Debraj Chakraborty: ১০০ কোটির বেনামি সম্পত্তি! টিকিট না পেয়ে তৃণমূল ছেড়েছিলেন, দেবরাজের দ্রুত উত্থানে যোগ দুর্নীতির?

Debraj Chakraborty: রাজনৈতিক মহলের দাবি, গত এগারো বছরে রকেট গতিতে দেবরাজ চক্রবর্তীর রাজনৈতিক উত্থান ঘটেছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দুর্নীতির অভিযোগ। খুব অল্প সময়েই তিনি হয়ে উঠেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।

Published on: Jul 3, 2026, 20:45:45 IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

Debraj Chakraborty: রাজ্যে পালাবদলের পর একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নিচ্ছে বিজেপি সরকার। গ্রেফতার হচ্ছেন তৃণমূল কংগ্রেসের হেভিওয়েট নেতা, বিধায়ক থেকে কাউন্সিলররা। এবার এই তালিকায় যুক্ত হলেন বিধাননগর পুরসভার প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর ও তৃণমূলের প্রাক্তন বিধায়ক অদিতি মুন্সীর স্বামী দেবরাজ চক্রবর্তী। বুধবার পুরুলিয়া থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সম্পত্তির হিসাব নয়ছয়ের অভিযোগে দেবরাজ এবং অদিতির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছিল পুলিশ। দুজনেই রক্ষাকবচ চেয়ে কলকাতা হাইকোর্টে দ্বারস্থ হয়েছিলেন। শিশুসন্তানের জন্য অদিতিকে রক্ষাকবচ দিলেও ছাড় পাননি দেবরাজ। তারপরই গ্রেফতার হন তিনি। কিন্তু প্রশ্ন, খুব অল্প সময়ে দেবরাজ বঙ্গ রাজনীতিতে কীভাবে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন?

দেবরাজ চক্রবর্তীর দ্রুত উত্থানে যোগ দুর্নীতির? (ফাইল ছবি, সৌজন্যে ফেসবুক Debraj Chakraborty)
দেবরাজ চক্রবর্তীর দ্রুত উত্থানে যোগ দুর্নীতির? (ফাইল ছবি, সৌজন্যে ফেসবুক Debraj Chakraborty)

রাজনৈতিক মহলের দাবি, গত এগারো বছরে রকেট গতিতে দেবরাজ চক্রবর্তীর রাজনৈতিক উত্থান ঘটেছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দুর্নীতির অভিযোগ। খুব অল্প সময়েই তিনি হয়ে উঠেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। অভিষেক-ঘনিষ্ঠ দেবরাজ বরাবরই দাপুটে নেতা হিসাবেই পরিচিত তাঁর নিজের এলাকায়। অভিযোগ, সেই প্রভাবকে কাজে লাগিয়েই পাহাড়-প্রমাণ সম্পত্তির মালিক হয়ে ওঠেন বিধাননগর পুরসভার প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর। অন্তত ১০০ কোটি টাকার সম্পত্তি বেনামে এবং আত্মীয়-পরিচিতদের নামে হস্তান্তরিত করার অভিযোগ ওঠে দেবরাজ এবং অদিতির বিরুদ্ধে।

কীভাবে উত্থান রাজনীতিতে?

