CAA-অনুপ্রবেশ থেকে নারী নিরাপত্তা! TMC-কে তোপ দেগে ভোটমুখী বাংলায় মাস্টারস্ট্রোক PM মোদীর
বঙ্গবাসীকে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের কথা চিঠিতে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
'এবার বিজেপি সরকার।' ছাব্বিশের মহারণের দামামা বাজার আগেই রাজ্যের মানুষের কাছে সরাসরি পৌঁছে যেতে অভিনব কৌশল নিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সোমবার বিজেপির সরকার গড়ার ডাক দিয়ে বঙ্গবাসীর উদ্দেশে একটি দীর্ঘ খোলা চিঠি লিখেছেন তিনি। চিঠিতে বাঙালি অস্মিতায় শান দিয়ে ‘জয় মা কালী’ স্লোগান তুলে একদিকে যেমন তৃণমূল সরকারের নাম না করে তীব্র সমালোচনা করেছেন, অন্যদিকে তেমনই ‘বিকশিত বাংলা’ গড়ার এক বিকল্প মডেলের ছবি তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী।

বাঙালি অস্মিতায় শান
ফেব্রুয়ারির শুরুর দিক থেকে রাজ্যে ‘গৃহ সম্পর্ক অভিযান’ শুরু করেছে গেরুয়া শিবির। সাধারণ মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারাভিযান চলছে। বিজেপি সূত্রে খবর, ওই কর্মসূচির মাধ্যমেই প্রধানমন্ত্রীর লেখা খোলা চিঠি তুলে দেওয়া হচ্ছে রাজ্যের সাধারণ ভোটারদের হাতে। চিঠির শুরুই শুরুই হয়েছে, ‘আমার প্রিয় পশ্চিমবঙ্গবাসী’ দিয়ে। তারপরেই ‘জয় মা কালী’ লিখে চিঠির মূল বয়ান শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে বিজেপির ‘ভোট ভিক্ষা’র একটি অঙ্গ এই চিঠি। এরপরেই তাঁর চিঠিতে উঠে এসেছে, আগামী দিনে রাজ্য কোন পথে চলবে, তা ঠিক করার সময় এসেছে। তিনি গভীর আক্ষেপের সঙ্গে উল্লেখ করেন, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যে বাংলা ছিল দেশের অর্থনীতির দিশারী ও শিল্পায়নের অগ্রদূত, আজ সেই রাজ্যের ‘রুগ্ণ ও জরাজীর্ণ’ দশা দেখে তাঁর হৃদয় ব্যথিত হয়।
বিধানসভা নির্বাচন
বঙ্গবাসীকে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের কথা চিঠিতে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। তিনি লিখেছেন, 'আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কোন পথে চালিত হবে, তার গুরুদায়িত্ব নির্ভর করছে আপনার একটি সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের উপর।' কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কথাও সেখানে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, স্বাধীনতার পর থেকে একটি দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গই ছিল দেশের অর্থনীতি এবং শিল্পে অগ্রণী ভূমিকায়। কিন্তু এখন ‘অপশাসন’ এবং ‘তোষণমূলক’ রাজনীতির কারণে পশ্চিমবঙ্গের এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে রাজ্যবাসীর উদ্দেশে লিখেছেন তিনি।
নিশানায় তৃণমূল
তাৎপর্যপূর্ণ হল, এই চিঠিতে কোথাও তৃণমূলের নাম নেই, নাম নেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও। বরং কৌশলগত ভাবে গোটা চিঠির পরতে পরতে বাংলার হতাশাজনক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। আর বোঝাতে চেয়েছেন, বাংলা কী হতে পারত, কিন্তু এখন কী জীর্ণ দশায় রয়েছে।প্রধানমন্ত্রী তাঁর চিঠিতে রাজ্যের অনুন্নয়নের জন্য সরাসরি ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসকে দায়ী করেছেন এবং অভিযোগ করেছেন যে, কর্মসংস্থানের অভাবে যুবসমাজ ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছে। বস্তুত, পশ্চিমবঙ্গে সরকারি স্থায়ী চাকরির অভাব নিয়ে বিজেপি অতীতে বার বার সরব হয়েছে। প্রশ্ন তুলেছে রাজ্যে ভারী শিল্পের অভাব নিয়েও। রাজ্যবাসীকে লেখা খোলা চিঠিতেও সে কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের নারী নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, 'নিরাপত্তার অভাবে আমার পশ্চিমবঙ্গের মা-বোনেরা আজ শঙ্কিত এবং ত্রস্ত।' পশ্চিমবঙ্গের মহিলারা কেন নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন, তা নিয়ে অবশ্য বিস্তারিত বর্ণনা দেননি তিনি। তবে অনেকে মনে করছেন, ২০২৪ সালে আরজি কর হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনার কথাই ফের স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী।
