কীভাবে গণপতি পেলেন হাতির মাথা? জানুন পৌরাণিক কাহিনি ও শাস্ত্রীয় রহস্য

সনাতন হিন্দু শাস্ত্র ও বিভিন্ন পুরাণে—বিশেষ করে শিব পুরাণ, বা ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ এবং পদ্ম পুরাণে এই বিষয়ে অত্যন্ত রোমাঞ্চকর ও শিক্ষাগ্রাহ্য কাহিনি বর্ণিত রয়েছে।

Published on: Sep 14, 2026, 09:08:05 IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

সনাতন বৈদিক ধর্মে বিঘ্নহর্তা, সিদ্ধিদাতা এবং সর্বাগ্রে পূজ্য দেব রূপ হিসেবে শ্রী গণেশের আরাধনা করা হয়। হিন্দু ধর্মে যেকোনো শুভ কাজ, পুজো বা উৎসব শুরু করার আগে ভগবান গণপতির বন্দনা করা সুপ্রাচীন রীতি। কিন্তু গণেশের মানব শরীরের ওপর গজ বা হাতির মাথা কীভাবে যুক্ত হলো? দেব সেনাপতি বা পার্বতীপুত্র কীভাবে 'গজানন' নামে পরিচিত হলেন?

কীভাবে গণপতি পেলেন হাতির মাথা? জানুন পৌরাণিক কাহিনি ও শাস্ত্রীয় রহস্য
কীভাবে গণপতি পেলেন হাতির মাথা? জানুন পৌরাণিক কাহিনি ও শাস্ত্রীয় রহস্য

সনাতন হিন্দু শাস্ত্র ও বিভিন্ন পুরাণে—বিশেষ করে শিব পুরাণ, বা Brahmavaivarta Purana (ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ) এবং পদ্ম পুরাণে এই বিষয়ে অত্যন্ত রোমাঞ্চকর ও শিক্ষাগ্রাহ্য কাহিনি বর্ণিত রয়েছে। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী কীভাবে পার্বতীনন্দন হাতির মাথা লাভ করলেন, তা জেনে নিন।

শিব পুরাণের কাহিনি: দেবী পার্বতীর গায়ে জমে থাকা উবটান এবং নন্দীর অনুপস্থিতি

শিব পুরাণে বর্ণিত কাহিনীটি বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে প্রচলিত ও জনপ্রিয়:

বালক গণেশের সৃষ্টি ও পাহারাদারি: একদিন কৈলাসে দেবী পার্বতী স্নান করতে যাওয়ার আগে অনুচর নন্দীকে দরজায় পাহারা দিতে নির্দেশ দেন। কিন্তু মহাদেব শিব ফিরে এলে নন্দী তাঁকে না আটকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেন। এতে দেবী পার্বতী কিছুটা লজ্জিত ও অসন্তুষ্ট হন এবং অনুভব করেন যে তাঁর সম্পূর্ণ অনুগত ও নিজস্ব কোনো রক্ষী প্রয়োজন। এরপর তিনি নিজের গায়ের হলুদ ও উবটান (চন্দনের প্রলেপ) দিয়ে এক সুপুরুষ বালকের মূর্তি গড়েন এবং তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন। দেবী তাঁর এই পুত্রকে স্নানাগারের দ্বারে পাহারা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

মহাদেব শিবের আগমন ও যুদ্ধ: কিয়ৎক্ষণ পর ভগবান শিব স্নানাগারে প্রবেশ করতে গেলে বালক গণেশ তাঁকে বাধা দেন। বালক গণেশ জানতেন না যে শিবই তাঁর পিতা। অন্যদিকে মহাদেবও বালকের পরিচয় জানতেন না। পাহারাদার বালকের জেদ ও বাধা দেখে শিবের অনুচরেরা (গণ) যুদ্ধ শুরু করেন, কিন্তু বালক একাই সকলকে পরাস্ত করেন। অবশেষে ক্ষুব্ধ হয়ে মহাদেব শিব তাঁর ত্রিশূল দিয়ে বালকের মস্তক ছেদন করেন।

