জগন্নাথের প্রসাদ বিতরণেও কারচুপি! ইন্দ্রনীলের বিরুদ্ধে ১৫০ টেন্ডারে দুর্নীতির অভিযোগ, গ্রেপ্তার করা হতে পারে মেয়েকেও
লালবাজার সূত্রে খবর, পর্যটন দপ্তরের টেন্ডার সংক্রান্ত নথি খতিয়ে দেখতে গিয়ে তদন্তকারীরা অন্তত ১৫০টি টেন্ডারের সন্ধান পেয়েছেন। ব্যানার লাগানো, রাস্তা সাজানো, রেড রোড কার্নিভাল আয়োজন, বিভিন্ন জায়গায় মিষ্টি বিতরণ এবং দিঘার জগন্নাথ মন্দিরে প্রসাদ বিতরণের মতো একাধিক কাজের জন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দ হয়েছিল।
প্রাক্তন মন্ত্রী তথা তৃণমূল নেতা ইন্দ্রনীল সেনকে ঘিরে দুর্নীতির তদন্তে এবার আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এল। ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার করে দুর্গাপুজোর পাস বিক্রির অভিযোগের পাশাপাশি এবার রাজ্যের পর্যটন দপ্তরের অন্তত ১৫০টি টেন্ডার নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে কলকাতা পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল বা SIT। অভিযোগ, গত পাঁচ বছরে পর্যটন দপ্তরের দেওয়া এই টেন্ডারগুলির সিংহভাগই ঘুরেফিরে পেয়েছে ইন্দ্রনীল সেনের নিয়ন্ত্রণাধীন তিনটি সংস্থা। এমনকী, দিঘার জগন্নাথ মন্দিরে প্রসাদ বিতরণ থেকে শুরু করে বলিউড অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের জন্মদিন পালন—বিভিন্ন কর্মসূচিতেও কোটি কোটি টাকার বরাত পেয়েছে ওই সংস্থাগুলি। অন্যদিকে, আর্থিক লেনদেনের সূত্র ধরে এবার ইন্দ্রনীলের মেয়ে আভেরি সেনকেও কড়া জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করতে চাইছে পুলিশ।

লালবাজার সূত্রে খবর, পর্যটন দপ্তরের টেন্ডার সংক্রান্ত নথি খতিয়ে দেখতে গিয়ে তদন্তকারীরা অন্তত ১৫০টি টেন্ডারের সন্ধান পেয়েছেন। গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন সময়ে এই টেন্ডারগুলি দেওয়া হয়েছিল। ব্যানার লাগানো, রাস্তা সাজানো, রেড রোড কার্নিভাল আয়োজন, বিভিন্ন জায়গায় মিষ্টি বিতরণ এবং দিঘার জগন্নাথ মন্দিরে প্রসাদ বিতরণের মতো একাধিক কাজের জন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দ হয়েছিল। তালিকায় রয়েছে অমিতাভ বচ্চনের জন্মদিন পালনের মতো কর্মসূচিও। পুলিশের দাবি, এতগুলি আলাদা কাজের বরাত মূলত তিনটি সংস্থার হাতেই গিয়েছে। সংস্থাগুলির সঙ্গে ইন্দ্রনীল সেনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং পরিবারের সদস্যদের যোগাযোগ রয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তকারীদের দাবি, এই সংস্থাগুলির উপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ ছিল ইন্দ্রনীল সেনের। সরকারি দপ্তরের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় তাঁর প্রভাব খাটানো হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। কীভাবে একই তিনটি সংস্থা বারবার সরকারি কাজের বরাত পেল, আদৌ স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে টেন্ডার দেওয়া হয়েছিল কি না, সেই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন SIT-এর আধিকারিকরা। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, এই টেন্ডারগুলির মাধ্যমে কয়েকশো কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে। ফলে শুধু দুর্গাপুজোর পাস বিক্রির অভিযোগ নয়, পর্যটন দপ্তরের আমলে একাধিক সরকারি প্রকল্পের বরাত দেওয়ার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় এসেছে।
এদিকে তদন্তে নতুন করে নজরে এসেছে ইন্দ্রনীলের মেয়ে আভেরি সেনের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট। লালবাজারের দাবি, ইন্দ্রনীলের সংস্থাগুলি থেকে তাঁর মেয়ে এবং স্ত্রী মধুছন্দা সেনের একাধিক অ্যাকাউন্টে কয়েক কোটি টাকা স্থানান্তরিত হয়েছে। পরবর্তীকালে সেই টাকা আবার ইন্দ্রনীলের সংস্থার অ্যাকাউন্টে ফিরে এসেছে বলেও তদন্তকারীদের দাবি। এই লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, কোন কাজের বিনিময়ে টাকা পাঠানো হয়েছিল এবং এর সঙ্গে সরকারি টেন্ডারের কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা জানতে চান গোয়েন্দারা।
