ভারতের প্রশংসা, চিনের অস্বস্তি! জাপানের সিংহাসনে ফের তাকাইচি, সাউথ ব্লকের জন্য কী সুসংবাদ?
তাকাইচির লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে ৪৬৫ আসনের মধ্যে ৩১৬টিতে জয় পেয়েছে।
গত অক্টোবরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী পদে বসেছিলেন লিবারাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) নেত্রী সানায়ে তাকাইচি। নতুন শুরুর লক্ষে জানুয়ারি মাসে সংসদ ভেঙে নির্বাচন ঘোষণা করেন তিনি। রবিবার জাপানের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে বিপুল জয় পেলেন তাকাইচি। এই জয়ের মাধ্যমে কর ছাড় ও প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন, তা বাস্তবায়নের পথ আরও সুগম হল।

রবিবার ভোটের ফলাফলে দেখা যায়, তাকাইচির লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে ৪৬৫ আসনের মধ্যে ৩১৬টিতে জয় পেয়েছে। এতে পার্লামেন্টে তিনি দুই-তৃতীয়াংশের ‘সুপারমেজরিটি’ অর্জন করেছেন। এটি জাপানের জাতীয় নির্বাচনের ইতিহাসে দলটির সর্বোচ্চ সাফল্য। ফলে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে এলডিপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও তিনি আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সেই কক্ষের সিদ্ধান্ত অতিক্রম করতে পারবেন। তাকাইচির এই বিরাট জয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এক্স হ্যান্ডলে তিনি লিখেছেন, 'আমাদের বিশেষ কৌশলগত ও আঞ্চলিক অংশীদারি বিশ্বশান্তি, স্থিতাবস্থা ও সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।'
নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ্যে আসতেই এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তাকাইচি বলেন, ‘এই নির্বাচন ছিল বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের নির্বাচন-বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও রাজস্বনীতিতে বড় পরিবর্তন এবং নিরাপত্তা জোরদারের প্রশ্নে। এসব নীতি নিয়ে ব্যাপক বিরোধিতা ছিল। জনগণ যদি আমাদের সমর্থন দিয়ে থাকে, তাহলে আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতেই হবে।’ ৬৪ বছর বয়সি তাকাইচি গত বছরের শেষ দিকে এলডিপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। নিজের জনপ্রিয়তা কাজে লাগাতেই তিনি বিরল এই আগাম নির্বাচন ডাকেন।
ভারত-জাপান সম্পর্ক
তাকাইচি-র জাপানের প্রধানমন্ত্রী পদে বসার ঘটনাকে সুসংবাদ বলেই মনে করছে সাউথ ব্লক। গত বছর এপ্রিলে দলীয় নেত্রী হিসেবে তাইওয়ান সফরে গিয়েছিলেন তাকাইচি। সেখানে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে ভারতকে গণতান্ত্রিক জোটের শরিক রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন তিনি। পাশাপাশি ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে নিরাপত্তা জোটের সম্ভাবনার কথা জানান। কূটনৈতিক শিবিরের মতে তাকাইচি কোয়াডধর্মী চিন-বিরোধী জোটের চিন্তাভাবনা করছেন, যেখানে নয়া দিল্লিকে মাথায় রাখলেও বাদ দেওয়া হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। সব দিক থেকেই এই মুহূর্তে যা ভারতের কাছে মাপসই অক্ষ। তিনি অতীতে ভারতকে গণতান্ত্রিক, প্রযুক্তিগত এবং উৎপাদন অংশীদার হিসেবে প্রশংসা করেছেন। ২০২৫ সালের ২৪ অক্টোবর জাপানের সংসদে প্রথম ভাষণে তাকাইচি স্পষ্টভাবে ভারতকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, 'টোকিওর কূটনীতির মূল স্তম্ভ, একটি মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে উন্নীত করার জন্য, ভারত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
২৯ অক্টোবর, ২০২৫ তারিখে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক আলোচনার সময়, তাকাইচি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতার উপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি 'জাপান-ভারত বিশেষ কৌশলগত এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের একটি নতুন সোনালী অধ্যায় উন্মোচন' করার জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ২৩ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে এক বৈঠকে, তিনি জাপান-ভারত সম্পর্ককে আরও মজবুত এবং সমৃদ্ধ করার লক্ষে একসঙ্গে কাজ করার কথা জানান।
চিনের অস্বস্তি
এলডিপি-র জয়ে অস্বস্তিতে পড়েছে চিন। টোকিও-বেজিং উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। বৈশ্বিক অর্থ বাজারেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ক্ষমতায় আসার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাকাইচি তাইওয়ান নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় সমর্থন জানান। এতে গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক বিরোধে জড়ায় টোকিও-বেজিং। চিন পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে নিজের দেশের নাগরিকদের জাপান ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করে। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিংও তাকাইচির জয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই জয় জাপান ও অঞ্চলের অংশীদারদের জন্য আরও সমৃদ্ধ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ বয়ে আনবে।’ এছাড়া তাকাইচির শক্তিশালী ম্যান্ডেটের কল্যাণে জাপানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হওয়ায়ও বেজিংয়ের অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। চিন মূলত তাকাইচির এ ম্যান্ডেটকে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের সামরিক শক্তি পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা হিসেবে দেখছে। কূটনৈতিক সূত্রের বক্তব্য, তাকাইচির চিন্তা অনুসারে ভারত এই মুহূর্তে জাপানের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে অগ্রগণ্য। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় সমুদ্রনীতিতে চিনের বাণিজ্যিক এবং কৌশলগত মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে প্রাক্তন শিনজো আবে সরকার ভারতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। রাজনৈতিক ভাবে আবে-র উত্তরসূরি তাকাইচিও সেই পথেই হাঁটবেন বলে মনেকরা হচ্ছে।
E-Paper