দেবরাজ চক্রবর্তীর রাজনৈতিক কেরিয়ার দীর্ঘ নয়। কিন্তু নিজের সুবিধা বুঝে সময়ে সময়ে দল বদলে বদলে শীর্ষনেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে ঢুকে হয়ে উঠেছিলেন বেশ প্রভাবশালী। অভিযোগ, সেই প্রভাবকে কাজে লাগিয়েই পাহাড়-প্রমাণ সম্পত্তির মালিক হয়ে ওঠেন বিধাননগর পুরসভার প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর দেবরাজ চক্রবর্তী। ২০১১ সালে প্রাক্তন মন্ত্রী ও রাজারহাট-গোপালপুরের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক পূর্ণেন্দু বসুর সেক্রেটারি ছিলেন দেবরাজ চক্রবর্তী। ভোটে টিকিট না পাওয়া নিয়ে পূর্ণেন্দু বসুর সঙ্গে মনোমালিন্যের জেরে তৃণমূল ছেড়ে দেন দেবরাজ। যোগ দেন কংগ্রেসে। ২০১৫ সালের পুরভোটে দেবরাজকে প্রার্থী করে কংগ্রেস। কিন্তু ভোটের দিনের আগের রাতেই গ্রেফতার করা হয় তাঁকে। ওই ভোটে বাগুইআটি এলাকা সাক্ষী ছিল বেনজির হিংসার। বোমা-গুলি থেকে শুরু করে ভিআইপি রোডে পুলিশের গাড়িতে আগুন- পুরোটাই ঘটে সাত নম্বর ওয়ার্ডকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ, এই হিংসার নেপথ্যে ছিল কৈখালি মণ্ডলগাঁতি এলাকার কিছু ‘বাছাই করা’ সমাজবিরোধী। অবশেষে বিধাননগর পুরসভার কংগ্রেস কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হন দেবরাজ। কিন্তু কংগ্রেস প্রতীকে জিতে, ৬ মাসের মধ্যেই কংগ্রেস ছেড়ে দেন দেবরাজ। নিজের ফায়দা বুঝে নিতে তৃণমূলের সঙ্গে আবার যোগাযোগ শুরু। পরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে ফিরে আসেন তৃণমূলে। সেই থেকে তৃণমূলে তিনি অভিষেক-ঘনিষ্ঠ হিসেবেই পরিচিত। ২০২২-এর পুরভোটে তৃণমূলের টিকিটে জিতে ফের কাউন্সিলর হন দেবরাজ চক্রবর্তী। বিধাননগর পুরসভার মেয়র পরিষদও করা হয় তাঁকে। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার যুব তৃণমূল সভাপতি ছিলেন তিনি। শোনা যায়, উত্তর ২৪ পরগনায় অভিষেকের ডান হাত ছিলেন দেবরাজ।

দোলা-পূর্ণেন্দু জুটির রাজনৈতিক প্রভাব খর্ব ও বিয়ে চর্চা

ক্যামাক স্ট্রিটের ক্ষমতার বৃত্তে আসার পরেই দেবরাজ ওই এলাকার রাজনীতিতে দোলা এবং পূর্ণেন্দু জুটির রাজনৈতিক প্রভাব খর্ব করতে উঠেপড়ে লাগেন বলে অভিযোগ। সেই সময় তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ সমাজবিরোধী হিসাবে পরিচিত স্বপন থেকে শুরু করে বুড়োর খুন, খুনের মামলায় এক সময়ের তৃণমূল কাউন্সিলরের ছেলে বাবাই বিশ্বাসের গ্রেফতারি-সবের পিছনেই এই ক্ষমতার লড়াইয়ের যোগ ছিল বলে দাবি তৃণমূলের অন্দরে। তত দিনে দেবরাজ ‘যুবরাজ’-এর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকা অন্যতম মুখ হিসাবে পরিচিত। নদিয়ার এক দাপুটে তৃণমূল নেতার ছেলের সঙ্গে দেবরাজের বন্ধুত্বও তখন চর্চায়। এর মধ্যেই দলের অন্দরে এবং বাইরে ফের দেবরাজকে ঘিরে চর্চা শুরু হয় তাঁর বিয়ের দিন থেকে। রিয়্যালিটি শো-খ্যাত গায়িকা অদিতিকে বিয়ে করা নিয়ে যত না চর্চা, তার থেকে বেশি চর্চা ছিল ইকো পার্কে বিয়ের এলাহি অনুষ্ঠান ঘিরে। মাত্র কয়েক বছর কাউন্সিলর হয়ে কী ভাবে এত এলাহি আয়োজন, জল্পনা শুরু হয় দলের অন্দরে। তৃণমূলের একাংশের অভিযোগ, তখন থেকে বাগুইআটির নির্মাণ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে অন্য ব্যবসায়ীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা যায়, দেবরাজকে ‘খুশি’ না করলে এলাকায় ব্যবসা করা যাবে না। জেলা রাজনীতিতেও যুব সভাপতি হিসাবে দেবরাজ কার্যত অভিষেকের ‘দূত।’ ২০২১ সালে পূর্ণেন্দুকে পাকাপাকি ‘রাজনৈতিক বাণপ্রস্থ’-এ পাঠিয়ে টিকিট পেলেন দেবরাজের স্ত্রী অদিতি। নির্বাচনের পরে তৃণমূল থেকে দূরত্ব তৈরি করা এক প্রাক্তন কাউন্সিলর বলেন, ‘শুরু থেকেই আমরা জানতাম অদিতি রবার স্ট্যাম্প।’

