গণপতি ও শনিদেবের মধ্যে একবার বিরাট সংঘাত বাধে! কেন সেই যুদ্ধ হয়? জানুন পৌরাণিক কাহিনি
কেন তৈরি হয়েছিল গণপতি ও শনিদেবের মধ্যে বিবাদ? কীভাবে শনিদেবের দৃষ্টিতে গণেশের মস্তক ভস্মীভূত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল? পরবর্তীতে কীভাবে তাঁদের মধ্যে যুদ্ধ ও বিরোধের সৃষ্টি হয়?
সনাতন হিন্দু ধর্মে সিদ্ধিদাতা শ্রী গণেশ এবং কর্মফলদাতা শনিদেব—উভয়েই অত্যন্ত প্রভাবশালী ও পূজনীয় দেবতা। কিন্তু হিন্দু পুরাণ ও শাস্ত্রের পাতায় এই দুই দেবতার সম্পর্কের মধ্যে এক অলৌকিক ও টানটান রহস্যময় ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়। জ্যোতিষশাস্ত্র ও বৈদিক সংস্কৃতিতে একাত্ব থাকলেও, পৌরাণিক উপাখ্যানে বিঘ্নহর্তা গণপতি এবং গ্রহরাজ শনিদেবের মধ্যে এক বিশেষ বিবাদ ও সংঘাতের বিবরণ রয়েছে।

কেন তৈরি হয়েছিল গণপতি ও শনিদেবের মধ্যে বিবাদ? কীভাবে শনিদেবের দৃষ্টিতে গণেশের মস্তক ভস্মীভূত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল? পরবর্তীতে কীভাবে তাঁদের মধ্যে যুদ্ধ ও বিরোধের সৃষ্টি হয়?—এই সমস্ত কাহিনি জেনে নিন।
বিবাদের বীজ: শনিদেবের অভিশাপ ও গোপালরূপী গণেশ দর্শন
গণেশ ও শনিদেবের মধ্যে বিবাদের মূল কাহিনিটি ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে (Brahmavaivarta Purana) অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।
শনিদেবের প্রতি স্ত্রীর অভিশাপ: একদা শনিদেব ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ধ্যানে অত্যন্ত মগ্ন ছিলেন। সেই সময় তাঁর স্ত্রী তাঁর কাছে এলেও শনিদেব ধ্যানে মগ্ন থাকায় স্ত্রীর দিকে ফিরেও তাকাননি। এতে শনিদেবের স্ত্রী অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে অভিশাপ দেন যে, ‘আজ থেকে তুমি যার দিকেই সরাসরি কৌতূহল বা পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাবে, সে-ই ধ্বংস বা ভস্মীভূত হয়ে যাবে।’
দেবী পার্বতীর দরবারে শনিদেব: দেবী পার্বতী দীর্ঘ তপস্যার পর এক রূপবান পুত্র (গণেশ) লাভ করলে কৈলাসে সমস্ত দেব-দেবী বালককে দর্শন ও আশীর্বাদ করতে আসেন। শনিদেবও সেখানে উপস্থিত হন, কিন্তু স্ত্রীর অভিশাপের কথা মনে রেখে তিনি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকেন এবং বালকের দিকে তাকাচ্ছিলেন না।
দেবী পার্বতীর কৌতূহল ও মস্তক ভস্ম: দেবী পার্বতী শনিদেবের মুখ ফিরিয়ে থাকার কারণ জানতে পেরে সহাস্যে বলেন যে, শিব ও শক্তির পুত্রের ওপর কোনো অভিশাপ কাজ করবে না। তিনি শনিদেবকে শিশু গণেশকে দেখার অনুরোধ জানান। দেবী পার্বতীর বারবার অনুরোধে শনিদেব কেবল একপলকের জন্য বালকের মুখের দিকে তাকান। অমনি শনিদেবের দৃষ্টির তেজে শিশু গণেশের মস্তক বিচ্ছিন্ন হয়ে গোলকধামে চলে যায়। পুত্রহারা পার্বতী শোকে আচ্ছন্ন হয়ে শনিদেবকে চরম অভিশাপ দিতে উদ্যত হন এবং এই ঘটনা থেকেই শনিদেবের প্রতি কৈলাসের ক্ষোভ ও বিবাদের সূচনা হয়।
