্ঞ আইএএস অফিসারদের বিভিন্ন জেলার দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপ্রাপ্তদের তালিকা-
কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকা: কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের দায়িত্বে রয়েছেন শান্তনু বসু। হাওড়ার দায়িত্ব পেয়েছেন অন্তরা আচার্য এবং হুগলির দায়িত্বে ওঙ্কার সিং মিনা।
প্রেসিডেন্সি বিভাগ: উত্তর ২৪ পরগনার দায়িত্ব সামলাবেন পারভেজ আহমেদ সিদ্দিকি এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার দায়িত্বে রয়েছেন নারায়ণ স্বরূপ নিগম। নদিয়ার দায়িত্ব পেয়েছেন রাজেশ পাণ্ডে।
মেদিনীপুর ও জঙ্গলমহল: পশ্চিম মেদিনীপুরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মণীশ জৈনকে, পূর্ব মেদিনীপুরের দায়িত্বে বিনোদ কুমার। এছাড়া পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার দায়িত্ব সামলাবেন যথাক্রমে সঞ্জয় বানসাল ও ডঃ রশ্মি কমল। ঝাড়গ্রামে থাকবেন ছোটেন ডি লামা।
বর্ধমান-মুর্শিদাবাদ ও বীরভূম: মুর্শিদাবাদের দায়িত্ব পেয়েছেন পি বি সেলিম। বীরভূমে থাকবেন শরদকুমার দ্বিবেদী। পূর্ব বর্ধমানে দায়িত্বে রয়েছেন বন্দনা যাদব এবং পশ্চিম বর্ধমানে বরুণকুমার রায়।
উত্তরবঙ্গ: দার্জিলিং জেলার তদারকিতে থাকবেন মৌমিতা গোদারা বসু, কোচবিহারের দায়িত্বে রাজেশ কুমার সিনহা এবং মালদহের দায়িত্বে রয়েছেন ডঃ পি উলগানাথান। কালিম্পং-র দায়িত্ব পেয়েছেন সৌমিত্র মোহন। উত্তর দিনাজপুরে থাকবেন শুভাঞ্জন দাস এবং দক্ষিণ দিনাজপুরে সুরেন্দ্র গুপ্ত। আলিপুরদুয়ারে রয়েছেন কৌশিক ভট্টাচার্য, জলপাইগুড়িতে দুষ্মন্ত নারিয়াল।
এছাড়াও আরও ১৪ জনের একটি টিম গঠন করা হয়েছে যাঁরা ওই আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলে রিপোর্ট দেবেন মুখ্যমন্ত্রীকে।
প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য
প্রশাসনিক মহলের মতে, সামনের বছরই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। তার আগে দ্রুত সরকারি প্রকল্পগুলির কাজ সেরে ফেলতে চায় রাজ্য সরকার। এ বিষয়ে কোনও দীর্ঘসূত্রতা চান না মুখ্যমন্ত্রী। মঙ্গলবারই মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, যাঁরা দ্রুত ও ভালো কাজ করবেন, তাঁদের পুরস্কৃত করবে রাজ্য সরকার। এই মুহূর্তের রাজ্য রাজনীতি ও প্রশাসনের প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ঘটনাচক্রে, ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজের (এসআইআর) তদারকির জন্য জাতীয় নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই ১২ জন আইএএস অফিসারকে বিভিন্ন জেলার দায়িত্ব দিয়েছে। তাঁরাও সমান্তরালভাবে জেলাশাসকদের সঙ্গে কথা বলছেন এবং সাধারণের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। প্রশাসনিক মহলের মতে, দুটি ভিন্ন কাজের জন্য- একদিকে নির্বাচন কমিশনের ভোট প্রস্তুতি এবং অন্যদিকে নবান্নের উন্নয়ন যজ্ঞ, এত বিপুল সংখ্যক অফিসারের নিয়োগ ‘অর্থবহ’। এর মাধ্যমে রাজ্য সরকার স্পষ্ট বার্তা দিল যে, ভোটের প্রস্তুতির অজুহাতে উন্নয়নমূলক কাজ ফেলে রাখা যাবে না।












