‘লম্বা সুইডিশ ব্লন্ড’ প্রস্তাব! যৌন অপরাধী ডায়রিতে অনিল আম্বানির নাম, বাড়ছে রহস্য
২০১৯ সালের মে মাসে অনিল আম্বানি নিউ ইয়র্কে যাওয়ার কথা জানালে জেফ্রি এপস্টিন তাঁকে আমন্ত্রণ করেন।
মার্কিন অর্থলগ্নিকারী ও দণ্ডিত যৌন অপরাধী প্রয়াত জেফ্রি এপস্টিনের ফাইল থেকে পাওয়া নথিতে উঠে এসেছে ভারতের শিল্পপতি অনিল আম্বানির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের যোগাযোগের বিস্তারিত বিবরণ। মার্কিন বিচার বিভাগ (ডিওজে) প্রকাশিত নতুন নথিতে দেখা যায়,অনিল আম্বানির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে এপস্টিন বছরের পর বছর চেষ্টা করেছেন।

নথি অনুযায়ী, ২০১৭ সালের শুরু থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তাঁদের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে। এই যোগাযোগের মাত্র কয়েক মাস পরেই যৌন পাচারের অভিযোগে ফেডারেল প্রসিকিউটররা এপস্টিনকে অভিযুক্ত করেন। এই সময়ে তাঁরা বিশ্ব পরিস্থিতি, ব্যবসা এবং মহিলা নিয়ে আলোচনা এবং সরাসরি দেখা করার পরিকল্পনাও করেছেন। ২০১৭ সালে এপস্টিন আম্বানি পরিবার সম্পর্কে বেশ কয়েকটি বইয়ের অর্ডারও দিয়েছিলেন। ২০১৭ সালের ৯ মার্চের এক বার্তায় অনিল আম্বানি এপস্টিনকে লেখেন, 'তুমি কাকে সাজেস্ট করো?' এর জবাবে এপস্টিন লেখেন, 'একজন লম্বা সুইডিশ স্বর্ণকেশী (ব্লন্ড) নারী, যাতে তোমার সফরটা আনন্দদায়ক হয়।' এর ২০ সেকেন্ডেরও কম সময়ের মধ্যে আম্বানি জবাব দেন, 'ব্যবস্থা করো।' আম্বানির সঙ্গে কথোপকথনে এপস্টিন তার নারীদের পছন্দ সম্পর্কেও জানতে চান। এপস্টিন লেখেন, 'কোন অভিনেত্রী বা মডেল কী তোমার পছন্দের তালিকায় আছে? আশা করি মেরিল স্ট্রিপ নয়। তাহলে আমি কোনও সাহায্য করতে পারব না।' জবাবে আম্বানি লেখেন, 'রুচি আরও ভালো বন্ধু। আমাদের পরের সিনেমা স্কারলেট জোহানসনের সঙ্গে।'
ওই বছরই স্কারলেট জোহানসন অভিনীত এবং রিলায়েন্স এন্টারটেইনমেন্ট-এর সহ-প্রযোজনায় সায়েন্স ফিকশন সিনেমা 'ঘোস্ট ইন দ্য শেল' মুক্তি পায়। অনিল আম্বানি এবং এপস্টিনের সঙ্গে যুক্ত একটি ফোন নম্বরের মধ্যে টেক্সট মেসেজগুলো থেকে আরও দেখা যায়, তাঁরা ওই বছর প্যারিসে একত্রিত হওয়ার আলোচনা করেছিলেন-কিন্তু তা হয়ে ওঠেনি। এছাড়া ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া নিয়েও তাঁদের মধ্যে চ্যাটিং হয়েছে। ২০১৯ সালের মে মাসে আম্বানি নিউ ইয়র্কে যাওয়ার কথা জানালে এপস্টিন তাঁকে আমন্ত্রণ করেন। এপস্টিন লেখেন, 'যদি কারও সঙ্গে গোপনে দেখা করতে চাও, আমাকে জানিও।' নথিতে দেখা যায়, ম্যানহাটনের আপার ইস্ট সাইডে এপস্টিনের বাড়িতে দুইজনের মধ্যে একটি বৈঠক নিশ্চিত করা হয়েছিল।