পৌরাণিক যুদ্ধে গণেশ ও শনিদেবের মুখোমুখি সংঘাত
পরবর্তীকালে গণপতির গজমুণ্ড (হাতির মাথা) সংস্থাপনের মাধ্যমে তিনি পুনর্জীবন লাভ করলেও, বিভিন্ন আঞ্চলিক পৌরাণিক কথা ও গণেশ পুরাণে গণপতি ও শনিদেবের মধ্যে এক প্রত্যক্ষ যুদ্ধের উল্লেখ পাওয়া যায়:
আঘাত ও শনিদেবের পঙ্গুত্ব সংক্রান্ত উপাখ্যান: এক পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, বয়ঃপ্রাপ্তির পর শনিদেবের প্রভাব ও তাঁর দৃষ্টির অহংকার দমন করতে গণপতি শনিদেবকে চ্যালেঞ্জ জানান। শনিদেব তাঁর অশুভ দৃষ্টি দিয়ে গণেশকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করলে বিঘ্নহর্তা গণেশ নিজের বিশাল রূপ ধারণ করেন। গণপতি তাঁর শুঁড় দিয়ে শনিদেবকে তুলে আছাড় মারেন। এই যুদ্ধে শনিদেব মারাত্মক আহত হন এবং কথিত আছে, গণেশের আঘাতের কারণেই শনিদেবের পায়ে আঘাত লাগে এবং তিনি ধীরগতিসম্পন্ন বা পঙ্গু হয়ে যান।
সমর্পন ও ভক্তদের জন্য চুক্তি: যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে শনিদেব বুঝতে পারেন যে গণপতি সাধারণ কোনো দেবশিশু নন, বরং স্বয়ং পরমব্রহ্ম। শনিদেব গণেশের শরণাপন্ন হন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
বিবাদের পরিণতি: গণেশভক্তদের ওপর শনির প্রভাবমুক্তির বরদান
গণপতি ও শনিদেবের এই সংঘাত কেবল যুদ্ধের শেষেই থমকে থাকেনি, তা ভক্তদের জন্য এক মহা আশীর্বাদে পরিণত হয়:
- শনির কোপ থেকে মুক্তির উপায়: শনিদেব গণপতির কাছে প্রতিশ্রুতি দেন যে, যারা শ্রী গণেশের নিষ্ঠাভরে পুজো করবে, তাঁদের ওপর শনির 'সাড়ে সাতি' বা 'ঢাইয়া'-র কোনো অশুভ প্রভাব পড়বে না।
- সংযম ও অহংকার নাশের শিক্ষা: এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে, শনিদেব কর্মের ফলদাতা হলেও অহংকার ও অশুভ দৃষ্টির পরিণাম সবসময় পতনের কারণ হয়। গণপতির সিদ্ধি ও প্রজ্ঞার সামনে সমস্ত গ্রহের কোপ নতি স্বীকার করতে বাধ্য।
গণপতি ও শনিদেবের বিবাদের এই পৌরাণিক উপাখ্যান আমাদের ভক্তি, প্রজ্ঞা ও কর্মফলের এক গভীর শিক্ষা দেয়। শনিদেবের দৃষ্টিতে মস্তক ছিন্ন হওয়া থেকে শুরু করে যুদ্ধ—প্রতিটি ঘটনাই শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করে যে, গণপতির শরণাপন্ন হলে জীবনের সমস্ত গ্রহদোষ ও অশুভ প্রভাব কাটিয়ে পরম শান্তি লাভ করা সম্ভব।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


