Poschim Bongo Dibas History: পশ্চিমবঙ্গের জন্মলগ্নের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ২০ জুন, কী সেই ইতিহাস? তারকেশ্বর যোগ কোথায়?
১৯৪৭ সালের ৫ এপ্রিল হুগলির তারকেশ্বর সাক্ষী ছিল বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভার এক গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনের। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমাদের মাতৃভূমি চাই, আর আমরা তা অর্জন করবই।’ একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন— ‘হয় এখনই, নয়তো আর কখনও নয়।’
২০ জুনকে সরকারি ভাবে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার। যদিও এই দিনটি ২০২৩ সাল থেকে লোকভবনে পালন করা হচ্ছে এবং বিজেপির উদ্বাস্তু সেল আরও আগে থেকেই দিনটিকে স্মরণ করে আসছে, তবু সরকারি স্বীকৃতি এবারই প্রথম। এর আগে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে ১ বৈশাখকে ‘বাংলা দিবস’ হিসেবে পালন করা হতো। বিজেপির মতে, ২০ জুনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব পশ্চিমবঙ্গের জন্মলগ্নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে একসময় হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু ১৯৪৬ সালের ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে যে, ব্রিটিশ ভারতের বিভাজন অনিবার্য। সেই সময় বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন হোসেন শহিদ সুরাওয়ার্দি। কলকাতার দাঙ্গার পর তাঁর ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। ব্রিটিশ ইস্টার্ন কম্যান্ডের একটি গোপন প্রতিবেদনে তাঁকে ‘গুন্ডাদের রাজা’ বলেও উল্লেখ করা হয়েছিল।
দেশভাগের প্রাক্কালে বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা মত সামনে আসে। সুরাওয়ার্দি অবিভক্ত ও স্বাধীন বাংলার পক্ষে সওয়াল করেন। তাঁর সঙ্গে একমত হন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর দাদা শরৎচন্দ্র বসু, কিরণশঙ্কর রায় ও আবুল হাশিমের মতো নেতারাও। তাঁদের প্রস্তাব ছিল, বাংলা যেন ভারত বা পাকিস্তান— কোনও দেশেরই অংশ না হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
অন্যদিকে, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ‘হিন্দু হোমল্যান্ড’-এর দাবিকে সামনে আনেন। তাঁর যুক্তি ছিল, যদি ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়, তাহলে বাংলাকেও একই সূত্রে ভাগ করা উচিত। এই দাবির সমর্থনে এগিয়ে আসেন ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার, বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা ও ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব।
১৯৪৭ সালের ৫ এপ্রিল হুগলির তারকেশ্বর সাক্ষী ছিল বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভার এক গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনের। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমাদের মাতৃভূমি চাই, আর আমরা তা অর্জন করবই।’ একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন— ‘হয় এখনই, নয়তো আর কখনও নয়।’ প্রায় আট দশক পরে সেই ঐতিহাসিক তারকেশ্বরেই পশ্চিমবঙ্গ দিবস উপলক্ষে জনসভার আয়োজন করেছে বিজেপি, যেখানে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ইতিহাসের চাকা যেন আবারও ঘুরে এসে থামছে সেই পুরনো অধ্যায়ের সামনে; সময় বদলায়, কিন্তু কিছু প্রতীক বারবার ফিরে আসে নতুন তাৎপর্য নিয়ে।
১৯৪৭ সালের ২০ জুন বঙ্গীয় আইনসভায় বাংলার ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমে সব সদস্য একসঙ্গে ভোট দেন। এরপর হিন্দু ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকার সদস্যরা পৃথকভাবে মতামত জানান। হিন্দু সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বাংলাকে ভাগ করে ভারতের সঙ্গে যুক্ত থাকার পক্ষে ভোট দেন। সেই সিদ্ধান্তের ফলেই পশ্চিমবঙ্গের জন্ম হয়।
বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য, ২০ জুনের সিদ্ধান্তের ফলে বাংলার হিন্দু জনগোষ্ঠী ভারতের অংশ হিসেবে নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে পেরেছিল। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের মতে, এই দিনটি কেবল প্রশাসনিক ইতিহাস নয়, বরং বাঙালির আত্মপরিচয়, অস্তিত্ব রক্ষা এবং আত্মমর্যাদার প্রতীক।
তবে এই উদযাপনকে ঘিরে বিতর্কও কম নয়। তৃণমূল কংগ্রেস ও বামপন্থী দলগুলির দাবি, দেশভাগের সঙ্গে উদ্বাস্তু জীবনের বেদনা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং অসংখ্য মানুষের দুর্ভোগ জড়িয়ে রয়েছে। তাই এমন একটি দিনকে উৎসবের আকারে পালন করা উচিত নয়। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও অতীতে এই ধরনের উদযাপনের বিরোধিতা করে বলেছিলেন, দেশভাগের ক্ষতকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা অনুচিত। যদিও বিজেপি চিরকাল এর পালটা যুক্তি দিয়ে এসেছে, বেদনাদায়ক ইতিহাস বলে কি তা মুছে ফেলা হবে? ফলে ২০ জুনকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। কারও কাছে এটি পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠার দিন, আবার অন্যদের কাছে দেশভাগের বেদনাময় স্মৃতির প্রতীক। তবে এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য অনস্বীকার্য।
ABOUT THE AUTHORAbhijit Chowdhury২০২১ সাল থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন অভিজিৎ চৌধুরী। ২০১৮ সালে সালে তাঁর পেশাদার জীবনের শুরু। জাতীয়, আন্তর্জাতিক বিষয়, বাংলার রাজনীতি এবং খেলাধুলোর বিষয়ে লেখার ক্ষেত্রে ৮ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমেরিকা, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের বিষয়ে তাঁর আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পাশ করেই সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করেছেন অভিজিৎ। হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় যোগদানের আগে ওয়ানইন্ডিয়া এবং ইটিভি ভারতে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে অভিজিতের। এছাড়া আকাশবাণীতে রেডিও জকি হিসেবেও কাজ করেছিলেন তিনি। খবরের জগৎ ছাড়া খেলাধুলো, ইতিহাসে অভিজিতের আগ্রহ রয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা: সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন নিয়ে অভিজিৎ তাঁর স্নাতক স্তরের পড়াশোনা সম্পন্ন করেছেন আশুতোষ কলেজ থেকে। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: ক্রিকেট, ফুটবল, টেনিস ছাড়া প্রায় সব ধরনের খেলা দেখতে তিনি ভীষণ ভালোবাসেন। কাজের বাইরে তাঁর অবসর কাটে বই পড়ে এবং বিভিন্ন বিষয়ে ডকুমেন্টারি দেখে।Read More
E-Paper


