কলকাতার গ্রেট ইস্টার্ন এশিয়ার প্রথম হোটেল নয়? এই সম্মান কি অন্য কারও প্রাপ্য? শুনলে অবাক হবেন, সেটিও কলকাতার একদম কাছেই
ঐতিহাসিক দলিল, নথিপত্র এবং ব্রিটিশ আমলের রেকর্ড পর্যালোচনা করলে এই দুই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের আত্মপ্রকাশ, ধরন ও বয়সের এক চমকপ্রদ সমীকরণ উঠে আসে।
হোটেল কালচার বা ইউরোপীয় ধাঁচের আতিথেয়তার কথা উঠলেই বাঙালি হিসেবে আমাদের মনের মধ্যে ভেসে ওঠে কলকাতার ‘গ্রেট ইস্টার্ন হোটেল’-এর নাম। এশিয়ার সবচেয়ে পুরনো চালু থাকা হোটেলগুলোর মধ্যে গ্রেট ইস্টার্ন অন্যতম, তা নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। কিন্তু ইতিহাস যখন বিচার করা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—গ্রেট ইস্টার্নই কি ভারতের প্রথম হোটেল? নাকি হুগলির ঐতিহাসিক শহর শ্রীরামপুরের গঙ্গার ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা ‘ডেনমার্ক ট্যাভার্ন’ (Denmark Tavern) ছিনিয়ে নেবে সেই মুকুট?

ঐতিহাসিক দলিল, নথিপত্র এবং ব্রিটিশ আমলের রেকর্ড পর্যালোচনা করলে এই দুই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের আত্মপ্রকাশ, ধরন ও বয়সের এক চমকপ্রদ সমীকরণ উঠে আসে। ভারতের প্রাচীনতম আতিথেয়তার ইতিহাসে এই দুই প্রতিষ্ঠানের অবস্থান এবং প্রকৃত সত্যটি কী, আজ জেনে নিন।
১. শ্রীরামপুরের ডেনমার্ক ট্যাভার্ন (১৭৮৬): সরাইখানা কি দেশের প্রথম হোটেল?
কলকাতার ওপারে হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত শ্রীরামপুর ছিল ১৭৫৫ থেকে ১৮৪৫ সাল পর্যন্ত একটি ডেনিশ কলোনি বা ডেনমার্কের উপনিবেশ (তখন এর নাম ছিল ‘ফ্রেডরিকসনগর’)। ইউরোপীয় বণিক, পর্যটক ও নাবিকদের গঙ্গা নদী বেয়ে যাতায়াত ছিল নিত্যদিনের বিষয়।
- প্রতিষ্ঠার সময়কাল: ১৭৮৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরাইখানা ব্যবসার সূত্র ধরে শ্রীরামপুরে ডেনিশ সরাইখানা বা ‘ডেনমার্ক ট্যাভার্ন’ চালু করেন জন জেমস ভার্গি নামের এক ব্রিটিশ ব্যবসায়ী।
- পরিষেবা ও ধরন: অষ্টাদশ শতকে প্রতিষ্ঠিত এই ট্যাভার্নে কেবল খাবার বা পানীয় পাওয়া যেত না, বরং ইউরোপ থেকে আসা পর্যটক ও বণিকদের রাতে থাকার জন্য সুসজ্জিত ঘর বা লজিংয়ের ব্যবস্থাও ছিল।
- ঐতিহাসিক গুরুত্ব: ইতিহাসের হিসেব অনুযায়ী, বাণিজ্যিকভাবে ভারতে থাকার স্থান বা লজিং ও আধুনিক ক্যাফে কালচারের সূচনা এই ট্যাভার্ন থেকেই হয়েছিল। তাই কাঠামোগতভাবে লজিং বা ইন (Inn) হিসেবে এটিই ভারতের প্রাচীনতম বাণিজ্যিক আতিথেয়তার জায়গা। প্রায় দুই শতাব্দী পরিত্যক্ত থাকার পর পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগম (WBTDCL) ও ডেনমার্কের সংস্কৃতি মন্ত্রকের যৌথ উদ্যোগে এটিকে পুনর্নির্মাণ করে ফের চালু করা হয়েছে।
