অন্তিম পর্যায়ে দেউলিয়া পাকিস্তান ! কীভাবে গর্ব থেকে বোঝাই পরিণত হল পিআইএ?

পাকিস্তান ইন্টারন্যাশান এয়ারলাইন্স (পিআইএ) একসময় সে দেশের গর্বের প্রতীক ছিল।

Published on: Dec 05, 2025 2:25 PM IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

দান আর ধারের টাকায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে পাকিস্তানের অর্থনীতি। সামরিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি-সহ চূড়ান্ত আর্থিক অনিয়মের জেরে প্রায় দেউলিয়া দশা পাকিস্তানের। তার উপর রয়েছে আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার (আইএমএফ)-এর ঋণের শর্ত। ফলে ভাঁড়ারে কিছু অর্থ সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছে পাকিস্তান। আর এরই অঙ্গ হিসেবে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশান এয়ারলাইন্স (পিআইএ)-কে বেচে দিতে চাইছে ইসলামাবাদ।

কীভাবে গর্ব থেকে বোঝাই পরিণত হল পিআইএ? (REUTERS)
কীভাবে গর্ব থেকে বোঝাই পরিণত হল পিআইএ? (REUTERS)

পাকিস্তানের জাতীয় বিমান সংস্থার বেশিরভাগ শেয়ার বিক্রি করার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা দেশটির অর্থনীতির ওপর একটি চাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেবকে উদ্ধৃত করে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলি জানিয়েছে। বিমান সংস্থা বিক্রির জন্য দর হাঁকার দিন ঠিক হয়েছে আগামী ২৩ ডিসেম্বর। সংবাদমাধ্যমে নিলামের সরাসরি সম্প্রচার হবে। এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ধুঁকতে থাকা পিআইএ কিনতে আগ্রহীদের নিয়ে বুধবার বৈঠকে বসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। পাক সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে, আইএমএফের ৭০০ কোটি ডলার আর্থিক প্যাকেজে পিআইএ-র ৫১ থেকে ১০০ শতাংশ বিলগ্নিকরণের শর্ত দেওয়া হয়েছে। জিও টিভি-ও আইএমএফের বেল আউট প্যাকেজের শর্ত হিসেবে পিআইএ বিক্রির কথা জানিয়েছে।

গর্বের প্রতীক

পাকিস্তান ইন্টারন্যাশান এয়ারলাইন্স (পিআইএ) একসময় সে দেশের গর্বের প্রতীক ছিল। ১৯৬০ এবং ১৯৭০ এর দশকে বিশ্বের সেরা বিমান সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত হত। ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান ইন্টারন্যাশান এয়ারলাইন্স বর্তমানে ৩২টি যাত্রীবাহী ও কার্গো বিমান অপারেশনাল রয়েছে। এটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরে এবং সারা বিশ্বের মোট ৬০টি রুটে বিমান পরিষেবা পরিচালনা করে। তাছাড়া সংস্থাটি অতি সাম্প্রতিক বাকিতে ৫টি বোয়িং ৭৭৭ ইআর-৩০০ স্রিজের অত্যাধুনিক যাত্রীবাহী বিমান ক্রয়ের চুক্তি করে। ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজ নামে একটি বেসরকারি বিমান সংস্থার মাধ্যমে পিআইএ-এর যাত্রা শুরু হয়, যা ১৯৪৬ সালের ২৯ অক্টোবর কলকাতার ব্যবসায়ী আদমজী হাজি দাউদ এবং মির্জা আহমেদ ইস্পাহানী প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৫ সালে, পাকিস্তান সরকার ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজকে জাতীয়করণ করে এবং এটিকে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স কর্পোরেশন (পিআইএসি) নামে একটি নতুন রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সংস্থায় একীভূত করে। মির্জা আহমেদ ইস্পাহানী পিআইএ-র প্রথম চেয়ারম্যান হন।