দেবী পার্বতীর রুদ্ররূপ ও হাতির মাথা সংস্থাপন: পুত্রহত্যার খবর পেয়ে দেবী পার্বতী চণ্ডীরূপ ধারণ করেন এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ধ্বংস করতে উদ্যত হন। পরিস্থিতি শান্ত করতে ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর মধ্যস্থতায় শিব অনুশোচনা করেন এবং দেবগণকে নির্দেশ দেন উত্তর দিকে মুখ করে ঘুমিয়ে থাকা প্রথম কোনো প্রাণীর মাথা কেটে নিয়ে আসতে। শিব অনুচরেরা উত্তর দিকে একটি একদন্ত হাতির সন্ধান পান। সেই হাতির মাথা এনে বালকের ধড়ে যুক্ত করে মহাদেব তাতে প্রাণ সঞ্চার করেন। শিব তাঁকে নিজের 'গণ'-এর অধিপতি হিসেবে ঘোষণা করে 'গণপতি' নাম দেন এবং আশীর্বাদ করেন যে মর্ত্যে সর্বাগ্রে তাঁর পুজো হবে।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের কথা: শনিদেবের দৃষ্টি ও গজানন রূপ

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে আবার এই ঘটনাটির একটি ভিন্ন ও অলৌকিক রূপ বর্ণনা করা হয়েছে:

শনিদেবের কু-দৃষ্টি: দেবী পার্বতী দীর্ঘ তপস্যার পর এক রূপবান পুত্র লাভ করলে কৈলাসে সমস্ত দেব-দেবী ও গ্রহমণ্ডলী বালককে দর্শন ও আশীর্বাদ করতে আসেন। কিন্তু গ্রহরাজ শনিদেব চোখ নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। দেবী পার্বতী শনিদেবকে কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, শাপগ্রস্ত হওয়ার কারণে তিনি যার দিকেই সোজা দৃষ্টিতে তাকাবেন, সে ভস্মীভূত হয়ে যাবে।

মস্তক ভস্ম ও গজমুণ্ড সংযোজন: দেবী পার্বতীর বিশেষ অনুরোধে শনিদেব কৌতূহলবশত বালকের মুখের দিকে একপলক তাকান। শনিদেবের দৃষ্টি পড়ামাত্রই বালকের মস্তক বিচ্ছিন্ন হয়ে গোলকধামে চলে যায়। পুত্রহারা পার্বতীর বিলাপ দেখে ভগবান বিষ্ণু দ্রুত গরুড়ে চেপে পুষ্পভদ্রা নদীর তীরে যান এবং সেখানে ঘুমিয়ে থাকা একটি হাতির মাথা কেটে এনে বালকের শরীরে যুক্ত করেন।

হাতির মাথার আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক প্রতীকী অর্থ

হিন্দু দর্শনে গণপতির এই গজমুণ্ড কেবল একটি পৌরাণিক ঘটনা নয়, এর পেছনে গভীর আধ্যাত্মিক বার্তা রয়েছে:

  • বিশাল কান ও ছোট মুখ: হাতির বড় কান ইঙ্গিত দেয় ভালো শ্রোতা হওয়ার (প্রভূত শ্রবণশক্তি), আর ছোট মুখ নির্দেশ করে কম কথা বলে কাজে মনোনিবেশ করা।
  • বিশাল মস্তক (প্রজ্ঞা ও মেধা): হাতির বড় মাথা হলো প্রখর মেধা, জ্ঞান এবং গভীর চিন্তাশক্তির প্রতীক।
  • স শুঁড় (নমনীয়তা ও ক্ষমতা): হাতির শুঁড় যেমন বড় গাছ উপড়ে ফেলতে পারে, তেমনই সূক্ষ্ম সূচও তুলতে পারে। এটি জীবনের নমনীয়তা এবং চরম শক্তির রূপক।

পৌরাণিক ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি গল্পই আমাদের শেখায় অহংকার নাশ, ভক্তি ও পরম মেধার জয়গান। গজানন রূপ লাভ করার মাধ্যমেই বালক গণেশ হয়ে ওঠেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিঘ্নহর্তা ও সকল দেবমাতা-পিতাস্বরূপ সর্বাগ্রে পূজ্য গণপতি।

  • Suman Roy
    ABOUT THE AUTHOR
    Suman Roy

    সুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More