প্রজাতন্ত্র দিবসের পাঠ ছেঁড়া খাতায়! নোংরা কাগজে মধ্যাহ্নভোজ পড়ুয়াদের, মধ্যপ্রদেশে হুলুস্থূল
সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী, ২৬ জানুয়ারি সরকারি স্কুলে বিশেষ মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। পড়ুয়ারা মাটিতে বসে খেতে বাধ্য হয়।
প্রজাতন্ত্র দিবস মানে শিশুদের কাছে মর্যাদা, সমতা আর সংবিধানের গর্বের পাঠ। কিন্তু মধ্যপ্রদেশের মাইহার জেলার ভাটিগাওয়ান গ্রামের এক সরকারি স্কুলে সেই পাঠ পড়ানো হল ছেঁড়া খাতার পাতায়। দেশের ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে ওই স্কুলে বিশেষ মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে দেখা যায়, থালা নয় পুরনো বই-খাতার ময়লা পাতার উপরই পরিবেশন করা হয় পুরি-হালুয়া। আর সেই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই হইচই শুরু হয়েছে।

সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী, ২৬ জানুয়ারি সরকারি স্কুলে বিশেষ মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। পড়ুয়ারা মাটিতে বসে খেতে বাধ্য হয়। কিন্তু থালা বা কলাপাতার বদলে তাদের সামনে পাতা হয় কালি-দাগ লেগে থাকা, ধুলো-ময়লা ধরা কাগজের টুকরো। গরম খাবার সরাসরি সেই পাতার উপর ঢেলে দেওয়া হয়। এ ঘটনা আরও গুরুতর, তার কারণ পড়ুয়াদের সংখ্যার ভিত্তিতে থালা কেনার জন্য অর্থ আগেই বরাদ্দ হয়েছিল। তা সত্ত্বেও প্রজাতন্ত্র দিবসে একটি থালাও চোখে পড়েনি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ছাপা বা লেখা কাগজে খাবার পরিবেশন অত্যন্ত বিপজ্জনক। প্রিন্টিং ইঙ্কে সিসা-সহ ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে, যা গরম খাবারের সঙ্গে মিশে শিশুদের স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষত হালুয়ার মতো গরম ও আর্দ্র খাবারে। অন্যদিকে, ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই অভিভাবক ও গ্রামবাসীদের মধ্যে ক্ষোভ বহিঃপ্রকাশ ঘটে। শিক্ষা দফতরের নজরদারির মধ্যেই কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তাঁরা।
এই ঘটনায় প্রতিক্রিয়া দিয়ে শীর্ষ আধিকারিক বিষ্ণু ত্রিপাঠী জানান, ভিডিওটি তাঁর নজরে এসেছে। ব্লক রিসোর্স কো-অর্ডিনেটরকে স্কুলে গিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে দোষীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি। তবে মাইহারের ঘটনাকে আরও অস্বস্তিকর করে তুলেছে সরকারি তথ্যের ফাঁকফোকর। প্রধানমন্ত্রী পোষণ শক্তি নির্মাণ (পিএম পোষণ) প্রকল্পে নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিদিনের মধ্যাহ্নভোজের তথ্য আপলোড করার কথা। ২৬ জানুয়ারির নথি বলছে, মধ্যপ্রদেশের ৮৮,২৮১টি স্কুলের মধ্যে মাত্র ৬৬,৩১৫টি অর্থাৎ ৭৫.১২ শতাংশ সেদিন তথ্য জমা দিয়েছে। ২১,৯৬৬টি স্কুল কোনও তথ্যই দেয়নি। যে তথ্য জমা পড়েছে, তাতে দাবি করা হয়েছে যে সারা রাজ্যে ওই দিন ৩৬,২৮,০৬১টি খাবার পরিবেশন করা হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, মধ্যপ্রদেশে জেলা সংখ্যা এখন ৫৫ হলেও পিএম পোষণ-এর ডেটায় এখনও ৫২টি জেলার হিসেবই দেখানো হচ্ছে। মাইহার জেলার নামই নেই সরকারি নথিতে। অর্থাৎ, যেদিন মাইহারের শিশুরা ছেঁড়া খাতার পাতায় খাবার খেতে বাধ্য হয়েছে, সেদিন সরকারি পরিসংখ্যানে সেই জেলার অস্তিত্বই ধরা পড়েনি। নজরদারির ব্যর্থতা আর তথ্যের এই অনুপস্থিতি নতুন করে প্রশ্ন তুলছে, তাহলে কত এমন ঘটনা রয়েছে যা নথিভুক্তই হয় না?
গত বছর শেওপুর জেলার বিজয়পুর ব্লকের হুলপুর গ্রামেও প্রায় একই ছবি সামনে এসেছিল। ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গিয়েছিল, মাটিতে বসে ছেঁড়া কাগজের উপর রুটি-তরকারি খাচ্ছে শিশুরা। পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন শিক্ষকরা, নীরব দর্শকের ভূমিকায়। ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তেহারে শাসকদল বিজেপি মিড-ডে মিলের মানোন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। পঞ্চায়েত, নারী ও শিশু উন্নয়ন এবং স্কুল শিক্ষা দফতর পুষ্টিকর খাবার ও টেট্রা-প্যাক দুধ দেওয়ার প্রস্তাবও আলোচনা করেছিল। কিন্তু হুলপুরের পর মাইহারের ছবি সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করছে, যেখানে বহু শিশুর কাছে পরিষ্কার থালায় খাবার খাওয়াটাই আজও অধরা স্বপ্ন।
E-Paper