এই কারণেই আভেরি সেনকে বুধবার ফের লালবাজারে হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি হাজির হননি। মঙ্গলবারও প্রথম নোটিসে সাড়া দেননি তিনি। অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে হাজিরা এড়িয়েছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। বুধবারও উপস্থিত না হওয়ায় তাঁর বাড়িতে গিয়ে দ্বিতীয় নোটিস পৌঁছে দেন তদন্তকারীরা। লালবাজার সূত্রে খবর, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর তাঁকে ফের তলব করা হয়েছে। এবারও হাজিরা এড়ালে তাঁর বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপ করা হতে পারে। এমনকী, তাঁকে গ্রেপ্তার করার সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন পুলিশের এক আধিকারিক।
অন্যদিকে, জেরার মুখে ইন্দ্রনীল সেন তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেন দুর্নীতির বিষয়ে সব জানেন, তিনি নিজে কিছুই জানেন না। সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তদন্তকারীদের কাছে এমনটাই দাবি করেছেন প্রাক্তন মন্ত্রী। সেই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে প্রয়োজনে মধুছন্দাকে ফের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে পুলিশ।
দুর্গাপুজোর পাস বিক্রির মামলায় ইতিমধ্যেই ইন্দ্রনীল সেন গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁর স্ত্রীও তদন্তকারীদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়েছেন। এবার মেয়ের অ্যাকাউন্টে আর্থিক লেনদেনের সূত্র ধরে তদন্তের পরিধি আরও বাড়ছে। পাশাপাশি পর্যটন দপ্তরের টেন্ডার সংক্রান্ত নথি খতিয়ে দেখে আরও কারা এই আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত, তা চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।
সব মিলিয়ে, দুর্গাপুজোর পাস বিক্রির অভিযোগ থেকে শুরু হওয়া তদন্ত এখন সরকারি টেন্ডার এবং পরিবারের সদস্যদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। ১৫০টি টেন্ডারের বরাত, তিনটি সংস্থার ভূমিকা এবং কয়েক কোটি টাকার পারিবারিক লেনদেন—সব মিলিয়ে ইন্দ্রনীল সেনকে ঘিরে তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। তবে পুলিশের তোলা অভিযোগগুলির সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হওয়া এখনও বাকি। আগামী দিনে আভেরি সেনের জিজ্ঞাসাবাদ এবং আর্থিক নথি পরীক্ষা থেকে আরও কী তথ্য সামনে আসে, এখন সেদিকেই নজর।
ABOUT THE AUTHORAbhijit Chowdhury২০২১ সাল থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন অভিজিৎ চৌধুরী। ২০১৮ সালে সালে তাঁর পেশাদার জীবনের শুরু। জাতীয়, আন্তর্জাতিক বিষয়, বাংলার রাজনীতি এবং খেলাধুলোর বিষয়ে লেখার ক্ষেত্রে ৮ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমেরিকা, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের বিষয়ে তাঁর আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পাশ করেই সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করেছেন অভিজিৎ। হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় যোগদানের আগে ওয়ানইন্ডিয়া এবং ইটিভি ভারতে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে অভিজিতের। এছাড়া আকাশবাণীতে রেডিও জকি হিসেবেও কাজ করেছিলেন তিনি। খবরের জগৎ ছাড়া খেলাধুলো, ইতিহাসে অভিজিতের আগ্রহ রয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা: সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন নিয়ে অভিজিৎ তাঁর স্নাতক স্তরের পড়াশোনা সম্পন্ন করেছেন আশুতোষ কলেজ থেকে। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: ক্রিকেট, ফুটবল, টেনিস ছাড়া প্রায় সব ধরনের খেলা দেখতে তিনি ভীষণ ভালোবাসেন। কাজের বাইরে তাঁর অবসর কাটে বই পড়ে এবং বিভিন্ন বিষয়ে ডকুমেন্টারি দেখে।Read More
E-Paper