বাগুইআটি থানায় একের পর এক অভিযোগ

স্ত্রী বিধায়ক হওয়ার পরে দেবরাজের নাম উঠে আসে নির্বাচনোত্তর হিংসা মামলায়। সিবিআই তদন্ত শুরু হয়। তার দু’বছর পরে শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগ দুর্নীতি মামলাতেও জড়িয়ে যায় দেবরাজের নাম। বাড়িতে তল্লাশি চালায় সিবিআই। দেবরাজ যদিও সমস্ত অভিযোগই অস্বীকার করেছেন। কিন্তু পালাবদলের পর বাগুইআটি থানায় জমা হতে থাকে একের পর এক অভিযোগ। এর মধ্যে ছিল লক্ষ লক্ষ টাকা তোলাবাজির অভিযোগ। গ্রেফতার হতে থাকেন দেবরাজের ঘনিষ্ঠেরা। তারপর থেকে কার্যত বেপাত্তা দেবরাজের শেষ পর্যন্ত হদিস মেলে পুরুলিয়া-ঝাড়খণ্ড লাগোয়া একটি নির্মীয়মাণ রিসর্টে। পুলিশ সূত্রে খবর, ‘পাকা অপরাধী’র মতোই একের পর এক ডেরা পাল্টে থাকছিলেন দেবরাজ। প্রথমে উত্তরবঙ্গ, সেখান থেকে ঝাড়খণ্ড। কয়েকজন ঘনিষ্ঠও দেবরাজের সঙ্গে ছিলেন তাঁর এই অজ্ঞাতবাস পর্বে। তাঁদের গতিবিধির দিকেও নজর ছিল পুলিশের। মোবাইল বন্ধ ছিল আগাগোড়া।

পুলিশ সূত্রে খবর, ভিন্‌রাজ্যে একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে যৌথ ভাবে বেশ কিছু সম্পত্তি করেছিলেন এই প্রাক্তন কাউন্সিলর। সেই ব্যবসায়ীদের মাধ্যমেই জোগাড় হচ্ছিল অজ্ঞাতবাসের খরচ। ফলে ব্যাঙ্কিং চ্যানেল থেকেও হদিস মিলছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এক সঙ্গীর গতিবিধি থেকেই খোঁজ মেলে দেবরাজের। ইতিমধ্যেই দেবরাজের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে মোবাইল, ল্যাপটপ উদ্ধার করেছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে স্ত্রী তথা প্রাক্তন বিধায়ক অদিতিকেও। তদন্তকারীদের দাবি, বেশ কিছু ইলেকট্রনিক তথ্য ডিলিট করা হয়েছে। যেগুলি উদ্ধার করতে ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়া হবে। দেবরাজের তোলাবাজির টাকার ভাগ কোথায় কোথায় যেত, তা-ও পুলিশের তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সিট-এর তদন্ত ও বিপুল সম্পত্তির অভিযোগ

দেবরাজ চক্রবর্তীর দুর্নীতির তদন্ত করতে বিধাননগর পুলিশ তৈরি করেছে বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট। নেতৃত্বে রয়েছেন এক ডিসি পদমর্যাদার আধিকারিক। তদন্তকারী দলে রয়েছেন এমন আধিকারিক, যাঁকে এক সময় দেবরাজের কথা না-শোনায় ভিজিল্যান্সে বদলি করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ। দেবরাজের বিরুদ্ধে তোলাবাজি, সংগঠিত অপরাধে মদত দেওয়া এবং অবৈধ পথে বিপুল সম্পত্তি করার অভিযোগের তদন্ত করছে পুলিশ। প্রকাশ্যে এসেছে, গত পাঁচ বছরে কী ভাবে দেবরাজ এবং তাঁর স্ত্রী অদিতি রাজারহাট, নিউটাউন, ভিন্‌‌রাজ্যে একের পর এক সম্পত্তি কিনেছেন। পুলিশের পাশাপাশি বিপুল সম্পত্তির অর্থের উৎস খুঁজতে তদন্তের জন্য তৈরি হচ্ছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটও। রাজারহাট গোপালপুর বিধানসভার বিজেপি বিধায়ক তরুণজ্যোতি তিওয়ারির অভিযোগ, ১৩০০ কোটির সম্পত্তি তৈরি করেছেন দেবরাজ। নির্বাচনী হলফনামায় দেবরাজের স্ত্রী অদিতি মুন্সি সম্পত্তি নিয়ে ভুল তথ্য দিয়েছেন বলেও অভিযোগ বিজেপি বিধায়কের। তদন্তকারীদের স্ক্যানারে রয়েছে দেবরাজের সংস্থা ডিসি গ্লোবাল। টাকা পাচারে এই সংস্থাকে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ।