Kolkata Red Taxi History: আইকনিক হলুদের আগে লাল ট্যাক্সি চলত কলকাতায়! কারা বানিয়েছিল সেটি? ভাড়া কত ছিল? শুনলে অবাক হবেন
হলুদের আগে চলত লাল ট্যাক্সি। সেই ট্যাক্সির ইতিহাস জেনে নিন। কোন কোম্পানি বানাত সেই গাড়ি? দেখতে কেমন ছিল?
আজকের ব্যস্ত তিলোত্তমা কলকাতার রাজপথ জুড়ে ঘুরে বেড়ানো হলুদ ট্যাক্সি কিংবা অ্যাপ-নির্ভর আধুনিক ক্যাবগুলোর ভিড়ে হারিয়ে গেছে এক সুপ্রাচীন শতবর্ষের স্মৃতিকথা। বিশ শতকের শুরুর দিকে যখন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতার রাস্তায় চাবুকের শব্দে পালকি, ঘোড়ার গাড়ি আর হাতে টানা রিকশার রাজত্ব চলছিল, ঠিক সেই সময় ১৯০৯ সাল নাগাদ কলকাতার বুক চিরে প্রথম গড়িয়েছিল যান্ত্রিক চাকার ম্যাজিক—কলকাতার প্রথম ট্যাক্সি!

আজ থেকে প্রায় ১-১.৫ শতক আগে কীভাবে তৎকালীন বিশ্বমানের শহর কলকাতায় ট্যাক্সি চলাচলের জাদুকরী সূচনা হয়েছিল? ফরাসি কোম্পানির লাল রঙের সেই খুদে গাড়ি কীভাবে ভিক্টোরিয়ান কলকাতার বাবু ও সাহেবদের চোখ কপালে তুলে দিয়েছিল? সেই ঐতিহাসিক ঘটনার বিস্তারিত ও রোমাঞ্চকর বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো।
১. ১৯০৯ সাল এবং ফরাসি উদ্যোগ: শেভিজাঁ কোম্পানির আগমন
বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে কলকাতা ছিল এশিয়ার অন্যতম আধুনিক ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ শহর। ১৯০৬-১৯০৭ সালে গুটিকয়েক ব্যক্তিগত মোটোরগাড়ি রাজপথে নামলেও জনসাধারণের জন্য ভাড়ায় চালিত কোনো যান্ত্রিক যান বা ট্যাক্সি ব্যবস্থা ছিল না।
এই শূন্যতা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা অনুধাবন করে এগিয়ে আসে ফরাসি এক বিখ্যাত মোটর প্রতিষ্ঠান—‘ফ্রেঞ্চ মোটর কোম্পানি’ (French Motor Company)। এর নেপথ্যে মূল কারিগর ছিলেন ফরাসি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা মিশেল শেভিজাঁ (Michel Sevidjan)। তিনি প্যারিসের ট্যাক্সি ব্যবস্থার আদলে তিলোত্তমা শহর কলকাতায় প্রথম বাণিজ্যিক ট্যাক্সি পরিষেবা চালু করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১৯০৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে শেভিজাঁ কোম্পানির হাত ধরেই কলকাতার পিচঢালা রাজপথে প্রথমবারের মতো চলতে শুরু করে ট্যাক্সি।
২. টুকটুকে লাল রঙের দুই সিলিন্ডারের শারঁ (Charron) গাড়ি
প্রথম ট্যাক্সি হিসেবে যে গাড়িটি কলকাতার রাস্তায় আনা হয়েছিল, সেটি ছিল ফ্রান্সের প্রখ্যাত অটোমোবাইল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘শারঁ’-র তৈরি ‘শারঁ টু-সিলিন্ডার’ (Charron 2-Cylinder Car)।
