তরুণী 'ফিঁদায়ে', IED হামলা: বালোচিস্তানে বিএলএ-র আক্রমণে কাঁপছে পাক সেনাবাহিনী, মৃত্যুমিছিল
বিএলএ-র তরফে জানানো হয়েছে, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থার ২০০ জনেরও বেশি সদস্য নিহত হয়েছে, সেই সঙ্গে শতাধিক আহত হয়েছে।
কয়েক দশকের মধ্যে শনিবার পাকিস্তানে বালুচ বিদ্রোহীদের সবচেয়ে বড় হামলার ঘটনাটি ঘটেছে। বেলুচিস্তান জুড়ে, বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি-র (বিএলএ) বিদ্রোহীরা সাধারণ নাগরিক, পুলিশ, সামরিক বাহিনী এবং আধাসামরিক ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং আক্রমণ চালিয়েছে। তারা এই অভিযানের নাম দিয়েছে 'হেরোফ ২।' বালোচ বিদ্রোহীদের সমন্বিত হামলার জবাবে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী টানা ৪০ ঘণ্টার পাল্টা অভিযান চালায়। এই সংঘর্ষকে ঘিরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনাও তীব্র হয়েছে। ফলে এই মুহূর্তে বালুচিস্তানের অবস্থা ভয়াবহ।

বিএলএ মুখপাত্র জিয়ান্দ বালোচের দেওয়া বিবৃতি অনুযায়ী, কোয়েটা, নোশকি, মাস্তুং, দালবান্দিন, কালাত, খারান, পাঞ্জগুর, গোয়াদার, পাসনি, তুরবাত, টুম্প, বুলেদা, মাঙ্গোচর, লাসবেলা, কেচ এবং আওয়ারান এবং এর আশেপাশের বেশ কিছু জায়গায় হামলা চালানো হয়। তাদের যোদ্ধারা একই সঙ্গে শত্রু সামরিক, প্রশাসনিক এবং নিরাপত্তা কাঠামো-এ হামলা চালিয়েছে, এবং বেশ কয়েকটি এলাকায় পাক নিরাপত্তা বাহিনীর চলাচল সাময়িকভাবে সীমিত করেছে। ২০২৪ সালে চালু হেরফ ১, বিএলএ-এর কার্যকলাপকে মূলত নিরাপত্তা কর্মীদের উপর আক্রমণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিল, হেরফ ২-এর পরিধি আরও বিস্তৃত। সংবাদমাধ্যম 'দ্য নেটিভ ভয়েসেস' অনুসারে, হেরোফ হল বালুচি সাহিত্যের একটি শব্দ যার অর্থ 'কালো ঝড়', যা সাধারণত বালুচ কবিতায় ব্যবহৃত হয়, যার মধ্যে প্রবীণ কবি করিম দাশতিও রয়েছেন।
২০০ পাকিস্তানি সেনা নিহত
বিএলএ-র তরফে জানানো হয়েছে, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থার ২০০ জনেরও বেশি সদস্য নিহত হয়েছে, সেই সঙ্গে শতাধিক আহত হয়েছে। ইতিমধ্যে ১৭ জনকে বন্দি করা হয়েছে। তারা আরও দাবি করেছে যে অফিস, ব্যাঙ্ক এবং কারাগার-সহ ৩০ টিরও বেশি সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করা হয়েছে এবং ২০টিরও বেশি যানবাহন আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে যে তীব্র সংঘর্ষের সময় বিএলএ যোদ্ধারা কিছু নির্দিষ্ট পোস্ট এবং কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। অন্যদিকে, কুয়েটায় সাংবাদিক বৈঠকে প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সরফরাজ বুগতি জানান, শুক্রবার ও শনিবারের অভিযান মিলিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা প্রায় ২০০। এরমধ্যে ৩১ জন সাধারণ নাগরিক, ১৭ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং ১৪৫ জন বালোচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)-র যোদ্ধা। শুধু শনিবারেই প্রাণ হারিয়েছেন শতাধিক মানুষ।
পাকিস্তান বহুদিন ধরে বালুচদের উপর ধর্মীয়, সামাজিক, আর্থিক এবং রাজনৈতিক শাসন চালাচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে পাক সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন বালুচরা। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং ফ্রন্টিয়ার কর্পসকে প্রায়শই বেলুচ বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত দমন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করা হয়েছে, যার ফলে প্রায়শই জোরপূর্বক অপহরণের ঘটনা ঘটে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলি দাবি করেছে কয়েক বছর ধরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বা তাদের মিলিশিয়ারা হাজার হাজার বালুচকে অবৈধভাবে হত্যা বা অপহরণ করেছে।
বিএলএ যোদ্ধা নিহত
শনিবার পাকিস্তানের সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, ওই দিন ৯২ জন বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহত হয়। তার আগে শুক্রবার ৪১ জন নিহত হয়েছিল। বুগতি জানান, এত অল্প সময়ে এত বেশি সংখ্যক বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহত হওয়ার ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিরল। তবে তিনি আগের কোনও পরিসংখ্যান তুলে ধরেননি। অন্যদিকে, বিএলএও ক্ষতির কথা স্বীকার করে জানিয়েছে, অভিযানের সময় তাদের ১৮ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছে, যার মধ্যে মাজিদ ব্রিগেডের ১১ জন 'ফিঁদায়ে' (আত্মঘাতী), ফতেহ স্কোয়াডের চারজন যোদ্ধা এবং এসটিওএস ইউনিটের তিনজন যোদ্ধা রয়েছে। একটি পৃথক বিবৃতিতে বিএলএ জানিয়েছে, হামলাকারীদের মধ্যে একজন ছিল ২৪ বছরের আসিফা মেঙ্গল। সংগঠনের দাবি অনুসারে, হামলাকারী আসিফা নিজের ২১তম জন্মদিনে তাদের মজিদ ব্রিগেডে যোগ দেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি আত্মঘাতী হামলাকারী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। নুশকিতে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা গত শনিবার আইএসআই-এর সদর দফতরে হামলা চালান। দ্বিতীয় তরুণীর নাম প্রকাশ করা হয়নি। তবে, আত্মঘাতী হামলার আগে তরুণীর একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। সেখানে সেই তরুণীকে বন্দুক হাতে হাসতে হাসতে পাক সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিতেও দেখা গিয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীও এই হামলায় তরুণীদের জড়িত থাকার কথা মেনে নিয়েছেন।
E-Paper











