ফের শিরোনামে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়! সংঘর্ষে কানের পর্দা ফাটল ছাত্রের, জারি একগুচ্ছ নির্দেশিকা
এই আবহে সোমবার সকালেই কড়া পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গড়া হয়েছে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি।
আবারও খবরের শিরোনামে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। সম্প্রতি আইসিসি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয় ওঠে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। দুই দল ছাত্রের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে জখম হন দুই অধ্যাপক। শুক্রবার শিক্ষক নিগ্রহের পর সোমবার দু’দলের মধ্যে আরও একবার উত্তেজনা তৈরি হয়। কালেক্টিভ সংগঠনের সঙ্গে এসএফআইয়ের সংঘর্ষে উত্তেজনা ছড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে। আর এই ঘটনায় স্নাতকোত্তর ইংরেজি প্রথম বর্ষের ছাত্র প্রিয়ম চট্টোপাধ্যায়ের কানের পর্দা ফেটে গিয়েছে। একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনি। এরই মধ্যে ক্যাম্পাসের জন্য বিধিনিষেধ জারি করলেন কর্তৃপক্ষ।

ঘটনার সূত্রপাত ও ধারাবাহিকতা
গত কয়েক দিন ধরেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর উত্তাল অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি বা আইসিসি নির্বাচন ঘিরে। শুক্রবার বিকেলে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন পড়ুয়া-শিক্ষকেরা। তারপরই সায়েন্স-আর্টস মোড়ের কাছে ছাত্র সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে শুরু হয় বিবাদ। সেখানেই মধ্যস্থতা করতে গিয়ে জখম হয়েছেন দুই অধ্যাপক রাজ্যেশ্বর সিং এবং ললিত মাধব। জানা গিয়েছে, ওই দিন যখন শিক্ষক নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছিল, তখন প্রিয়ম চট্টোপাধ্যায় সেখানে ছিলেন। উন্মত্ত পড়ুয়ার মারের হাতে থেকে উদ্ধার করার চেষ্টা করেছিলেন তাঁদের। এসএফআইয়ের অভিযোগ, তারই জেরে সোমবার ১০-১২ জন কালেক্টিভ ছাত্র তাঁকে ঘিরে মারধর করেন। এই প্রসঙ্গে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএফআইয়ের আঞ্চলিক কমিটির সহ-সম্পাদক কৌশিকী ভট্টাচার্য বলেন, 'প্রিয়ম সে দিন শিক্ষকদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। সে কারণেই তাঁর উপর হামলা করা হল। কানের পর্দায় আঘাত লেগেছে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।'
কর্মবিরতির হুঁশিয়ারি
এদিকে, ২০ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক নিগ্রহের ঘটনায় অভিযুক্তদের শাস্তির দাবি তুলেছেন শিক্ষকদের একাংশ। দাবি পূরণ না হলে তাঁরা কর্মবিরতি পালন করবেন বলেও জানিয়েছেন। সোমবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক সমিতির তরফ থেকে উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়। তাঁদের বৈঠক স্থির হয়েছে, উপযুক্ত ব্যবস্থা না হলে আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি কর্মবিরতি পালন করবেন তাঁরা। শুধু তাই নয়, ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদ মিছিলে যোগ দেবেন। তারপরও সুরাহা না হলে, পাশাপাশি ২ মার্চ থেকে সমস্ত প্রশাসনিক কাজ থেকে নিজেদের সরিয়ে নেবেন শিক্ষকরা।
তদন্ত কমিটি
এই আবহে সোমবার সকালেই কড়া পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গড়া হয়েছে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি। ২০ ফেব্রুয়ারি যাদবপুরে শিক্ষক হেনস্থার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য। ২৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই কমিটি মুখ বন্ধ করা খামে রিপোর্ট জমা দেবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দোষীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করা হবে। এই কমিটির চেয়ারপারসন করা হয়েছে, প্রাক্তন আইএসআই ডিরেক্টর বিমল রায়কে। এছাড়া রয়েছেন কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাক্তন উপাচার্য শ্যামল রায়, বোস ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন রেজিস্ট্রার শম্পা দাস ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সহ-উপাচার্য অমিতাভ দত্ত। আধিকারিক হিসাবে থাকছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ডেপুটি রেজিস্ট্রার আবুল হাসনাথ।
একগুচ্ছ নির্দেশিকা
এদিন সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয় তরফে আরও একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে একাধিক বিধি-নিষেধের কথা জানানো হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে,
১. সন্ধ্যা ৭:০০ টা থেকে সকাল ৭:০০ টা পর্যন্ত যেকোনো উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক সকল ব্যক্তিকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত বৈধ পরিচয়পত্র বহন করতে হবে। যা প্রয়োজন অনুসারে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট থেকেও পাওয়া যাবে। তবে যদি কোন ব্যক্তির কাছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত পরিচয়পত্র না থাকে, তাহলে তাকে অন্য কোন বৈধ পরিচয়পত্র দেখাতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে রাখা একটি রেজিস্টারে যার সঙ্গে তিনি দেখা করতে যাচ্ছেন তার বিবরণ (উল্লিখিত ব্যক্তির যোগাযোগ নম্বর-সহ) লিখতে হবে।
২. এবার থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশের জন্য দুই চাকা বা চার চাকার যানবাহনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক জারি করা 'জাবি' পার্কিং স্টিকার লাগাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিকার-বিহীন যানবাহন প্রবেশের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে ক্যাম্পাসে ঢোকার কারণ জনাতে হবে।
৩. ক্যাম্পাসে কোনভাবেই মাদকদ্রব্য বা অন্যান্য অবৈধ পদার্থের ব্যবহার বা যে কোনও অবৈধ কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। যদি কেউ এই নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে, তাহলে ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
৪. সকাল ও সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণকে জনসাধারণের যাতায়াতের পথ হিসেবে ব্যবহারের উপর কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
৫. পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত রাত ৮টার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে (যেমন বিশ্ববিদ্যালয় মাঠ, ক্যান্টিনে, সুবর্ণ জয়ন্তী ভবনের বিপরীতে ইত্যাদি) সান্ধ্যকালীন ক্লাসের শিক্ষার্থীদের ছাড়া অন্য কোনও দলবদ্ধ সমাবেশ করা যাবে না। তবে উৎসব এবং অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রী কার্যকলাপের সময় শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এই নিয়মে রাশ টানা যেতে পারে।
৬. বৈধ কারণ ছাড়া অথবা রাত ৮টার পরে অনুমতি ছাড়া ক্যাম্পাসে কাউকে পাওয়া গেলে তাকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
৭. নিরাপত্তা কর্মীদের প্রতি যে কোনও ধরণের অসদাচরণ, ভীতি প্রদর্শন বা অসম্মানজনক আচরণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গুরুতর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
E-Paper

