ইউনুসের দাবিতে মান্যতা! হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডই দিল ট্রাইবুনাল, বাংলাদেশে হিংসার শঙ্কা

ভারতীয় সময় সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ ট্রাইবুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চ রায় ঘোষণা শুরু করেন।

Updated on: Nov 17, 2025 2:54 PM IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তথা আওয়ামী লিগ নেত্রী শেখ হাসিনাকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের রায় দিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সাজা দেওয়া হয়েছে প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে। এই মামলায় তৃতীয় অভিযুক্ত বাংলাদেশ পুলিশের প্রাক্তন প্রধান চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমা প্রদর্শন করে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছে, যেহেতু বঙ্গবন্ধু কন্যা ও কামাল দু'জনেই পলাতক, তাই অর্ডার কপি তাঁদের দেওয়া হবে না।

হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডই দিল ট্রাইবুনাল (AFP)
হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডই দিল ট্রাইবুনাল (AFP)

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণা

ভারতীয় সময় সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ ট্রাইবুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চ রায় ঘোষণা শুরু করেন। এই মামলায় হাসিনা ও কামালের মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছিল সরকার পক্ষ। আদালতে প্রথমেই শোনানো হয় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্টের অংশবিশেষ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তুলে ধরা হয় গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে শেখ হাসিনার বিভিন্ন টেলিফোন আলাপ। প্রচারিত হয়েছে সে সময়কার তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে তাঁর ফোনালাপও। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি বলেন, 'বিভিন্ন আধিকারিকের সঙ্গে হাসিনার টেলিফোনের কথোপকথন নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট বিশ্লেষণ করেছি, ভিডিও দেখেছি এবং নিষ্ঠুরতা নিয়ে আলোচনা করেছি। অনেক আন্দোলনকারীকে যে হত্যা করা হয়েছে, সেটা বাস্তব।' আইনের ধারা পড়ে শোনাতে গিয়ে বিচারপতি জানান, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে হাসিনার উপস্থিতিতে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকা সত্ত্বেও তা ঠেকাতে পারেননি তিনি। এর দায় তৎকালীন প্রধানের উপরেই বর্তায়। তিনি আরও বলেন, টেলিফোনের বার্তায় শোনা গিয়েছে, রাজাকারদের মতো আন্দোলনকারীদেরও ফাঁসি দেওয়ার কথা বলছেন তিনি। বলছেন, ‘আন্দোলন দমনে ছাত্রলীগই যথেষ্ট।’ হাসিনার কথায় কাজ করেছেন আসাদুজ্জামানেরা।

দোষী সাব্যস্ত হাসিনা ও মৃত্যুদণ্ড

জুলাই আন্দোলনের সময় কাকে ফোনে কী আদেশ দিয়েছিলেন হাসিনা, তাও জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। অভিযোগ, তিনি হেলিকপ্টার, ড্রোন, মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। হেলিকপ্টার থেকে বোমাবর্ষণ করতে বলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘একটাকেও ছাড়ব না। রাজাকারদের ছাড়িনি। এদেরও ফাঁসি দিয়ে দেব। আমি বলে দিয়েছি।' বিভিন্ন রিপোর্টের অংশ পড়ে বিচারপতি বলেন, ‘অপরাধের জন্য ক্ষমা চাননি হাসিনা। তাঁর অনুশোচনা নেই। বরং আধিকারিকদের এবং ট্রাইব্যুনালের কর্মীদের হুমকি দিয়ে গিয়েছেন।’ অন্যদিকে, হাসিনার পক্ষে আইনজীবী দাবি করেছেন, কোনও হেলিকপ্টার আন্দোলন ঠেকাতে ব্যবহার করা হয়নি। কাউকে হাসিনা অপমান করেননি। আন্দোলন দমনে নিজে সরাসরি যোগও দেননি। আন্দোলনকারীদের সংখ্যাই সরকারি হিসাবে ৮০০। তাহলে দেড় হাজার আন্দোলনকারীর মৃত্যু হল কী ভাবে? প্রশ্ন তুলেছেন হাসিনার আইনজীবী। কিন্তু রায়ের শেষ অংশ থেকে বিচারপতি জানান, ‘ছাত্রদের কথা শোনার পরিবর্তে আন্দোলনকে অবহেলা করেছেন হাসিনা। আন্দোলনকারী ছাত্রদের রাজাকার বলে অপমান করেছেন।’ তিনি আরও বলেন, যে সমস্ত ফোনালাপ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তা এআই সহায়তায় প্রণীত নয়। রায় পাঠের সময় বিচারপতি জানান, হাসিনা-সহ তিন অপরাধীর বিরুদ্ধে ৫৪ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। যে সংখ্যা নেহাত কম নয়।

এরপরেই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেষ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করে। হাসিনাকে তিনটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল। এক, উস্কানি দেওয়া। দুই, হত্যার নির্দেশ এবং তিন, দমনপীড়ন আটকানোর ক্ষেত্রে পুলিশকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা। এরপরেই শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল। আর এই রায় ঘোষণা হতেই হাততালিতে ফেটে প়়ড়ে আদালতকক্ষ। বিচারপতি সকলকে শান্ত হতে অনুরোধ করেন।অন্যদিকে, আদালতকক্ষ থেকে বেরিয়ে সরকার পক্ষের আইনজীবী জানান, পলাতক হওয়ায় রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন না শেখ হাসিনা। রায়ের কপি ভারত সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে।

সরাসরি সম্প্রচার ও নিরাপত্তা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণার ঐতিহাসিক মুহূর্ত সরাসরি দেখতে সোমবার সকাল থেকেই ঢাকার টিএসসি প্রাঙ্গণে ভিড় জমতে শুরু করে। ঢাকা-সহ একাধিক জায়গায় রায় ঘোষণা সরাসরি সম্প্রচারের জন্য বড় স্ক্রি্ন লাগানো হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সামনে বসানো হয় জায়ান্ট স্ক্রিন। রায় ঘোষণার প্রতিটি মুহূর্ত চোখের সামনে দেখতে জড়ো হয়েছিলেন বহু মানুষ। সকাল থেকেই একদিকে উৎকণ্ঠা, অপেক্ষা, আশঙ্কা, উত্তেজনা, ওপার বাংলার নানা ছবি ফুটে উঠেছে। একদিকে যখন হাসিনার বিরুদ্ধে মামলার রায়ের অংশ পড়া হচ্ছে, ঠিক তখনই ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ভাঙতে যায় বিক্ষোভকারীরা। দুটি এক্সকাভেটর নিয়ে যাওয়া হয়।

অন্যদিকে, রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে অশান্তির আশঙ্কায় গোটা বাংলাদেশে রবিবার সকাল থেকেই রেড অ্যালার্ট জারি রয়েছে। সেনা ও পুলিশের ছয়লাব করে দেওয়া হয় গলি থেকে রাজপথ। সচিবালয়, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-সহ একাধিক জায়গায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। নিরাপত্তা বাড়ানো হয় উপদেষ্টাদের‌ অফিস ও বাসভবনের। রবিবার রাতে ঢাকার সেন্ট্রাল রোড এলাকায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং জলসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বাড়ির সামনে দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।‌ তাতে কেউ হতাহত হননি। ঢাকার বাংলা মোটর এলাকায় জাতীয় নাগরিক পার্টির অফিসের সামনেও রবিবার রাতে ককটেল বিস্ফোরণ হয়। সেখানেও কেউ হতাহত হননি। তবে আতঙ্ক ছড়িয়েছে ঢাকা সহ গোটা দেশে। ‌

News/News/ইউনুসের দাবিতে মান্যতা! হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডই দিল ট্রাইবুনাল, বাংলাদেশে হিংসার শঙ্কা