'পুলিশ আমাকে নীরব...,' নয়ডার ইঞ্জিনিয়ারের মৃত্যুতে নয়া মোড়, বিস্ফোরক প্রত্যক্ষদর্শী
নয়ডা অথরিটির এক আধিকারিক জানিয়েছেন, তিনি এমন কোনও চিঠির অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগতই নন।
ঘরে ফিরছিলেন। বাড়ির অনতিদূরেই নয়ডার সেক্টর ১৫০-তে জলভরা গর্তে গাড়ি পড়ে যান সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার যুবরাজ মেহতা। অনেক ডাকাডাকি করেন। আর্ত চিৎকার যদিও রাতের অন্ধকারে পৌঁছয়নি কারও কানে। যখন পৌঁছয়। ততক্ষণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন তিনি। যুবরাজের মৃত্যু ঘিরে নাগরিক সুরক্ষা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। প্রশাসনিক তো বটেই রাজনৈতিক দিক থেকেও এই ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে উত্তরপ্রদেশ প্রশাসনের কাছে। তার উপরে সামনে এসেছে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এক ডেলিভারি এজেন্টের বয়ান।

শনিবার রাতে যুবরাজ মেহতা গুরগাঁওয়ের অফিস থেকে গ্রেটার নয়ডার সেক্টর ১৫০-এর টাটা ইউরেকা পার্কে নিজের বাড়িতে ফিরছিলেন। সেই সময়ে তাঁর দ্রুতগতির গ্র্যান্ড ভিটারা গাড়িটি একটি জলভর্তি গর্তে পড়ে যায়। বারবার সাহায্যের জন্য চিৎকার করা সত্ত্বেও এবং তাঁর বাবা রাজকুমার মেহতার উপস্থিতিতে দীর্ঘক্ষণ উদ্ধার অভিযান চালানো হলেও ওই ইঞ্জিনিয়ার ডুবে মারা যান। এই ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন ওই ডেলিভারি এজেন্ট। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ আধিকারিকরা তাঁকে ১০ দিন সংবাদমাধ্যম থেকে দূরে থাকার জন্য চাপ দিয়েছিল। পাশাপাশি, যুবরাজ মেহতার মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে সামনে এল প্রশাসনিক গাফিলতির ছবি। জানা যাচ্ছে, এই দুর্ঘটনার প্রায় তিন বছর আগেই উত্তরপ্রদেশ সেচ দফতর নয়ডা অথরিটিকে লিখিতভাবে সতর্ক করেছিল। ওই চিঠিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল, গর্তে জল জমার সমস্যা রুখতে জরুরি ভিত্তিতে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা দরকার। কিন্তু সেই চিঠি ফাইলের মধ্যেই হারিয়ে যায়। প্রকল্পও আর বাস্তবায়িত হয়নি।
সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের মৃত্যু ও চমকপ্রদ তথ্য
কী ঘটেছিল?
গত শনিবার ভোরে ঘন কুয়াশার মধ্যে নিজের আবাসনের দিকে মোড় নিতে গিয়ে যুবরাজের গ্র্যান্ড ভিটারাটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গভীর গর্তে পড়ে যায়। রাস্তা ও গর্তের মাঝখানে একটি নর্দমা ও দু’টি ব্যারিকেড থাকলেও, গাড়িটি সেগুলি টপকে বা ভেঙে জলভরা গর্তে পড়ে বলে পুলিশের অনুমান। সাঁতার না জানা যুবরাজ প্রায় দেড় ঘণ্টা জীবিত ছিলেন। ফোন পেয়ে প্রথমে ঘটনাস্থলে পৌঁছন তাঁর বাবা। পরে পুলিশ, দমকল ও এসডিআরএফ আসে। কিন্তু ঘন কুয়াশার কারণে তল্লাশি ব্যাহত হয় এবং শেষ পর্যন্ত যুবরাজের মৃত্যু হয়।
গাড়ি উদ্ধার
