পর পর গুলিতে ঝাঁজরা! লিবিয়ার স্বৈরশাসক গাদ্দাফির পুত্র-খুন, বাড়ছে রহস্য

সাইফ আল-ইসলামের জীবন লিবিয়ার সাম্প্রতিক উত্তাল ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি ছিল।

Published on: Feb 04, 2026 11:37 AM IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

লিবিয়ার স্বৈরশাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফিকে (৫৩) বাড়িতে ঢুকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিল দুষ্কৃতীরা। সূত্রের খবর, চার দুষ্কৃতী রাজধানী ত্রিপোলি থেকে ১৩৬ কিলোমিটার (৮৫ মাইল) দক্ষিণ-পশ্চিমে জিনতান শহরে সাইফের বাড়িতে চড়াও হয়েছিল। তবে কারা এই ঘটনায় জড়িত তা এখনও জানা যায়নি।

সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি (সৌজন্যে টুইটার)
সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি (সৌজন্যে টুইটার)

সৌদি মালিকানাধীন আল আরাবিয়া জানিয়েছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চার মুখোশধারী দুষ্কৃতী জিনতানে সাইফের বাড়ির বাগানে তাঁকে হত্যা করে। গুলি চালানোর পর হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। তার আগে সাইফের বাড়ির সমস্ত সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করে দেয় তারা। তারা এটিকে ‘গুপ্তহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। যদিও লিবিয়া প্রশাসনের তরফে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি। সাইফের রাজনৈতিক উপদেষ্টা আবদুল্লাহ ওথমান ফেসবুক পোস্ট করে তাঁর মৃত্যুর ঘটনা জানিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনও গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করেনি। লিবিয়ার প্রাক্তন স্বৈরশাসকের দ্বিতীয় পুত্র সাইফ আল-ইসলাম ২০১১ সালে ন্যাটো-সমর্থিত গণঅভ্যুত্থানে তার পিতার শাসন পতনের পরও একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সক্রিয় ছিলেন।

কে সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি?

সাইফ আল-ইসলামের জীবন লিবিয়ার সাম্প্রতিক উত্তাল ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি ছিল। এক সময় তাঁকে তাঁর বাবার উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল এবং তেলসমৃদ্ধ উত্তর আফ্রিকার এই দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে গণ্য করা হত। কিন্তু ২০১১ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি আড়ালে চলে যান, যে অভ্যুত্থান তাঁর বাবার চার দশকের শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল। ২০১১ সালে গ্রেফতার হওয়ার পর সাইফ প্রায় এক দশক একটি প্রত্যন্ত পাহাড়ি শহরে বন্দি ছিলেন এবং এরপর জাতীয় রাজনীতিতে পুনরায় আবির্ভূত হন। মুক্তি পাওয়ার পরে সাইফ আল-ইসলাম প্রেসিডেন্ট পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা করেন। যদিও তিনি সরকারের কোনও আনুষ্ঠানিক পদে ছিলেন না, তবুও তাঁকে একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখা হত, যিনি বিভিন্ন জোট গঠন করতে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে আলোচনাকে প্রভাবিত করতে সক্ষম ছিলেন।

রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিকে সাইফ আল-ইসলাম বেশ কিছু সংবেদনশীল কূটনৈতিক মিশনে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি লিবিয়ার গণবিধ্বংসী অস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনায় নেতৃত্ব দেন এবং স্কটল্যান্ডের লকারবির উপর ১৯৮৮ সালের প্যান অ্যাম ফ্লাইট ১০৩ বোমা হামলায় নিহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি নিজেকে একজন সংস্কারক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছিলেন, একটি নতুন সংবিধান এবং মানবাধিকারের প্রতি অধিকতর শ্রদ্ধার পক্ষে কথা বলেছিলেন, যাতে লিবিয়ার আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে অবস্থা থেকে মুক্তি মেলে। পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত ও সাবলীল বক্তা সাইফ আল-ইসলাম দমনমূলক লিবিয়া সরকারের একটি প্রগতিশীল মুখ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতেন। তিনি ২০০৮ সালে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে পিএইচডি করেন। তাঁর গবেষণাপত্রে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কারে সিভিল সোসাইটির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়। ২০০০ সাল থেকে ২০১১ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আগে পর্যন্ত পশ্চিমি বিশ্বের সঙ্গে লিবিয়ার সম্পর্ক উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং রাজনৈতিক সংস্কারের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন।

২০১১ সালের মার্চে রাষ্ট্রসংঘ গাদ্দাফির বাহিনীর হাত থেকে বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষায় ‘সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নেওয়ার অনুমোদন দিলে ন্যাটো লিবিয়ায় বোমাবর্ষণ শুরু করে। ২০১১ সালের জুনে সাইফ আল-ইসলাম ঘোষণা করেন, তাঁর বাবা নির্বাচনে রাজি এবং নির্বাচনে না জিতলে ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন। তবে ন্যাটো এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং লিবিয়ায় বোমাবর্ষণ অব্যাহত রাখে। ওই বছর জুনের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) সাইফ আল-ইসলামের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। তবে তিনি দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন। অবশেষে ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর সিরতে শহরে তাঁর বাবা মুয়াম্মার গাদ্দাফি এবং ভাই মুতাসসিম নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলায়। ২০১৪ সালে জিনতানে বন্দী থাকা অবস্থায় ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ত্রিপোলির আদালতে বিচার কার্যক্রমে হাজির হন সাইফ আল-ইসলাম। ২০১৫ সালের জুলাইয়ে ত্রিপোলির আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তবে ২০১৭ সালে জিনতান নিয়ন্ত্রণকারী মিলিশিয়া বাহিনী আবু বকর আস-সিদ্দিক ব্যাটালিয়ন তাঁকে মুক্তি দেয়। এটি লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় কর্তৃপক্ষ ঘোষিত এক সাধারণ ক্ষমার অংশ ছিল, যাদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

এরপর বহু বছর তিনি প্রকাশ্যে আর আসেননি এবং আইসিসির কাছে তখনও তিনি পলাতক। ২০২১ সালের জুলাইয়ে তিনি নিউইয়র্ক টাইমসকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি লিবিয়ার কর্তৃপক্ষকে অভিযুক্ত করে বলেন, তারা ‘নির্বাচনকে ভয় পায়।’ নিজের দীর্ঘদিন আড়ালে থাকার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, তিনি ‘১০ বছর ধরে লিবিয়ার জনগণ থেকে দূরে ছিলেন। তিনি আরও বলেন, ‘আপনাকে ধীরে ধীরে ফিরে আসতে হবে। একদম ধীরে। স্ট্রিপটিজের মতো।’ ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে বহু বছর পর প্রথমবার তিনি প্রকাশ্যে আসেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সাবহায় তিনি লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হতে আবেদন জমা দেন। এর মাধ্যমে তিনি তাঁর বাবার সমর্থকদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন। শুরুতে তাঁকে নির্বাচনে অংশ নিতে নিষিদ্ধ করা হলেও পরে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। তবে লিবিয়ার অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে নির্বাচন আর অনুষ্ঠিত হয়নি। সে সময় দেশটিতে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রশাসন ক্ষমতার জন্য লড়াই করছিল।