রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নন, তত্ত্বাবধায়ক! বাংলাদেশ নির্বাচন-পরবর্তী ইউনূসের কী হবে?
এই বাংলাদেশ নির্বাচনে হাসিনার দল আওয়ামী লিগ অংশগ্রহণ করতে পারেনি। শেখ হাসিনা জানান, বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামী লিগ ছাড়া এই ভোটকে ‘প্রত্যাখ্যান’ করেছেন।
২০২৪ সালের ৫ অগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে অনুঘটক করে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভের জেরে পতন হয়েছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লিগ সরকারের। তারপর ৮ অগস্ট মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। দেড় বছর পর এই অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এই আবহে মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের গত প্রায় আঠারো মাসের সাফল্য-ব্যর্থতার প্রশ্নে নানা আলোচনা চলছে রাজনৈতিক মহলে।

বাংলাদেশের অন্তর্বতী সরকারের দিক থেকে বরাবরই বলা হয়েছে, তাদের মূল্য লক্ষ্য ছিল তিনটি- সংবিধান-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত 'মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার' এবং সরকার ঘোষিত রূপরেখার মধ্যেই সংসদ নির্বাচন আয়োজন। এসব ক্ষেত্রে 'সফল' কিংবা যথেষ্ট অগ্রগতির দাবি করা হয়েছে ইউনূসের দিক থেকে। তবে ইউনূস আগেই বলেছিলেন, নির্বাচন পরবর্তী সরকারের অংশ হওয়ার কোনও আগ্রহ তাঁর নেই। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, তাদের দায়িত্ব হল-যে রূপান্তর চলছে, সেটা ঠিক মতো শেষ করা এবং যখন তারা নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন, তখন জনগণ যেন সন্তুষ্ট থাকে।
তত্ত্বাবধায়ক, রাজনৈতিকক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০০৪ সালের ৮ অগাস্ট ক্ষমতায় এসেছিল ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার। এরপর থেকেই তিনি 'সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনকেই' তার সরকারের মূল এজেন্ডা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার চাপের মুখে প্রথমে প্রধান উপদেষ্টা ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে নির্বাচনের কথা বলেছিলেন। পরে এক পর্যায়ে বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনার পর সরকার ও বিএনপি যৌথভাবে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের ঘোষণা করে। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে সংস্কার প্রশ্নে গণভোটও হয়েছে। আর সেখানে একজন নিরপেক্ষ পরিচালক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছেন ইউনূস।
২০০৬ সালে অধ্যাপক ইউনূস যখন নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হলেন তখন একই সঙ্গে গ্রামীণ ব্যাংকও পেয়েছিল নোবেল পুরস্কার। বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার পর ১৯৭২ সালে অর্থনীতি বিভাগের প্রধান হিসাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন ড. ইউনূস। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষের কারণে দারিদ্র্যের অর্থনৈতিক দিকগুলি অধ্যয়ন শুরু করেন । তিনি তখন অনুধাবণ করেন শুধুমাত্র কৃষি প্রশিক্ষণই ভূমিহীন দরিদ্রদের বিশাল জনগোষ্ঠীকে উপকৃত করবে না। কারণ ভূমিহীন কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার চেয়ে তার অর্থনৈতিক অবস্থাকে পরিবর্তন করা বেশি জরুরী বলে মনে করেন ড. ইউনূস। ১৯৭৬ সালে এই লক্ষ্যে ইউনূস ‘মাইক্রো’ ঋণের একটি প্রোগ্রাম শুরু করেছিলেন। এই ক্রেডিট সিস্টেম যা বাংলাদেশের দারিদ্র্যের সম্মুখীন হওয়া মানুষের চাহিদা মেটাতে ডিজাইন করেন তিনি। ঋণগ্রহীতাদের মাঝে তিনি ২৫ ডলারের মতো ঋণ দেয়ার পরিকল্পনা করেন। বাংলাদেশ সরকার গ্রামীণ ব্যাংক প্রকল্পকে ১৯৮৩ সালে একটি স্বতন্ত্র ব্যাংকে পরিণত করে।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ
মুহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ধাক্কা খেয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ অগস্ট গণঅভ্যুত্থানের চাপে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে ভারতে চলে আসেন শেখ হাসিনা। একাধিক বার তাঁর প্রত্যর্পণ চেয়ে নয়া দিল্লিকে চিঠি দিয়েছে ঢাকা। কিন্তু এখনও ভারত তার জবাব দেয়নি। দুই দেশের সুসম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে এটা প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, ইতিমধ্যে একটি মামলায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে। এ মামলার অপর আসামি পুলিশের আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনকে ( রাজসাক্ষী) পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে গত দেড় বছরের বেশি সময়ে মানবাধিকার সংগঠক ও সংস্থাগুলোর কাছে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে অজ্ঞাতনামা মৃতদেহের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, কারা ও নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু, আর মব সন্ত্রাস। এই সময়কালে বারবার সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনা আলোচনায় এসেছে।
এমনকী এবার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরেও বাড়িতে আগুন, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে ভালুকায় পিটিয়ে আগুন দিয়ে দিপু চন্দ্র দাসকে হত্যা এবং পর পর কয়েকজন হিন্দু ব্যবসায়ী খুন হওয়ার ঘটনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর – অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ১৪ মাসে দেশে অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এসেছে। যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতাকে জটিল করে তোলে। পাশাপাশি, গত বছরের ডিসেম্বরে ইনকিলাব মঞ্চের বিশিষ্ট ছাত্রনেতা শরীফ ওসমান হাদির হত্যার পর সে দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। এই অস্থির সময়ে দেশের নিরাপত্তা, ন্যায্যতা এবং জনসাধারণের আস্থা ফেরাতে একজন নির্দলীয় ইউনূসের প্রয়োজন। তবে 'প্রধান উপদেষ্টা' হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ২০২৪ সালের আগস্টে নির্বাসন থেকে ফিরে আসা ইউনূস এই নির্বাচনের পর পদত্যাগ করছেন।
সমালোচনা
নির্বাচনের আগে সে দেশে অপ্রচার নিয়ে সরব হয়েছিলেন ইউনূস। গত জানুয়ারিতে তিনি রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্কের কাছে সহায়তা চেয়েছিলেন। সে সময় তিনি বলেন, ‘নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অপপ্রচারের এক বিশাল বন্যা বয়ে যাচ্ছে।’ ইউনূস আরও বলেন, ‘এসব অপপ্রচার বিদেশি সংবাদমাধ্যম এবং স্থানীয় উৎস-উভয় দিক থেকেই আসছে।’ যদিও বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘প্রহসনের ভোট’ বলেছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি জানান, দেশের মানুষ এই ভোটকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। হাসিনা ফেসবুকে লেখেন, ‘অবৈধ এবং অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা দখলকারী ইউনূসের আজকের তথাকথিত নির্বাচন ছিল মূলত একটি সুপরিকল্পিত প্রহসন। জনগণের ভোটাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সংবিধানের চেতনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আয়োজন করা হয়েছে আওয়ামী লীগবিহীন- ভোটারবিহীন প্রতারণামূলক নির্বাচন।’
হাসিনা এখানেই থামেননি। তিনি ভোট কেনাবেচা, কারচুপির অভিযোগও করেছেন। ভোটে হিংসা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হাসিনা লেখেন, ‘১১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পর থেকেই ভোটকেন্দ্র দখল, গোলাগুলি, ভোট কেনাবেচা করতে টাকার ছড়াছড়ি, ব্যালট পেপারে সিল প্রদান এবং ফলাফল শিটে এজেন্টদের স্বাক্ষর গ্রহণের মধ্যে দিয়েই এই প্রহসনের সূচনা হয়।’ এই বাংলাদেশ নির্বাচনে হাসিনার দল আওয়ামী লিগ অংশগ্রহণ করতে পারেনি। হাসিনা জানান, বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামী লিগ ছাড়া এই ভোটকে ‘প্রত্যাখ্যান’ করেছেন। তিনি লেখেন, ‘আওয়ামী লিগ বিহীন এই ভোট জনগণ বর্জন ও প্রত্যাখ্যান করেছেন।’ হাসিনার অভিযোগ, আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের জোর করে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছে। এ জন্য তাঁদের ‘ভয় দেখানো হয়েছে’। গত কয়েক দিন তাঁদের উপরে ‘হামলা’ও হয়েছে। হাসিনার কথায়, ‘সকল ভয়ভীতি উপেক্ষা করে তাঁরা এই প্রতারণামূলক নির্বাচন বর্জন ও প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে দেশের অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রই ছিল কার্যত ভোটারশূন্য।’ ঢাকায় ভোটারের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন হাসিনা। তিনি জানিয়েছেন, এই বিষয়টি ‘অবিশ্বাস্য’। এই নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁর দলের নেতারাও।
E-Paper











