হচ্ছেটা কী! রবিবার পরপর ভূমিকম্পে কাঁপল ভারতের দুই প্রতিবেশী দেশ
রবিবার ভূমিকম্পের ঠেলায় নাজেহাল ভারতের দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র-আফগানিস্তান ও মায়ানমার।
প্রকৃতির রোষানলে বিপর্যস্ত মায়ানমার এবং আফগানিস্তান। গত ২৪ ঘণ্টায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে ভারতের দুই প্রতিবেশী দেশ। রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা যথেষ্ট বেশি হওয়ায় প্রাণহানি ও ঘরবাড়ি ধ্বংসের খবর পাওয়া যাচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্ধারকাজ শুরু হলেও দুর্গম এলাকা হওয়ায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেগ পেতে হচ্ছে।

গত কয়েক দিনে আফগানিস্তানের হিন্দুকুশ পর্বতমালা সংলগ্ন ভূখণ্ড বারবার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে। ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি (NCS) এবং রেড ক্রসের রিপোর্ট অনুযায়ী, ধারাবাহিক এই কম্পনগুলি আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজির তথ্য অনুযায়ী, রবিবার সকালে যে কম্পন হয়েছে রিখটার স্কেলে তার মাত্রা ছিল ৪.২। স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ০৮ মিনিটে মাটির ৯৬ কিলোমিটার গভীরে এই কম্পন অনুভূত হয়। এর আগে গত ১৪ই জানুয়ারিও ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল আফগানিস্তান।
গভীর বনাম অগভীর ভূমিকম্পের বিপদ: বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের গভীরতা (Depth) এর ধ্বংসক্ষমতা নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করে। অগভীর ভূমিকম্প (Shallow Earthquakes) সাধারণত মাটির গভীরে হওয়া কম্পনের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক। এর কারণ হলো: ১. ভূমিকম্পের উৎস মাটির কাছাকাছি হওয়ায় সিসমিক তরঙ্গগুলিকে ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে কম দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়। ২. এর ফলে মাটির কম্পন অনেক বেশি তীব্র হয় এবং ঘরবাড়ি বা পরিকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি বেশি ঘটে। যদিও সাম্প্রতিক এই দুটি কম্পন মাটির বেশ গভীরে (৯০-৯৬ কিমি) ছিল, কিন্তু ধারাবাহিক কম্পনের ফলে পুরোনো স্থাপত্যের স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে।
কেন বারবার কাঁপছে আফগানিস্তান? আফগানিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থানই এর প্রধান কারণ। দেশটি ইন্ডিয়ান প্লেট এবং ইউরেশিয়ান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ক্রমাগত এই প্লেট দুটির সংঘর্ষের ফলে হিন্দুকুশ অঞ্চলে প্রবল চাপের সৃষ্টি হয়। এছাড়া হেরাতসহ দেশের একাধিক অংশের নিচে বড় ধরণের চ্যুতিরেখা রয়েছে, যা আফগানিস্তানকে একটি উচ্চ মাত্রার ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে পরিণত করেছে।
ইউনাইটেড নেশনস অফিস ফর দ্য কোঅর্ডিনেশন অফ হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যাফেয়ার্স (UNOCHA) জানিয়েছে যে, আফগানিস্তান বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। দশকের পর দশক ধরে চলা যুদ্ধ এবং অনুন্নত পরিকাঠামোর কারণে ভূমিকম্প, ভূমিধস বা ঋতুগত বন্যার মোকাবিলা করার মতো সক্ষমতা ও সহনশীলতা এই দেশের মানুষের খুব কম। বারবার ফিরে আসা এই কম্পনগুলি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে।
আফগানিস্তানের ভৌগোলিক অস্থিরতা কেবল সে দেশের সমস্যা নয়, বরং গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য উদ্বেগের কারণ। আন্তর্জাতিক মহলের মতে, এই ধরণের দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় পরিকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার উন্নতি না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় প্রাণহানির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
ওদিকে রবিবার ভোরে মায়ানমারে একটি মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি (NCS) জানিয়েছে, ভারতীয় সময় ভোর ৪টে ৫২ মিনিটে এই কম্পন অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৩.৫।
NCS-এর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট (X) অনুযায়ী, এই ভূমিকম্পের উৎসস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার গভীরে। ভূমিকম্পটির অবস্থান ছিল ২৩.৭০ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯৩.৭৯ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। মায়ানমারের এই অঞ্চলটি ভারত-মায়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ার কারণে সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় মৃদু কম্পন অনুভূত হয়ে থাকতে পারে।
ক্ষয়ক্ষতির খবর: ভূমিকম্পের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় এবং এর উৎসস্থল মাটির গভীরে হওয়ায় এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল।
উল্লেখ্য, গত কয়েক দিনে এই অঞ্চলে একাধিকবার ছোট ও মাঝারি মাপের কম্পন অনুভূত হয়েছে। এর আগে ১৫ জানুয়ারি মায়ানমারে ৩.৩ এবং ৪.৮ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প হয়েছিল। ভূ-তত্ত্ববিদদের মতে, এই অঞ্চলটি সিসমিক জোন হিসেবে অত্যন্ত সক্রিয়, তাই বারবার এই ধরণের কম্পন অনুভূত হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
E-Paper











