'কোনও ডুবুরি ছিল না...,' নয়ডায় সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের মর্মান্তিক পরিণতি, বিস্ফোরক বাবা
গাড়িটি যখন জলে ডুবছিল, তখন বাঁচার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন যুবরাজ। চিৎকার করে সাহায্য চেয়েছিলেন।
ঘন কুয়াশা আর রাস্তার অন্ধকার- এই দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে প্রাণ হারালেন এক তরুণ সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। গ্রেটার নয়ডার সেক্টর ১৫০-এর কাছে একটি সার্ভিস রোডে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উঁচু বাঁধে সজোরে ধাক্কা মেরে ৭০ ফুট গভীর, জল ভর্তি গর্তে পড়ে যান যুবরাজ মেহতা (২৭)। শনিবার ভোর রাতের এই মর্মান্তিক ঘটনার পর একের পর এক অভিযোগ সামনে এসেছে। এবার তাঁর বাবা রাজকুমার মেহতাও এক গুরুতর অভিযোগ করেছেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কাজ সেরে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন যুবরাজ। কুয়াশার কারণে সামনের রাস্তা কার্যত অদৃশ্য ছিল। আচমকাই গাড়িটি রাস্তার ধারের একটি উঁচু বাঁধে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ে ৭০ ফুট গভীর জলে ভরা গর্তে। গাড়ি ডুবতে শুরু করলে আতঙ্কিত যুবরাজ বাবাকে ফোন করে আর্তনাদ করে ওঠেন, 'বাবা, আমি জলে ডুবে যাচ্ছি। আমায় বাঁচাও, আমি মরতে চাই না।' খবর পেয়েই পুলিশ ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার দীর্ঘ তল্লাশির পর গাড়ি ও যুবরাজকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
২ ঘণ্টা ধরে বাঁচার তাগিদ
ছেলের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন বাবা রাজকুমার মেহতা। তাঁর অভিযোগ, ঘটনার দিন কোনও ডুবুরি ছিল না সেখানে। তিনি এই অভিযোগও করেছেন যে, তাঁর ছেলেকে বাঁচাতে কেউ গর্তের মধ্যে নামতে চাননি, কারণ সেটি ছিল অত্যন্ত গভীর এবং তার জল ছিল প্রচণ্ড ঠান্ডা। শীতের দিনে ঠান্ডা জলের ওই গর্তে নেমে যুবরাজকে বাঁচানোর তাগিদ প্রাথমিক ভাবে কেউ দেখায়নি বলেই অভিযোগ করেছেন মৃত তরুণের বাবা। বার্তা সংবাদ এএনআই-কে রাজকুমার মেহতা এও জানিয়েছেন, ঘটনার দিন প্রায় ২ ঘণ্টা ধরে গাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন তাঁর ছেলে। কোনওমতে নিয়ন্ত্রণ রাখছিলেন তিনি, যাতে গাড়ি ডুবে না যায়। ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে নিজের উপস্থিতি জানানোর চেষ্টা করছিলেন যুবরাজ। শুধু তাই নয়, বাবাকে ফোন এবং মেসেজ করে ওই তরুণ বারবার বলেছিলেন, 'আমি মরতে চাই না। বাবা আমায় বাঁচাও।' যুবরাজের বাবা আরও অভিযোগ করেছেন, ঘটনার দিন ছেলের ফোন, মেসেজ পেয়ে দ্রুত ওই এলাকায় পৌঁছে যান তিনি। আগেই খবর দিয়েছিলেন পুলিশ ও দমকলকে। তাই তারাও পৌঁছে গিয়েছিল ঘটনাস্থলে। এসেছিল উদ্ধারকারী দলও। কিন্তু তাদের সঙ্গে কোনও ডুবুরি ছিল না। ফলে যুবরাজ ২ ঘণ্টা ধরে গাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার জন্য চিৎকার করে সাহায্য চাইলেও লাভ হয়নি কিছুই। আশপাশে অনেক লোকই ছিলেন। কেউই সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেননি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন বেশির ভাগ মানুষ। অনেকে আবার ভিডিও করছিলেন।