এপস্টিন ফাইল থেকে জানা যায়, ২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের পতিতাবৃত্তিতে জড়ানোর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরেও এপস্টিন কীভাবে বছরের পর বছর তার ব্যবসায়িক ও সামাজিক সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। ২০১৯ সালে ফেডারেল যৌন পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন অব্যাহত রেখেছিলেন। পরে জেলে তার মৃত্যু হয়, যা আত্মহত্যা বলে মনে করা হয়। এপস্টিন যাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিলেন তাদের নিয়ে ওয়াল স্ট্রিট, ওয়াশিংটন এবং আইনি সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক তোলপাড় চলছে। কিন্তু তার নেটওয়ার্ক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও ছড়িয়ে ছিল। ব্লুমবার্গ নিউজের সংগৃহীত হাজার হাজার ইমেল অনুসারে, ২০১৭ সালের ৪ মার্চ এপস্টিন যেসব ডিজিটাল বইয়ের অর্ডার দিয়েছিলেন-যার মধ্যে ছিল 'আম্বানি অ্যান্ড সন্স' এবং 'স্টর্মস ইন দ্য সি উইন্ড: আম্বানি বনাম আম্বানি'-তা তাকে এই পরিবারের তিক্ত ইতিহাস এবং অভিজাত অবস্থান সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।
এপস্টিন কীভাবে এক সংযোগ থেকে আরেক সংযোগ তৈরি করতেন, এই বার্তাগুলো তার প্রমাণ। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে এপস্টিন ভারতীয়-আমেরিকান লেখক দীপক চোপড়াকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তিনি অনিল আম্বানিকে চেনেন কিনা। চোপড়া জানিয়েছিলেন তিনি চেনেন এবং একটি দ্রুত তালিকায় আম্বানি ও তার পরিবার সম্পর্কে তার ধারণা লিখেছিলেন: চোপড়া লেখেন, 'খুব ধনী, খুব বেশি নজরে থাকতে চায়, খুব সেলিব্রিটি সচেতন। অসংখ্য ব্যবসা এবং ভাইদের মধ্যে বনিবনা নেই।' ২০১৯ সালের মে মাসে আম্বানির সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকের পর এপস্টিন তাকে একটি বার্তা পাঠান: 'আজকের দিনটা দারুণ ছিল, তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালো লাগল।' উল্লেখ্য, অনিল আম্বানি এবং তার ভাই মুকেশ আম্বানির মধ্যে বাবা ধীরুভাই আম্বানির মৃত্যুর পর ২০০২ সালে পারিবারিক ব্যবসা ভাগাভাগি হয়ে যায়। অনিল রিলায়েন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান, যা ভারতের পরিকাঠামো এবং বিদ্যুৎ খাতে কাজ করে। মুকেশ আম্বানি এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি-রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নিয়ন্ত্রণ করেন, যার ব্যবসা তেল শোধন, পেট্রোকেমিক্যাল, টেলিযোগাযোগ, খুচর এবং মিডিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার ইনডেক্স অনুযায়ী, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ৯৮.৪ বিলিয়ন ডলার।
অনিল আম্বানি ২০০৮ সালে বিশ্বের ষষ্ঠ ধনী ব্যক্তি ছিলেন। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক আর্থিক ও নিয়ন্ত্রক তদন্ত চলছে। ২০২৪ সালে সেবি তাঁকে পাঁচ বছরের জন্য শেয়ারবাজার থেকে নিষিদ্ধ করে। ২০২৫–২৬ সালে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট তাঁর বিরুদ্ধে হাজার কোটির বেশি টাকার সম্পত্তি সংযুক্ত করে।
E-Paper











