গণপতির পুজোয় তুলসী ব্যবহার নিষিদ্ধ কেন? জানুন তুলসী দেবীর সঙ্গে তাঁর বিবাদের কাহিনি
কেন সিদ্ধিদাতা শ্রী গণেশের পুজোয় তুলসী পাতা অর্পণ করা হয় না? কী নিয়ে তৈরি হয়েছিল শ্রী গণেশ এবং দেবী তুলসীর মধ্যে এই পৌরাণিক সংঘাত? তুলসী দেবীর দেওয়া অভিশাপ ও গণপতির পাল্টা শাপের রহস্য কী?
সনাতন হিন্দু ধর্মে শ্রী গণেশ হলেন বিঘ্নহর্তা ও শুভ-সমৃদ্ধির কারক দেবতা, অন্যদিকে তুলসী দেবী হলেন পরম পবিত্রতা, ভক্তি ও ভগবান বিষ্ণুর প্রিয় রূপক। হিন্দু পুজো-পার্বণে তুলসী পাতার ব্যবহার অত্যন্ত কল্যাণকর ও বাধ্যতামূলক বলে গণ্য করা হয়। তবে শাস্ত্রীয় ও পৌরাণিক বিধানে এক অদ্ভুত ব্যতিক্রম দেখা যায়—ভগবান গণেশের পুজোয় ভুলেও তুলসী পত্র নিবেদন করা নিষিদ্ধ!

কেন সিদ্ধিদাতা শ্রী গণেশের পুজোয় তুলসী পাতা অর্পণ করা হয় না? কী নিয়ে তৈরি হয়েছিল শ্রী গণেশ এবং দেবী তুলসীর মধ্যে এই পৌরাণিক সংঘাত? তুলসী দেবীর দেওয়া অভিশাপ ও গণপতির পাল্টা শাপের রহস্য কী?—এই সমস্ত চমকপ্রদ পৌরাণিক কাহিনি জেনে নিন।
সংঘাতের সূত্রপাত: তুলসী দেবীর বিবাহের প্রস্তাব ও গণপতির প্রত্যাখ্যান
গণপতি ও তুলসী দেবীর মধ্যে সংঘাতের মূল কাহিনীটি 'ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ' (Brahmavaivarta Purana)-এর গণেশ খণ্ডে অত্যন্ত চমৎকারভাবে বর্ণিত রয়েছে।
গঙ্গা তীরে গণপতির তপস্যা: একদা ধর্মধ্বজের রূপসী কন্যা তুলসী গঙ্গার তীরে ভ্রমণ করছিলেন। সেই সময় তিনি বালক রূপ ছেড়ে পরম সুপুরুষ ও তেজস্বী রূপে শ্রী গণেশকে গঙ্গার তীরে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় দেখতে পান। গণপতি তখন পীতাম্বর পরিধান করে, সর্বাঙ্গে চন্দনের প্রলেপ মেখে পরম শান্তিতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ধ্যানে মগ্ন ছিলেন।
বিবাহের প্রস্তাব ও গণপতির ব্রত: গণপতির এই অনুপম রূপ ও তেজ দেখে দেবী তুলসী তাঁর প্রতি মোহিত হন এবং গণপতির ধ্যান ভঙ্গ করে তাঁর কাছে বিয়ের প্রস্তাব রাখেন। ধ্যান ভাঙার পর শ্রী গণেশ দেবী তুলসীকে বিনম্রভাবে অভিবাদন জানান এবং তাঁর আগমনের কারণ জিজ্ঞেস করেন। তুলসী নিজের মনের ইচ্ছার কথা প্রকাশ করে গণপতিকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার আকঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন।
কিন্তু প্রজ্ঞাবান সিদ্ধিদাতা গণেশ পরম শান্তভাবে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। গণপতি জানান যে তিনি ব্রহ্মচর্য ব্রত পালন করছেন এবং এই মুহূর্তে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে অনিচ্ছুক।
ক্ষোভ, অভিশাপ এবং গণপতির পাল্টা শাপের অলৌকিক ঘটনা
