সিদ্ধি ও ঋদ্ধির সঙ্গে কীভাবে গণপতির বিবাহ হয়? জানুন গণেশের ক্ষোভের পৌরাণিক কাহিনি

কেন গণপতি বিবাহ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন? কীভাবে বিঘ্নহর্তা গণেশ অন্যান্য দেবতাদের বিয়েতে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে শুরু করেছিলেন? এবং অবশেষে কীভাবে ব্রহ্মা দেবের মধ্যস্থতায় ঋদ্ধি ও সিদ্ধির সাথে গণেশজির মহাসমারোহে বিবাহ সম্পন্ন হলো?

Published on: Sep 14, 2026, 17:57:12 IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

সনাতন বৈদিক ধর্মে সিদ্ধিদাতা শ্রী গণেশ হলেন বিঘ্নহর্তা, প্রজ্ঞা ও পরম ব্রহ্মের কারক। ভক্তদের ঘরে ঘরে যখন গণপতির মূর্তি বা ছবি স্থাপন করা হয়, তখন তাঁর দু পাশে দেখা যায় দুই দেবী—'ঋদ্ধি' (Riddhi) এবং 'সিদ্ধি' (Siddhi)-কে। কিন্তু আপনারা কি জানেন, তুলসী দেবীর অভিশাপের কারণে যিনি নিজেকে চিরকুমার বা ব্রহ্মচারী হিসেবে রাখতে চেয়েছিলেন, সেই গজানন গণপতির সাথে কীভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন প্রজাপতি ব্রহ্মার এই দুই মানসকন্যা?

সিদ্ধি ও ঋদ্ধির সঙ্গে কীভাবে গণপতির বিবাহ হয়? জানুন গণেশের ক্ষোভের কাহিনি
সিদ্ধি ও ঋদ্ধির সঙ্গে কীভাবে গণপতির বিবাহ হয়? জানুন গণেশের ক্ষোভের কাহিনি

কেন গণপতি বিবাহ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন? কীভাবে বিঘ্নহর্তা গণেশ অন্যান্য দেবতাদের বিয়েতে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে শুরু করেছিলেন? এবং অবশেষে কীভাবে ব্রহ্মা দেবের মধ্যস্থতায় ঋদ্ধি ও সিদ্ধির সাথে গণেশজির মহাসমারোহে বিবাহ সম্পন্ন হলো?—এই সমস্ত অলৌকিক পৌরাণিক ও শাস্ত্রীয় উপাখ্যান জেনে নিন।

বিবাহের পটভূমি: গণপতির প্রতিজ্ঞা ও অন্য দেবগণের বিয়েতে বিঘ্ন সৃষ্টি

পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, তুলসী দেবীর দেওয়া অভিশাপের পর শ্রী গণেশ মনস্থির করেন যে তিনি কোনোদিন বিবাহ করবেন না এবং ব্রহ্মচর্য পালন করবেন। কিন্তু নিজের গজানন (হাতির মস্তকযুক্ত) রূপের কারণে তিনি অনুভব করেন যে সাধারণ কোনো দেবকন্যা তাঁর উপযুক্ত সঙ্গিনী হতে পারবেন না।

গণপতির ক্ষোভ ও বাহন ইঁদুরের ভূমিকা: কৈলাসে ও স্বর্গলোকে যখন অন্যান্য দেব-দেবীদের (যেমন দেব সেনাপতি কার্তিক বা অন্যান্য দেবগণ) শুভ বিবাহ মহা সমারোহে সম্পন্ন হচ্ছিল, তখন গজানন রূপের কারণে নিজেকে অবিবাহিত দেখে গণপতির মনে কিছুটা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। গণপতি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি নিজে বিয়ে না করলে অন্য দেবতাদের বিয়েতেও কোনো বিঘ্ন ছাড়া কাজ হতে দেবেন না!

বিয়েতে বাধা সৃষ্টি: গণপতি তাঁর বাহন ইঁদুরদের (মুশিক বাহিনী) নির্দেশ দেন যেকোনো দেবতার বিয়ের মণ্ডপে গিয়ে খুঁটি, মণ্ডপ ও সাজসজ্জার গোড়া কেটে দিতে। এর ফলে অন্য দেবতাদের বিবাহে একের পর এক অমঙ্গল ও বাধা দেখা দিতে শুরু করে। বিরক্ত ও চিন্তিত হয়ে দেবগণ প্রজাপতি ব্রহ্মা দেবের শরণাপন্ন হন।

ব্রহ্মা দেবের বুদ্ধি এবং ঋদ্ধি-সিদ্ধির সৃষ্টি

দেবতাদের এই সমস্যার সমাধান করতে এবং সিদ্ধিদাতা গণেশকে শান্ত করতে সৃষ্টিপতি ব্রহ্মা এক চমৎকার কৌশল অবলম্বন করেন।