যে এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেখানে রাস্তার মোড়ে কাজ চলছিল। অথচ সেখানে যে কাজ চলছে তা জানিয়ে কোনও বোর্ড লাগানো ছিল না। এর পাশাপাশি ওই গভীর গর্ত ঢেকে রাখার ব্যবস্থাও করা হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দারাও এই নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন। বারবার বলার পরেও কর্তৃপক্ষ কোনও ব্যবস্থাই নেয়নি বলে অভিযোগ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মনিন্দর নামে এক ই-কমার্স সংস্থার ডেলিভারি এজেন্ট যুবরাজকে বাঁচানোর জন্য নিজেই কোমরে দড়ি বেঁধে নেমে পড়েছিলেন ওই গভীর গর্তে। তবে ঘন কুয়াশার কারণে ইঞ্জিনিয়ার তরুণকে ঠিকভাবে খুঁজে পাননি তিনি। মনিন্দর অনেক চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত বাঁচাতে পারেননি যুবরাজকে। আর সব মিলিয়ে গ্রেটার নয়ডার এই ঘটনায় বারবার উঠে আসছে 'অবহেলার' অভিযোগ। ওই এলাকায় যদি কাজ চলছে এটা জানান দিয়ে একটা বোর্ড থাকত কিংবা গর্তটা ঢাকা থাকত, তাহলে হয়তো সেদিন প্রাণ হারাতে হতো না যুবরাজকে। দুর্ঘটনার দিন ঘন কুয়াশার জেরে দৃশ্যমানতা খুব কম থাকায় গাড়ি নিয়ে সোজা গর্তে পড়ে যান যুবরাজ।
কী বলছে পুলিশ?
পুলিশ জানিয়েছে, এদিন অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে বাণিজ্যিক প্রকল্পের জন্য খনন করা ৭০ ফুট গভীর গর্তে পড়ে মৃত্যু হয় যুবরাজ মেহতার। তবে কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করেছে তারা।অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (আইন ও শৃঙ্খলা) রাজীব নারায়ণ মিশ্র বলেছেন, পুলিশ এবং দমকল বাহিনী উদ্ধারকারী দলগুলি নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়েছে কিন্তু দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্য থাকায় তাদের বাধাগ্রস্ত হতে হয়েছে। তিনি বলেন, একটি ক্রেন, মই, অস্থায়ী নৌকা এবং সার্চলাইট ব্যবহার করা হয়েছিল, কিন্তু ঘন কুয়াশার কারণে অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল।
গাড়িটি যখন জলে ডুবছিল, তখন বাঁচার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন যুবরাজ। চিৎকার করে সাহায্য চেয়েছিলেন। স্থানীয় কয়েকজন তাঁর চিৎকার শুনলেও ঘন কুয়াশা ও গভীর জলের কারণে কেউ উদ্ধারে নামতে সাহস পাননি। সেই চরম আতঙ্কের মুহূর্তে বাবাকে শেষ ফোনটি করেছিলেন তিনি। ছেলের এই করুণ আর্তি শুনে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন বাবা রাজকুমার মেহতা। চলে আসে পুলিশও কিন্তু দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও কেউ কিছু করতে পারেনি। গুরুগ্রামের একটি ডেটা সায়েন্স সংস্থায় চাকরি করতেন তিনি। ইতিমধ্যে যুবরাজের পরিবার অভিযোগ দায়ের করেছে। রাজকুমারের অভিযোগ, রাস্তায় রিফ্লেক্টর ছিল না এবং সার্ভিস রোডের ড্রেনও ঢাকা ছিল না। থাকলেও হয়তো তাঁর মেধাবী পুত্রকে অকালে চলে যেতে হত না।
E-Paper