নিজের প্রেম ও বিবাহের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় দেবী তুলসী অত্যন্ত অপমানিত ও ক্রুদ্ধ বোধ করেন। ক্রোধের বশে তিনি নিজের কামনার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সিদ্ধিদাতা গণেশকে অভিশাপ দিয়ে বসেন।
তুলসী দেবীর অভিশাপ: দেবী তুলসী গণপতিকে শাপ দিয়ে বলেন— ‘আপনি পরম সুপুরুষ হয়েও আমার বিবাহের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন! তাই আমার অভিশাপে আপনার ব্রহ্মচর্য ব্রত ভঙ্গ হবে এবং আপনাকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও দুটি বিবাহ করতে হবে।’
গণপতির প্রতিক্রিয়া ও পাল্টা অভিশাপ: অন্যায়ভাবে অভিশাপগ্রস্ত হওয়ায় শ্রী গণেশও অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। তিনি দেবী তুলসীকে পাল্টা অভিশাপ দিয়ে বলেন— ‘আপনি অকারণে আমাকে অভিশাপ দিয়েছেন। তাই আমার অভিশাপে আপনিও এক অসুরের ঘরণী বা স্ত্রী হবেন। পরবর্তীতে দেবগণের কৃপায় উদ্ভিদে পরিণত হলেও আপনার অহংকার চূর্ণ হবে।’
ক্ষমা প্রার্থনা, অভিশাপ লাঘব এবং গণেশ পুজোয় তুলসী নিষেধের বিধান
গণপতির ভয়ঙ্কর অভিশাপ শুনে দেবী তুলসী নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং অনুশোচনায় ভেঙে পড়েন। তিনি সিদ্ধিদাতার চরণে লুটিয়ে পড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
- গণপতির দয়ালু রূপ ও শাপ লাঘব: দেবী তুলসীর ব্যাকুলতা দেখে দয়ালু গণপতি তাঁর অভিশাপ কিছুটা লাঘব করেন। তিনি বলেন— 'আমার অভিশাপ মিথ্যা হবে না। আপনি দানবরাজ শাঁখচূড়ের স্ত্রী হবেন। তবে পরবর্তীতে ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় আপনি উদ্ভিদ রূপ ধারণ করে পরম পবিত্র 'তুলসী' হিসেবে জগতে পূজিত হবেন। আপনি সমস্ত দেবতার পুজোয় এবং ভগবান বিষ্ণুর মাথায় পরম আদরে স্থান পাবেন।'
- গণেশ পুজোয় তুলসী নিষেধ: তবে গণপতি স্বীয় শাপের প্রসঙ্গ মনে রেখে এক কঠোর শাস্ত্রীয় বিধান জারি করেন। তিনি বলেন— ‘যেহেতু আপনি আমাকে অকারণে অভিশাপ দিয়েছিলেন, তাই আমার কোনো পুজো বা নৈবেদ্যে তুলসী পাতা নিবেদন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। যে ব্যক্তি আমার পুজোয় তুলসী পাতা অর্পণ করবে, তার পুজো বিফল হবে এবং সংসারে বিঘ্ন দেখা দেবে।’
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে বর্ণিত গণপতি ও তুলসী দেবীর এই সংঘাতের কাহিনীটি আমাদের শেখায় যে কাম ও ক্রোধের বশে অনুচিত সিদ্ধান্ত নিলে তার পরিণতি ভুগতেই হয়। তবে গণপতির ক্ষমার প্রভাবেই তুলসী দেবী আজ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে পরম পবিত্র উদ্ভিদের মর্যাদা লাভ করেছেন। তাই আজও গণেশ পুজোয় তুলসী পাতা বাদ দিয়েই বিঘ্নহর্তার আরতি ও আরাধনা সম্পন্ন করা হয়।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