দুই মানসকন্যার জন্ম: প্রজাপতি ব্রহ্মা তাঁর যোগবল ও পরম ধ্যানশক্তির মাধ্যমে দুই অপরূপা মানসকন্যা সৃষ্টি করেন। এদের একজনের নাম রাখা হয় 'ঋদ্ধি' (যার অর্থ সমৃদ্ধি, সাফল্য ও প্রবৃদ্ধি) এবং অন্যজনের নাম 'সিদ্ধি' (যার অর্থ আত্মিক শক্তি, আধ্যাত্মিক পূর্ণতা ও শুভত্ব)।

গণপতির মনোযোগ ঘুরিয়ে দেওয়া: ব্রহ্মাদেব এই দুই কন্যাকে শ্রী গণেশের কাছে শিক্ষার জন্য পাঠান। ব্রহ্মা ঋদ্ধি ও সিদ্ধিকে নির্দেশ দেন যে, যখনই কোনো দেবতার বিবাহের বার্তা আসবে বা মণ্ডপ সাজানো হবে, তখনই তাঁরা যেন গণপতির মন অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেন এবং তাঁকে গল্প বা বিদ্যাচর্চায় মগ্ন রাখেন। ঋদ্ধি ও সিদ্ধির প্রজ্ঞা ও সেবায় গণপতি এতটাই শান্ত ও মগ্ন হয়ে পড়েন যে অন্য দেবতাদের বিয়ে কোনো বাধা ছাড়াই সম্পন্ন হতে থাকে।

গণপতির শুভ বিবাহ ও শুভ-লাভের জন্ম

অবশেষে গণপতি যখন বুঝতে পারেন যে দেবগণের বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে এবং ঋদ্ধি-সিদ্ধি ছিলেন ব্রহ্মার পরম সৃষ্টি, তখন ব্রহ্মা দেব স্বয়ং গণপতির সামনে উপস্থিত হন।

মহাসমারোহে বিবাহ: প্রজাপতি ব্রহ্মা পরম শ্রদ্ধায় ও স্নেহে তাঁর দুই কন্যা ঋদ্ধি ও সিদ্ধিকে শ্রী গণেশের হাতে সমর্পণ করে তাঁদের বিবাহের প্রস্তাব দেন। ঋদ্ধি ও সিদ্ধির অপরূপ রূপ, প্রজ্ঞা ও আচার-ব্যবহার দেখে সিদ্ধিদাতা গণেশ সানন্দে এই প্রস্তাবে সম্মত হন। দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার তৈরি সুসজ্জিত মণ্ডপে সমস্ত দেব-দেবীর উপস্থিতিতে গণপতির সাথে ঋদ্ধি ও সিদ্ধির মহাসমারোহে বিবাহ সম্পন্ন হয়।

সন্তান লাভ (শুভ ও লাভ): কালক্রমে শ্রী গণেশ ও দেবী ঋদ্ধির গর্ভে জন্ম নেন পরম শুভ পুত্র 'লাভ' (Profit/Prosperity) এবং দেবী সিদ্ধির গর্ভে জন্ম নেন পুত্র 'শুভ' (Auspiciousness)। সেই সাথে গণপতির এক কন্যা সন্তানও জন্মগ্রহণ করেন, যিনি 'সন্তোষী মা' (Goddess Santoshi) নামে পূজিতা হন।

ঋদ্ধি-সিদ্ধির আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক তাৎপর্য

হিন্দু দর্শনে গণপতির সাথে ঋদ্ধি ও সিদ্ধির সহাবস্থান কেবল একটি পৌরাণিক গল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে এক গূঢ় জীবন দর্শন রয়েছে:

  • কাজের সফলতা ও সমৃদ্ধি: গণপতি হলেন প্রজ্ঞা ও বুদ্ধির প্রতীক। যেখানে প্রজ্ঞা ও সঠিক সিদ্ধান্ত থাকে, সেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই 'সিদ্ধি' (সাফল্য) এবং 'ঋদ্ধি' (সমৃদ্ধি) অবস্থান করে।
  • শুভ ও লাভ-এর মেলবন্ধন: গণেশ পুজোয় ঘরের দরজায় বা খাতায় "শুভ-লাভ" লেখার রীতি রয়েছে। এর অর্থ হলো সঠিক বুদ্ধি ও ধর্মের মাধ্যমে অর্জিত ধনই জীবনে আসল কল্যাণ বা শুভ-লাভ নিয়ে আসে।

প্রজাপতি ব্রহ্মার সৃষ্টি এবং শ্রী গণেশের অলৌকিক প্রজ্ঞার ফলেই সম্পন্ন হয়েছিল ঋদ্ধি ও সিদ্ধির সাথে গণপতির এই মহা বিবাহ। আজ তাই প্রতিটি গণেশ পুজো ও শুভ কাজে বিঘ্নহর্তা গণপতির সাথে দেবী ঋদ্ধি ও সিদ্ধির আরাধনা করা হয়, যা ভক্তদের জীবনে পরম সুখ, সমৃদ্ধি ও সিদ্ধি সুনিশ্চিত করে।

  • Suman Roy
    ABOUT THE AUTHOR
    Suman Roy

    সুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More