'বাবা সরি!' অনলাইন গেমের মারণনেশায় চরম পদক্ষেপ ৩ নাবালিকা বোনের, হুলুস্থূল...
করোনা অতিমারির সময় লকডাউন চলাকালীন পড়াশোনার প্রয়োজনে হাতে মোবাইল এসেছিল এই তিন নাবালিকার হাতে।
স্মার্টফোনের মারণনেশা কেড়ে নিল তিন কিশোরীর প্রাণ। অনলাইন গেমে আসক্তি নিয়ে মা-বাবার বকুনি সহ্য করতে না পেরে অভিমানে বহুতল আবাসনের ১০ তলা থেকে ঝাঁপ দিল তিন বোন। মঙ্গলবার রাত ২টো নাগাদ উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদের লোনি এলাকার এই ঘটনায় শিউরে উঠছে গোটা দেশ। পুলিশ জানিয়েছে, মৃত তিন বোনের বয়স যথাক্রমে ১২, ১৪ এবং ১৬ বছর। ইতিমধ্যে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।

ঘটনার সূত্রপাত
পুলিশ সূত্রে খবর, মৃত তিন বোনের নাম পাখি (১২), প্রাচী (১৪) এবং বিশিকা (১৬)। গাজিয়াবাদের একটি বহুতলে বাবা-মার সঙ্গে থাকত তারা। করোনা অতিমারির সময় লকডাউন চলাকালীন পড়াশোনার প্রয়োজনে হাতে মোবাইল এসেছিল এই তিন নাবালিকার হাতে। কিন্তু সেই সুযোগই কাল হল। ধীরে ধীরে পড়াশোনা ছেড়ে অনলাইন গেমের নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ে তারা। এমনকী মাঝেমধ্যে স্কুল কামাই করেও দিনভর মোবাইলে মুখ গুঁজে বসে থাকত তিন বোন। জানা গিয়েছে, ইদানীং একটি বিশেষ ‘টাস্ক-বেসড’ অনলাইন গেমের প্রতি তীব্র আসক্তি তৈরি হয়েছিল তাদের। মঙ্গলবার রাতেও সেই গেম খেলা নিয়ে বাড়িতে অশান্তি শুরু হয়। মা-বাবা বারবার গেম খেলতে বারণ করেন এবং এক পর্যায়ে ফোন কেড়ে নেন। এই বকাবকি ও বাধা দেওয়া মেনে নিতে পারেনি তিন বোন। অভিমানে ও রাগের মাথায় রাত ২টো আবাসনের ১০ তলার বারান্দা থেকে একসঙ্গে ঝাঁপ দেয় তারা।
পুলিশের তদন্ত ও পরবর্তী ঘটনা
মাঝরাতের নীরবতা ভেদ করে আসা চিৎকার পুরো সোসাইটিকে নাড়িয়ে দেয়। আওয়াজ পেয়েই আবাসনে নিরাপত্তারক্ষী ও আশপাশের বাসিন্দারা জড়ো হন। ঘটনার খবর পেয়ে রাতেই টিলা মোড় থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। রক্তাক্ত অবস্থায় তিন বোনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত বলে ঘোষণা করেন। দেহগুলি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট এলেই মৃত্যুর সঠিক কারণ ও সময় নিশ্চিত হওয়া যাবে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৮ পৃষ্ঠার একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করেছে, যাতে কেবল লেখা ছিল, 'বাবা সরি।' এর সঙ্গে ছিল হাতে আঁকা একটি কান্নার ইমোজি। এই সহজ কথাগুলি ইঙ্গিত দেয় যে গেমটির টাস্কটি কতটা মানসিক চাপের সৃষ্টি করেছিল। মৃত কিশোরীদের পরিবার এবং আবাসনের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলছে পুলিশ। সমস্ত দিক খতিয়ে দেখছে পুলিশ। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।প্রাথমিক তদন্তে একে আত্মহত্যা বলেই মনে করা হচ্ছে। তারা ঠিক কোন গেম খেলছিল এবং সেই গেমে আত্মহত্যার কোনও প্ররোচনা ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখতে কিশোরীদের মোবাইল ফোন পরীক্ষা করা হতে পারে।
কী বলছে পরিবার ও পুলিশ?
মৃত তিন বোনের বাবা চেতন কুমারের মতে, তাদের মেয়েরা একটি কোরিয়ান গেম খেলেছিল। গতকাল ছিল শেষ কাজ। পুলিশ তদন্তের জন্য তাদের ফোন বাজেয়াপ্ত করেছে। গেমটিতে মোট ৫০টি কাজ ছিল, শেষটি গতকাল ছিল। এসিপি অতুল কুমার জানিয়েছেন, রাত ২:১৫ নাগাদ, পিআরভি খবর পায় যে, টিলা মোড় পুলিশ স্টেশনে অবস্থিত ভারত সিটির টাওয়ার বি-১ নম্বর ফ্ল্যাটের নবম তলার বারান্দা থেকে তিনজন মেয়ে লাফিয়ে পড়ে এবং ঘটনাস্থলেই মারা যায়। ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত করার পর, তিন মেয়ে - নিশিকা, প্রাচী এবং পাখি - কে অচেতন অবস্থায় মাটিতে পাওয়া যায়। তাদের অ্যাম্বুলেন্সে করে লোনির ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে ডাক্তাররা তাদের মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ এখন আরও আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে।
পরিবার ও প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, তিন বোন সব সময় একসঙ্গেই থাকত। তাদের মধ্যে এতটাই ঘনিষ্ঠতা ছিল যে জীবনের শেষ সিদ্ধান্তটিও তারা একসঙ্গেই নিল। গাজিয়াবাদ পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার নেপথ্যে অন্য কোনও কারণ আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এলাকায় এই ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
E-Paper