উত্তরপ্রদেশের নয়ডার সেক্টর ১৫০-এ তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী যুবরাজ মেহতার মৃত্যুর তিন দিন পর রাস্তার পাশে থাকা ওই গভীর গর্ত থেকে তাঁর গাড়িটি উদ্ধার করে পুলিশ। মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা নাগাদ প্রায় ১২ জন গাড়িটিকে উদ্ধার করেন। গৌতম বুদ্ধ নগরের চিফ ফায়ার অফিসার প্রদীপ কুমার সংবাদসংস্থা পিটিআইকে জানান, এনডিআরএফ, এসডিআরএফ, স্থানীয় পুলিশ এবং দমকল বিভাগ এই উদ্ধার অভিযানে যুক্ত ছিল। দুপুর আড়াইটে নাগাদ মৃত যুবরাজের ব্যবহৃত গাড়িটির হদিস পাওয়া যায়। এরপর শুরু হয় উদ্ধারকাজ। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার রাজীব মিশ্র জানান, রাজ্যে পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দলের (সিট) প্রধান ভানু ভাস্কর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এদিকে, যুবরাজ মেহতার মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছে নির্মাণকারী সংস্থার এক কর্তাকে। নয়ডা পুলিশ জানিয়েছে, উইশটাউন প্ল্যানার্স প্রাইভেট লিমিটেডের অন্যতম মালিক অভয় কুমারকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান
প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে নয়ডায় গর্তে পড়ে যাওয়া যুবককে উদ্ধারের চেষ্টা করেছিল পুলিশ, দমকল এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। তাদের সঙ্গেই সেখানে ছিলেন ডেলিভারি এজেন্ট মনিন্দর। পুলিশ, দমকল কর্মীরা যখন গভীর গর্তে নামতে চাননি বলে যুবকের পরিবারের অভিযোগ, তখন কোমড়ে দড়ি বেঁধে সেখানে নেমে পড়েছিলেন মনিন্দর। যদিও ততক্ষণে সব শেষ। গোটা ঘটনায় তিনি আঙুল তুলেছেন পুলিশ, দমকল এবং প্রশাসনের দিকে। তাঁর অভিযোগ, প্রশাসনের ‘সদিচ্ছা’ থাকলে যুবরাজ মেহতাকে বাঁচানো যেত। তিনি জানিয়েছেন, ওই রাতে গর্তে নামতে অনীহা ছিল পুলিশ এবং দমকলকর্মীদের। যখন তিনি বুঝতে পারেন, যুবরাজের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, তখন তিনি সেই গর্তে নেমে যান। যদিও ততক্ষণে ইঞ্জিনিয়ার যুবকের শরীরে আর প্রাণ ছিল না।
পুলিশের চাপ
নয়ডার নয়ডার সেক্টর ১৫০-এর বাসিন্দা এবং ডেলিভারি এজেন্ট অভিযোগ করেছেন, পুলিশ তাঁকে কয়েকদিন সংবাদমাধ্যমের থেকে দূরে থাকতে বলেছে। তাঁর কথায়, 'আমাকে থানায় ডেকে পাঠানো হয় এবং তারা আমাকে একটি স্ক্রিপ্ট ধরিয়ে দেয় এবং জোর করে আমার একটি ভিডিও রেকর্ড করে। মনিন্দর সিং এইচটি-কে বলেন, 'আমাকে সাড়ে চার ঘন্টারও বেশি সময় ধরে থানার কাছে একটি পার্কে বসিয়ে রাখা হয়েছিল।'
প্রশাসনের গাফিলতি ও চিঠি
২০২৩ সালে সেচ দফতর নয়ডা অথরিটিকে চিঠি দিয়ে জানায়, সংশ্লিষ্ট গর্তে ‘হেড রেগুলেটর’ বসানো প্রয়োজন। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে অতিরিক্ত বৃষ্টির জল ও নিকাশি জল নিয়ন্ত্রিতভাবে হিন্দন নদীতে পাঠানো যেত। হেড রেগুলেটর মূলত জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে এবং নিকাশি বা খালে পলি জমা রোধ করে। চিঠিতে আরও উল্লেখ ছিল, প্রস্তাবিত কাজের জন্য বাজেটের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই চিঠি গুরুত্বই পায়নি। নয়ডা অথরিটির এক আধিকারিক জানিয়েছেন, তিনি এমন কোনও চিঠির অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগতই নন। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, যে বেসমেন্টে যুবরাজের গাড়ি পড়ে যায়, সেখানে জল জমার কারণ শুধু বৃষ্টি নয়। আশপাশের আবাসন প্রকল্পগুলির সঙ্গে যুক্ত নিকাশি নালা থেকেও জল এসে সেখানে জমছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা যুবরাজের মৃত্যুর পর প্রতিবাদ মিছিলে দাবি তুলেছেন, প্রস্তাবিত হেড রেগুলেটর বসানো হলে এই জল জমার পরিস্থিতি তৈরি হত না।
E-Paper