অনুপ্রবেশ ও সিএএ
একই সঙ্গে নাম না করে মতুয়া সম্প্রদায়ের উদ্দেশেও বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। খোলা চিঠিতে তিনি লিখেছেন, বিজেপি রাজ্যবাসীর সেবা করার সুযোগ পেলে ধর্মীয় শরণার্থীরা সিএএ-র মাধ্যমে এ দেশের নাগরিকত্ব পাবেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করে বলেছেন, এটি একটি মানবিক আইন। এর মাধ্যমে নির্যাতিত শরণার্থীরা সম্মানের সঙ্গে ভারতের নাগরিকত্ব পাবেন এবং বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কোন ক্ষতি হবে না। অনেকে মনে করছেন, এই বার্তার মাধ্যমে আসলে মতুয়াদের কাছেই নিজের বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছেন তিনি। চিঠিতে বাংলায় বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ নিয়েও সরব হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর অভিযোগ, 'সীমান্তবর্তী রাজ্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশের সমস্যা গুরুতর আকার নিয়েছে এবং তা রাজ্যের নিরাপত্তা ও জনজীবনে প্রভাব ফেলছে।' তিনি অভিযোগ করেন, সীমান্তবর্তী রাজ্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশের সমস্যা গুরুতর আকার নিয়েছে এবং তা রাজ্যের নিরাপত্তা ও জনজীবনে প্রভাব ফেলছে।
জনকল্যাণমূলক প্রকল্প
চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ লক্ষ মানুষ সরাসরি উপকৃত হয়েছেন। জনধন যোজনা, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, উজ্জ্বলা যোজনা, স্বনির্ভর ভারত অভিযান-এই সব প্রকল্পের মাধ্যমে গরিব, মধ্যবিত্ত, কৃষক, যুবক ও মহিলাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে বলে দাবি করা হয়। প্রধানমন্ত্রী আরও লেখেন, পশ্চিমবঙ্গে পরিকাঠামো উন্নয়নে কেন্দ্র বিপুল বিনিয়োগ করেছে-রেল, সড়ক, বন্দর, বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল পরিকাঠামোয় কাজ এগিয়েছে দ্রুতগতিতে। তাঁর বক্তব্য, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্প বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রাজ্যের সম্ভাবনা আরও অনেক বেশি, যদি উন্নয়নমুখী পরিবেশ তৈরি করা যায়।
বাঙালি মনীষীদের স্মরণ
সম্প্রতি বাঙালি মনীষীদের নামের সম্বোধন ঘিরে বিতর্কে জড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। কখনও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘বঙ্কিমদা’, কখনও রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের নামের আগে ‘স্বামী’ উপসর্গ জুড়ে দিয়েছেন তিনি। তা নিয়ে বিতর্কও হয়েছে। এবার রাজ্যবাসীকে পাঠানো খোলা চিঠিতেও স্বামী বিবেকানন্দ, ঋষি অরবিন্দ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা উল্লেখ করেন তিনি। বাঙালি মনীষীদের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী মোদী লেখেন, 'সেই পূণ্যভূমিই অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং নারী নির্যাতনে কলঙ্কিত।' তিনি আরও লেখেন, 'সোনার বাংলায় আজ ভুয়ো ভোটারের দাপট। নৈরাজ্যের অন্ধকারে ডুবতে থাকা পশ্চিমবঙ্গকে নিয়ে আজ সমগ্র ভারত চিন্তিত।'
প্রতিশ্রুতি
চিঠির শেষে প্রধানমন্ত্রী রাজ্যবাসীর কাছে উন্নয়ন, সুশাসন ও স্বচ্ছতার পক্ষে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বোঝাতে চেয়েছেন, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলে তাঁরা এই ‘সমস্যা’ দূর করবেন। তিনি লেখেন, 'আর কত দিন আমরা সহ্য করব?... আপনাদের সেবা করার একটি সুযোগের জন্য আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। এমন একটি সুযোগ, যেখানে কবিগুরুর ভাষায় ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’, সেখানে দুর্নীতি এবং অপশাসন থেকে মুক্তি মিলবে।' ২০২৬-কে পাখির চোখ করে ‘বিকশিত পশ্চিমবঙ্গ’ গড়ার ডাক দিয়ে শেষ হয়েছে তাঁর এই চিঠি।
E-Paper

