বিধানসভার দাড়িপাল্লায় কাউন্সিলদের ভবিষ্যৎ! পুর নির্বাচনের আগে কঠিন লিটমাস টেস্ট

পুর নির্বাচনে ভালো ফল হলেও লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড থেকেই লিড পান না প্রার্থীরা। এই নিয়ে তৃণমূলে অসন্তোষ নতুন নয়।

Published on: Mar 24, 2026, 22:52:24 IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

বিধানসভায় ‘লিড’ দাও, পুরসভায় টিকিট পাও! সরাসরি এই চারটি শব্দ বলা হচ্ছে না বটে। তবে জেলায় জেলায় পুর এলাকার তৃণমূল কংগ্রেস কাউন্সিলরেরা ইতিমধ্যেই এই মর্মে ‘বার্তা’ পেতে শুরু করেছেন। কোথাও সেই বার্তা যাচ্ছে কোনও নেতার ফোন মারফত। কোথাও প্রকাশ্য কর্মিসভায়। আবার এও বলে দেওয়া হচ্ছে, পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের খেরোর খাতায় সব হিসাব নথিবদ্ধ থাকছে। বছর ঘুরলেই পুরসভা নির্বাচন। তখন হিসাবনিকাশে আসল সূচক হবে বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের কাউন্সিলরদের ওয়ার্ডে সংশ্লিষ্ট দলীয় প্রার্থীর ‘লিড।' তাই আসন্ন নির্বাচনে শুধুমাত্র বিধায়ক প্রার্থীদের জন্যই নয়, এই নির্বাচন কাউন্সিলরদের কাছেও বড় চ্যালেঞ্জ।

বিধানসভার দাড়িপাল্লায় কাউন্সিলদের ভবিষ্যৎ!
বিধানসভার দাড়িপাল্লায় কাউন্সিলদের ভবিষ্যৎ!

আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুর কেন্দ্রটিকে 'পাখির চোখ' করেছে রাজ্যের শাসকদল । রবিবার চেতলার অহীন্দ্র মঞ্চে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে দলীয় কাউন্সিলরদের নিয়ে একটি মেগা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় । সেই হাইভোল্টেজ বৈঠকেই অভিষেক সরাসরিই বলে দিয়েছেন, কে কী করছেন, তার উপর যেমন নজর রাখা হবে, তেমনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও কাউন্সিলরদের সতর্ক করে দিয়েছেন। কিন্তু বিষয়টি শুধু ভবানীপুরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। গোটা রাজ্যের শহরাঞ্চলেই এই ‘বার্তা’ পাচ্ছেন তৃণমূলের কাউন্সিলরেরা। তাই দলীয় নেতৃত্বের নির্দেশ মেনে রাজ্যের ৭টি পুরনিগম-সহ মোট ১২৮টি পুর এলাকায় বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন কাউন্সিলররাও।

২০২২ সালে রাজ্যে শেষ পুর নির্বাচন হয়েছিল। ২০২৭ সালে ফের বাংলায় পুর নির্বাচন হবে। বর্তমানে রাজ্যের ১২৮টি পুর এলাকার মধ্যে একটি বাদে বাকি সব জায়গায় ক্ষমতায় রয়েছে শাসকদল। শুধুমাত্র তাহেরপুর পুরসভা রয়েছে বামেদের দখলে। এই পুরসভার মোট আসন ১৩টি। এরমধ্যে ৮টিতেই জয়ী হয়েছে বাম প্রার্থীরা। বাকি ৫টি ওয়ার্ড তৃণমূলের দখলে আছে। অন্যদিকে, ৪৭টি আসনের মধ্যে ৩৭টি আসনে জয়ী হয়ে শিলিগুড়ি পুরনিগম নিজেদের দখলে রেখেছে রাজ্যের শাসকদল। ৫টি আসনে রয়েছে বিজেপি প্রার্থীরা। ৪টি আসন রয়েছে সিপিআইএমের দখলে। উল্লেখ্য, ২০২২ সালের পুর নির্বাচনে শিলিগুড়ি পুরনিগমের প্রাক্তন মেয়র অশোক ভট্টাচার্য ৬ নম্বর ওয়ার্ড থেকে তৃণমূলের আলম খানের কাছে পরাজিত হন। বর্তমানে শিলিগুড়ি পুরনিগমের মেয়র গৌতম দেব । তিনি আবার শিলিগুড়ি বিধানসভা নির্বাচনেও তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছেন। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির শঙ্কর ঘোষ। গৌতমকে জেতাতে দলের কাউন্সিলররা অনেকদিন আগে থেকেই ময়দান নেমে পড়েছেন। পুর নির্বাচনে ভালো ফল হলেও লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড থেকেই লিড পান না প্রার্থীরা। এই নিয়ে তৃণমূলে অসন্তোষ নতুন নয়। সে কারণেই নিজেদের ওয়ার্ডে পরীক্ষার মুখে ফেলে দেওয়া হচ্ছে কাউন্সিলরদের।

আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে কুলটি বিধানসভা থেকে তৃণমূলের টিকিট পাননি তিনবারের বিধায়ক উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়। ২০২১ সালের নির্বাচনে তিনি বিজেপি প্রার্থীর কাছে মাত্র ৬০০ ভোটে হেড়েছিলেন। সেই কারণেই হয়তো এবার কুলটি থেকে তাঁকে টিকিট দেওয়া হয়নি। সম্প্রতি উজ্জ্বল অসন্তোষের সুরে জানিয়েছেন, পুর নির্বাচনে ফলাফল ভালো হলেও লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থীকে ওয়ার্ড থেকে জেতাতে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হন কাউন্সিলররা। তার মাশুল গুনতে হয় প্রার্থীদের। সেই কারণে এবার বিধানসভা নির্বাচনের আগে থেকে দল স্পষ্ট করে দিয়েছে, ওয়ার্ড-ভিত্তিক পারফরম্যান্সের উপর নির্ভর করেই পরবর্তী পুর নির্বাচনে টিকিট পাবেন কাউন্সিলররা। শুধু বিধায়ক প্রার্থীরাই নন, তৃণমূলের যুব সভাপতিরাও পুর এলাকার কাউন্সিলরদের পারফরমেন্সের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে দলের এই ইঙ্গিত নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অনেকের বক্তব্য, তাহলে কী কাউন্সিলররা কেউ কাজ করেন না? যদিও দলীয় নেতৃত্ব বুঝিয়ে দিয়েছে, যাঁরা সত্যিই কোনও কাজ করেন না, দলের কথা শোনেন না, শৃঙ্খলা মানেন না- এই বার্তা মূলত তাঁদের জন্যই। উত্তর কলকাতা তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সভাপতি তথা উল্টোডাঙা এলাকার কাউন্সিলর শান্তি রঞ্জন কুন্ডু বলেন, 'আমি দলের সঙ্গে ১০০ শতাংশ একমত। কিন্তু টিকিট দেওয়ার সময় দল যেন পারফরমেন্সটা বিচার করে। বড় নেতার চামচাগিরি করে এমআইসি হয়ে গেলাম এটা হলে মন খারাপ হয়। আমরা সারা বছর মানুষের সঙ্গে থাকি, জনসংযোগ করি। পুর পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও খামতি নেই। সেই ২০১৫ সালে কাউন্সিলর হয়েছি কিন্তু দল আর কিছু বিবেচনা করেনি। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে উত্তর কলকাতার যুব তৃণমূলের সভাপতি করেছে।'

দলীয় এই নির্দেশ নিয়ে কয়েকজনের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হলেও বেশিরভাগ কাউন্সিলরই তা মেনে নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। শিলিগুড়ি পুরনিগমের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তাপস চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী রঞ্জনশীল শর্মাকে জেতাতে সব রমকভাবে প্রস্তুতি চলছে। ৩২ নম্বর ওয়ার্ড থেকে রঞ্জন সবথেকে বেশি লিড পাবেন বলে আশাবাদী তাপস। অন্যদিকে, ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মিলি সিনহা জানিয়েছেন, শিলিগুড়ি কেন্দ্রের প্রার্থী এবং পুরনিগমের মেয়র গৌতম দেবকে বিধানসভা নির্বাচনে জেতাতে প্রত্যেক কর্মী ঝাপিয়ে পড়েছে। এই ওয়ার্ড থেকে সর্বোচ্চ লিড দিতে কাজ শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, দার্জিং জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ারম্যান সঞ্জয় টিব্রেওয়াল জানিয়েছেন, শিলিগুড়ি পুনিগমের ৪৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩৭টি ওয়ার্ডই রয়েছে তৃণমূলের দখলে। ওই ৩৭টি ওয়ার্ডের পাশাপাশি বিজেপির দখলে থাকা ওয়ার্ডগুলিতেও দলের কর্মী সমর্থকরা কাজ শুরু করে দিয়েছে। দলের নির্দেশ মেনেই সর্বোত্র কাজ করছে কাউন্সিলররা। আবার আসানসোল পৌরনিগমের ৮৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও মেয়র পারিষদ মানস দাস বলেন, 'খুব কমই হেরেছি ওয়ার্ড থেকে। বেশিরভাগ সময়ই লিড দিয়েছি। এবারের প্রার্থী তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়কে এলাকাবাসী সকলেই চেনে। তাই তাঁকে জেতানো খুব কঠিন হবে না। টিকিট দেওয়া না দেওয়ার বিষয়টি দল নির্ধারণ করবে।'