বেপাত্তা হাফিজ সইদ! পাকিস্তানের নির্ভরযোগ্য ছায়া জঙ্গি সংগঠনে ভাঙন, দক্ষিণ এশিয়ার...
লস্কর ক্যাডাররা মনে করে, পাকিস্তানি সংস্থাগুলি চিন ও পশ্চিমী শক্তির স্বার্থরক্ষায় অতিরিক্ত ঝুঁকছে।
জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তইবার অন্দরে বড়সড় ফাটল দেখা দিয়েছে। এমনটাই অনুমান ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলির। যার জেরে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আরও অশান্ত হয়ে উঠতে পারে। বছরের পর বছর ধরে পাকিস্তানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ছায়া-জঙ্গি সংগঠন হিসেবে রয়েছে লস্কর। তবে এতদিন এই সংগঠনের ভিতরে বিদ্রোহের নজির প্রায় ছিল না বললেই চলে।

গোয়েন্দা সূত্রে খবর, লস্কর এতদিন পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই ও সে দেশের সেনাবাহিনীর নির্দেশ মেনেই কাজ করছে। তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনও দিন দ্বিমত পোষণও করেনি এই জঙ্গি সংগঠনটি। তবে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক আধিকারিক জানিয়েছেন, লস্করের ভিতরে প্রবল সমস্যা শুরু হয়েছে এবং সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত ঘিরে জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অপারেশন সিঁদুর ছিল পরিস্থিতির মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। ভারতের এই অভিযানে লস্করের বিপুল পরিকাঠামো ধ্বংস হয়। এরপর সংগঠনের পুনর্গঠন কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্যাডারের মধ্যেই ধারণা তৈরি হয় যে পাকিস্তান সেনা ও আইএসআই তাদের যথাযথ সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। যদিও আইএসআই সাময়িকভাবে অভ্যন্তরীণ মতভেদ মেটাতে পেরেছিল এবং পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান সেনা ও আইএসআই লস্করকে তালিবান, তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান এবং বালুচিস্তান ন্যাশনালিস্ট আর্মির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিতেই অধিকাংশ ক্যাডারই ক্ষুব্ধ হয়।
গোয়েন্দাদের দাবি, লস্কর ক্যাডাররা মনে করে, পাকিস্তানি সংস্থাগুলি চিন ও পশ্চিমী শক্তির স্বার্থরক্ষায় অতিরিক্ত ঝুঁকছে। বিশেষ করে বালুচিস্তানের দুষ্প্রাপ্য খনিজ সম্পদ ঘিরে চিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়েরই আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে। অন্যদিকে, টিটিপি ও বিএলএ বালুচিস্তান এবং খাইবার পাখতুনখোয়া অঞ্চলে পাক সেনার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে পাক সেনাবাহিনী ইসলামিক স্টেট অব খোরাসান প্রদেশ (আইএসকেপি)-কে টেনে এনে লস্করের সঙ্গে জোটে যুক্ত করেছে বলে দাবি। এই আবহে লস্করের নেতৃত্ব প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে- চিন ও পশ্চিমের স্বার্থ রক্ষার জন্য কেন নিজেদের লোকদের বিরুদ্ধেই লড়াই করতে হবে? আরও বড় সমস্যা হল, লস্কর ও আইএসকেপি আদর্শগতভাবে স্বাভাবিক বন্ধু নয়। আইএসকেপিকে তারা আফগান তালিবানের শত্রু হিসেবেই দেখে। গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, লস্কর বরাবরই তালিবানপন্থী। ফলে পাকিস্তান সেনা যখন আফগানিস্তানে তালিবানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে, তখন তা সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে।
পাকিস্তান বিশ্লেষকরা বলছেন, আগে যা ছিল গোপনে, এখন তা প্রকাশ্য অসন্তোষে রূপ নিচ্ছে। জঙ্গি সংগঠনের নেতৃত্ব তাদের ক্যাডারদের বোঝাতে পারছে না, কেন তাদের নিজেদের লোকের বিরুদ্ধেই লড়াই করতে হচ্ছে। ক্যাডারদের একাংশের স্পষ্ট মত, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কেবল ভারত ও পশ্চিমী শক্তির বিরুদ্ধেই লড়াই করা উচিত। সম্প্রতি লস্কর কমান্ডার মহম্মদ আশফাক রানার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। সেখানে তাকে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দিতে দেখা গিয়েছে। তার অভিযোগ, পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ডমার্শাল আসিম মুনির লস্করকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। ভিডিওতে রানা বলেছে, একদিকে সরকার তাদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে, অন্যদিকে গোটা দেশকে অর্থনৈতিক ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ঋণে জর্জরিত পাকিস্তানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে সে বলে, ধার করা টাকার অর্ধেকও যদি লুট না হয়ে সঠিকভাবে ব্যবহার হতো, তবে দেশ আজ অনেক সমৃদ্ধ হতে পারত।
গোয়েন্দাদের মতে, এই সব ঘটনাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে লস্করের একাংশের সঙ্গে পাক সরকারের সম্পর্কে ফাটল দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে হাফিজ সইদকে প্রকাশ্যে খুব কম দেখা যাওয়াও পরিস্থিতি যে স্বাভাবিক নয়, তা ইঙ্গিত করছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যদি লস্কর-ই-তইবা প্রকাশ্যে বিদ্রোহের পথে হাঁটে, তবে তা পাকিস্তানের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সংগঠনটির জঙ্গিরা অত্যন্ত সেনা-ঘনিষ্ঠ এবং অতীতে তাদের বিদ্রোহের নজির প্রায় নেই। তারা যদি টিটিপি-এর মতো গোষ্ঠীতে যোগ দেয়, তবে পাক প্রতিষ্ঠানের ভিত নড়ে যেতে পারে। যদি পাকিস্তানে হিংসা আরও বাড়ে এবং জঙ্গি সংগঠনগুলি স্বাধীনভাবে কাজ শুরু করে, তবে তা গোটা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা। একই ধরনের ভাঙনের ধারা ভবিষ্যতে জইশ-ই-মহম্মদ-এর মধ্যেও দেখা যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
E-Paper











