'MGNREGA' বাতিল করে নতুন আইন? গ্রামীণ কর্মসংস্থান ব্যবস্থায় যুগান্তকারী বদলের প্রস্তাব
নতুন এই বিল গ্রামীণ কর্মসংস্থানে একদিকে যেমন কাজের দিন বাড়ানোর আশ্বাস দিচ্ছে, তেমনই অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বের ভার রাজ্যগুলির উপর বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক ও নীতিগত বিতর্ক শুরু হয়েছে।
গ্রামীণ কর্মসংস্থান ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের পথে হাঁটতে চলেছে কেন্দ্র। মহাত্মা গান্ধী গ্রামীণ রোজগার গ্যারান্টি অধিনিয়ম বা মনরেগা প্রকল্প বিলোপ করে গ্রামীণ রোজগার যোজনায় নয়া বিল আনছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। প্রথমে কথা ছিল, নতুন বিলের নাম রাখা হবে ‘পূজ্য বাপু গ্রামীণ রোজগার যোজনা।' তবে শেষ মুহূর্তে সেই নামে আনা হয়েছে বদল।নতুন বিলের নাম রাখা হয়েছে, 'বিকশিত ভারত গ্যারান্টি ফর রোজগার ও আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ) ২০২৫।' যার সংক্ষিপ্ত রূপ, ‘ভিবি জি রাম জি।' কেন্দ্রের তরফে জানানো হয়েছে, একটি গ্রামীণ বিকাশ মডেল তৈরির উদ্দেশ্যেই এই নয়া আইন। ২০৪৭ সালে বিকশিত ভারত মিশনকে ফোকাস রেখেই তৈরি করা হয়েছে।

১২৫ দিনের কর্মসংস্থানের গ্যারান্টি
'ভিবি জি রাম জি বিল ২০২৫' অনুযায়ী, গ্রামের প্রতিটি পরিবার বছরে ১২৫ দিনের কাজ ও মজুরি গ্যারান্টি পাবে। এই গ্যারান্টি সেইসব গ্রামীণ পরিবারগুলিকে প্রদান করা হবে, যাদের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যরা স্বেচ্ছায় অদক্ষ কায়িক পরিশ্রম করতে আগ্রহী। যদিও বিশেষ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৫০ দিনের কাজের সুযোগ থাকলেও, নতুন বিলে তা স্থায়ীভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে ২০০৫ সালে তৈরি বর্তমানে মনরেগা প্রকল্প ১০০ দিনের কর্মসংস্থানের গ্যারান্টি প্রদান করে। সরকার জানিয়েছে, এই বিলের লক্ষ্য হল,'একটি সমৃদ্ধ এবং স্থিতিস্থাপক গ্রামীণ ভারতের জন্য ক্ষমতায়ন, উন্নয়নকে উৎসাহিত করা।'এই নতুন বিলটিকে 'বিকশিত ভারত ২০৪৭'-এর জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে গ্রামীণ উন্নয়ন কাঠামোকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
কেন্দ্র-রাজ্যের মধ্যে ব্যয়ের ভাগ
নতুন বিলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে অর্থ বরাদ্দে। মনরেগা-তে যেখানে মজুরির সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছিল কেন্দ্রের, সেখানে 'ভিবি জি রাম জি' প্রকল্পে রাজ্যগুলিকেও ব্যয়ের ভাগ নিতে হবে। উত্তর-পূর্ব ও হিমালয় রাজ্য এবং কিছু কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ক্ষেত্রে কেন্দ্র-রাজ্য ব্যয়ের অনুপাত হবে ৯০:১০। অন্যান্য রাজ্যের ক্ষেত্রে এই অনুপাত হবে ৬০:৪০। তবে যেসব কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিধানসভা নেই, সেখানে সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করবে কেন্দ্র।
নির্দিষ্ট বরাদ্দ
মনরেগা প্রকল্পের লেবার বাজেট ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন বিলে আনা হয়েছে ‘নর্মেটিভ অ্যালোকেশন।' অর্থাৎ, কেন্দ্র আগেই রাজ্য-ভিত্তিক নির্দিষ্ট তহবিল বরাদ্দ করবে। এই বরাদ্দের অতিরিক্ত ব্যয় হলে, সেই খরচ বহন করতে হবে রাজ্য সরকারকেই। পাশাপাশি 'ভিবি জি রাম জি বিল ২০২৫' অনুযায়ী, শ্রমিকদের মজুরি সাপ্তাহিক ভিত্তিতে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে মনরেগা-র মতো মজুরি দিতে দেরি হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নতুন বিলে রাখা হয়নি। যদিও মজুরির হার আগের মতোই বহাল থাকবে।
কাজ বন্ধের বিধান
প্রথমবারের মতো নতুন বিলে কৃষির ব্যস্ত মৌসুমে কাজ বন্ধ রাখার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বছরে সর্বোচ্চ ৬০ দিন, বীজ বপন ও ফসল কাটার সময়, রাজ্য সরকার নির্ধারিত সময়ে গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকবে। এর ফলে কৃষিকাজে পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া যাবে বলে দাবি কেন্দ্রের। তবে এতে কার্যত ১২৫ দিনের কাজ পাওয়ার সময়সীমা কমে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা। সব মিলিয়ে, নতুন এই বিল গ্রামীণ কর্মসংস্থানে একদিকে যেমন কাজের দিন বাড়ানোর আশ্বাস দিচ্ছে, তেমনই অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বের ভার রাজ্যগুলির উপর বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক ও নীতিগত বিতর্ক শুরু হয়েছে।
মনরেগা প্রকল্প কী?
মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি আইন (মনরেগা) হল একটি ভারতীয় শ্রম আইন এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা যার লক্ষ্য 'সকলের কাজের অধিকার' নিশ্চিত করা। এটি প্রথমে জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি আইন ২০০৫ নামে পরিচিত ছিল। এই প্রকল্পটি একটি ফ্ল্যাগশিপ প্রোগ্রাম, যার লক্ষ্য গ্রামীণ পরিবারের জীবিকা নিরাপত্তা উন্নত করা, যার মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের বয়স্ক সদস্যরা স্বেচ্ছায় অদক্ষ কায়িক শ্রমে নিযুক্ত হন, তাদের আর্থিক বছরে কমপক্ষে ১০০ দিনের নিশ্চিত কর্মসংস্থান প্রদান করা হয়। মনরেগা বিশ্বের বৃহত্তম কর্ম গ্যারান্টি প্রোগ্রামগুলির মধ্যে একটি, যা ২০০৫ সালে গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রক দ্বারা চালু করা হয়েছিল। ২০২২-২৩ সালের মধ্যে, মনরেগা-র অধীনে প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি সক্রিয় কর্মী রয়েছেন। এই প্রকল্পের লক্ষ্য অধিকার-ভিত্তিক কাঠামোর মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্যের কারণগুলি মোকাবিলা করা। এই প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ মহিলা হতে হবে।