- গাড়ির গঠন ও নকশা: এই শারঁ গাড়িটি আকারে বেশ ছোট এবং দেখতে অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন ছিল। ইঞ্জিনের ক্ষমতা ছিল মাত্র দুই সিলিন্ডারের। চালকের আসন বা ড্রাইভারস ক্যাবিন ছাড়াও পেছনে মাত্র দুইজন যাত্রী বসার আরামদায়ক আসন ব্যবস্থা ছিল।
- প্যারিসের লাল রং: ফরাসি রাজধানী প্যারিসের রাজপথে তৎকালীন চলন্ত ট্যাক্সিগুলোর রঙ ছিল টুকটুকে লাল। সেই প্যারিসীয় আভিজাত্য বজায় রাখতে কলকাতার প্রথম শারঁ ট্যাক্সিগুলোকেও গাঢ় টুকটুকে লাল (Bright Red) রঙে সাজানো হয়েছিল। গঙ্গার ধারের সূর্যাস্তে লাল রঙের এই খুদে মেকানিক্যাল গাড়িগুলো যখন সাইরেন বা হর্ন বাজিয়ে চাকা গড়াত, তখন অবাক বিস্ময়ে পথচারীরা থমকে দাঁড়াতেন।

৩. মাইল পিছু ছয় আনা ভাড়া ও প্রাথমিক অভিজ্ঞতা
ঘোড়ার গাড়ির যুগে হঠাৎ যান্ত্রিক মোটোরগাড়িতে চড়ে দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল তৎকালীন তিলোত্তমাবাসীর কাছে এক রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার।
- ভাড়ার নিয়মাবলী: শেভিজাঁ কোম্পানির এই ট্যাক্সির ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল মাইল পিছু মাত্র ছয় আনা (6 Annas per Mile)! প্রতি অতিরিক্ত চালিত মাইলের জন্য নির্দিষ্ট হারের এই ভাড়া তখনকার দিনে কেবল সাহেব, ধনী জমিদার, মারওয়াড়ি ব্যবসায়ী কিংবা বনেদি পরিবারের বাবুদের জন্যই সাশ্রয়ী ছিল।
- মিটারে যান্ত্রিক গণনা: প্রথম ট্যাক্সিগুলোতে সামনের দিকে ফিট করা হয়েছিল বিশেষ এক মেকানিক্যাল মিটার। চাকা ঘোরার সাথে সাথে খটখট শব্দে সেই মিটারে দূরত্ব ও ভাড়ার আনা হিসেব করা হতো—যা শহরবাসীর কাছে এক পরম বিস্ময় ছিল।
- বিপ্লব ও হলুদ ক্যাবের পূর্বসূরি: ১৯০৯ সালে মাত্র কয়েকটি লাল ‘শারঁ’ গাড়ি দিয়ে শুরু হওয়া এই ট্যাক্সি পরিষেবা খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে ১৯১০ ও ১৯২০-এর দশকে ফোর্ড (Ford), অস্টিন (Austin) এবং মরিস (Morris) কোম্পানির গাড়ি ট্যাক্সি হিসেবে রাস্তায় নামে। যার ধারাবাহিকতায় ১৯৬০-এর দশকে আসে বিশ্বখ্যাত হিন্দুস্তান মোটরসের তৈরি ‘অ্যাম্বাসেডর’—যা কলকাতার আইকনিক ‘হলুদ ট্যাক্সি’ হিসেবে আজও নিজের ঐতিহ্য বজায় রেখেছে।
আজকের জিপিএস ট্র্যাকিং ও এসি ক্যাবের যুগে ১৯০৯ সালের সেই লাল রঙের দু’জনী ফরাসি 'শারঁ' ট্যাক্সি কেবল একটি বাহন ছিল না; এটি ছিল কলকাতার যাতায়াত ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের ঐতিহাসিক সূচনা। শতাব্দী পেরিয়ে আজও কলকাতার ট্রাফিকের ইতিহাস লিখতে গেলে শেভিজাঁ কোম্পানির সেই ছয় আনার লাল ট্যাক্সির নাম সশ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয়।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