৪১ বছর আগে ১৯৮৫ সালে পিআইএ দুটি পুরনো যাত্রী পরিবহণ বিমান ভাড়া নিয়ে বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু করে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির এ্যামিরেটস এয়ারলাইন্স। বর্তমানে তাদের বিমান বহরে মোট ২৬২টি যাত্রীবাহী ও কার্গো বিমান রয়েছে। ১৯৮৫ সালে দুবাই ভিত্তিক এ্যামিরেটস এয়ারলাইন্স-এর প্রাথমিকভাবে তাদের মূলধনের পরিমাণ ছিল মাত্র ১০ মিলিয়ন ডলার। আর মাত্র দুই যুগের মধ্যে সঠিক পরিকল্পনা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার জন্য দুবাই ভিত্তিক এ্যামিরেটস এয়ারলাইন্স বিশ্বের অন্যতম সেরা এয়ারলাইন্স হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

চরম অব্যবস্থাপনা ও ভয়াবহ লোকসান

বর্তমানে চরম অব্যবস্থাপনা এবং ভয়াবহ লোকসানের মুখে থাকা পাকিস্তানের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বিমান পরিষেবা সংস্থা পাকিস্তান ইন্টারন্যাশান এয়ারলাইন্স (পিআইএ) গত বছর নিলামে বিক্রিরও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে দেশের সরকার। অর্থ সংকট ও ঋণের বোঝায় জর্জরিত পাকিস্তানের এই ঐতিহ্যবাহী বিমান পরিষেবা সংস্থাটি প্রায় অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে এই বোঝা থেকে মুক্তি পেতে চেষ্টা করছে দেশটি। গত এক দশকে, পিআইএ প্রায় ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের লোকসান করেছে, যার মধ্যে ৩০টি বিমানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পুরনো হওয়ার কারণে বন্ধ রয়েছে। পাকিস্তান বিমান সংস্থার মুখপাত্র আবদুল্লাহ হাফিজ খান বলেন, পিআইএর বিনিয়োগ থাকা প্রয়োজন। পিআইএর সামগ্রিক ব্যবসায়িক দক্ষতায় বিনিয়োগ থাকা প্রয়োজন। তিনি বলেন, এটি আসলে বেসরকারি খাত থেকে আসতে পারে। যদি এমন কোনও বৃহৎ বিনিয়োগকারী থাকে যার কাছে এটি বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরা যাবে।

নিরাপত্তাজনিত কারণে চার বছরের নিষেধাজ্ঞার পর জানুয়ারিতে বিমান সংস্থাটি ইউরোপে ফ্লাইট পুনরায় চালু করে। এখন এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ লাভজনক বাজার, ব্রিটেনে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য পুনরায় আবেদন করছে। সীমিত ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের মধ্যে গত বছর বেসরকারিকরণের প্রচেষ্টায় মাত্র একটি স্বল্প প্রস্তাব আসে। এবার, সরকার ৭৫ শতাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়র বিক্রি করছে। এর আগে পিআইএ বিক্রির একটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান ব্লু ওয়ার্ল্ড সিটির দেওয়া ৩৬ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব ৩০৫ মিলিয়ন ডলারের ন্যূনতম মূল্যসীমার অনেক নিচে থাকায় তা বাতিল করা হয়। এছাড়া ঋণ, জনবল কাঠামো-সহ বিভিন্ন বিষয়ে উদ্বেগের কারণে সেই উদ্যোগটিও ভেস্তে যায়। পাকিস্তান সরকার বিমানবন্দর পরিচালনা এবং পরিষেবাগুলোকেও বেসরকারিকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যার শুরু হচ্ছে ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে। পাকিস্তান বেসরকারিকরণ কমিশনের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আলি বলেন, ইসলামাবাদ প্রথম, এবং আমি আশা করছি এর পরে, একবার আমরা সফলভাবে ইসলামাবাদে বেসরকারি খাতকে নিয়ে আসব, তাহলে আমাদের আরও বিমানবন্দর বেসরকারি খাতে চলে যাবে। কিন্তু পিআইএ-র কাছে জাতীয় বিমান সংস্থার যত বিমান থাকা উচিত, তত বেশি বিমান নেই।