২. কলকাতার গ্রেট ইস্টার্ন (১৮৪০): আধুনিক লাক্সারি হোটেলের জন্মদাতা
যদি প্রশ্ন করা হয়—আধুনিক অর্থে আন্তর্জাতিক মানের পূর্ণাঙ্গ লাক্সারি বা বিলাসবহুল ‘হোটেল’ হিসেবে ভারতের প্রথম কোনটা? তবে উত্তর হিসেবে আসবে কলকাতার গ্রেট ইস্টার্ন।
- প্রতিষ্ঠা ও ইতিহাস: ১৮৪০ সালে ডেভিড উইলসন নামে এক ব্রিটিশ বেকার ও ব্যবসায়ী কলকাতার ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুর দিকে এর নাম ছিল ‘উইলসনস হোটেল’ (Wilson's Hotel)। পরবর্তীতে এটি ‘অকল্যান্ড হোটেল’ এবং সবশেষে ‘গ্রেট ইস্টার্ন হোটেল’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
- 'জুয়েল অফ দ্য ইস্ট': এটি কেবল থাকার জায়গা ছিল না, এতে ছিল বেকারি, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, বিয়ার বার এবং বিলাসবহুল বলরুম। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এটিকে ইউরোপীয় অভিজাতদের কাছে ‘জুয়েল অফ দ্য ইস্ট’ (Jewel of the East) বা প্রাচ্যের রত্ন বলে অবিহিত করা হতো।
- প্রযুক্তি ও আধুনিকতা: ভারতে প্রথমবার যে হোটেলে বিদ্যুৎ সংযোগ করা হয়েছিল, সেটি ছিল এই গ্রেট ইস্টার্ন। ব্রিটিশ ভাইসরয় থেকে শুরু করে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ, মার্ক টোয়েন, বা নিকিতা ক্রুশ্চেভ—বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্বরা কলকাতায় পা রেখে এই হোটেলেই অবস্থান করেছেন।
৩. বিতর্ক ও আসল সত্য: প্রথম কে?
ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, দুই হোটেলের মধ্যে এই ফারাক বুঝতে হলে ‘ট্যাভার্ন’ এবং ‘হোটেল’ শব্দ দুটির পরিভাষা জানা জরুরি।
- ডেনমার্ক ট্যাভার্ন (১৭৮৬): এটি একটি ‘ইউরোপীয় ইন’ বা সরাইখানা ছিল, যা ভারতের বুকে আধুনিক আতিথেয়তার (Hospitality) প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের রাতে থাকার ও খাওয়ার স্থান হিসেবে এটি গ্রেট ইস্টার্নের চেয়ে অর্ধেকেরও বেশি শতক বা ৫৪ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
- গ্রেট ইস্টার্ন (১৮৪০): এটি ছিল ভারতের প্রথম আধুনিক, সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ও বহুতল ‘বিলাসবহুল হোটেল’ (Luxury Hotel)। যে হোটেলের বাণিজ্যিক ধারণা আজ আমরা বিশ্বজুড়ে দেখি, ভারতে সেটির রূপকার ডেভিড উইলসনের এই প্রতিষ্ঠানটিই।
সংক্ষেপে বলতে গেলে—ভারতে সরাইখানা ও লজিং কালচারের দিক দিয়ে প্রাচীনতম ইতিহাস শ্রীরামপুরের ডেনমার্ক ট্যাভার্ন (১৭৮৬)-এর দখলে। কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ, আধুনিক ও বিলাসবহুল ‘হোটেল’ হিসেবে ভারতের প্রথম মুকুট নিঃসন্দেহে কলকাতার গ্রেট ইস্টার্ন (১৮৪০)-এর মাথায়। এই দুই ঐতিহাসিক স্থানই বাংলার প্রাচীন ও সমৃদ্ধ ইতিহাসের অনন্য সম্পদ।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


