বাড়ি-অফিসে ইডি হানা, ছুটলেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী! ED-র তল্লাশি নিয়ে পাল্টা হাইকোর্টে প্রতীক জৈনের পরিবার
বৃহস্পতিবার যাঁকে ঘিরে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ইডির মধ্যে রীতিমতো টানাপোড়েন চলল, সেই প্রতীক জৈন আসলে কে?
সাতসকালে কলকাতার রাজপথে কার্যত হলিউড থ্রিলার! বৃহস্পতিবার সকালে রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা আই-প্যাকের সল্টলেকের অফিস এবং সংস্থার প্রধান প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাড়িতে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-এর তল্লাশি নিয়ে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। আর এই তল্লাশি অভিযানের মাঝেই খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতি এবং সেখান থেকে নথিপত্র নিয়ে বেরিয়ে আসাকে কেন্দ্র করে চরম সাংবিধানিক সংঘাত তৈরি হয়েছে।

সূত্রের খবর, একটি পুরনো কয়লা পাচার মামলার সূত্রে সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে কলকাতা ও দিল্লির মোট ১০টি স্থানে এই তল্লাশি চালিয়েছে ইডি। আর রাজ্যের শাসকদল তৃণমূলের সঙ্গে ‘চুক্তিবদ্ধ’ ভোটকুশলী সংস্থা আই-প্যাকের অফিস ও কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে ইডির হানার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিন বেলা ১১টার পর প্রথমে প্রতীকের লাউডন স্ট্রীটের বাড়িতে যান মুখ্যমন্ত্রী। সেখান থেকে যান সংস্থার দফতরেও। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, ইডি তাঁর দলের আইটি সেলের অফিসে হানা দিয়ে সমস্ত তথ্য, প্রার্থী তালিকা, ভোটের রণকৌশল চুরি করেছে। বিজেপি এই কাজ করাচ্ছে। এই ধরনের কাজ প্রতিহিংসার রাজনীতি। এই ঘটনা গণতন্ত্রের হত্যা। আর বৃহস্পতিবার যাঁকে ঘিরে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ইডির মধ্যে রীতিমতো টানাপোড়েন চলল, সেই প্রতীক জৈন আসলে কে?
কে এই প্রতীক জৈন?
আদতে ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা প্রতীক জৈন আইআইটি বম্বে থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন। প্রশান্ত কিশোর পরবর্তী সময়ে আইপ্যাক-এর রাশ রয়েছে প্রতীকের হাতেই। তিনি একইসঙ্গে তৃণমূলের আইটি সেলেরও প্রধান। প্রতীক জৈনের লিঙ্কডইন প্রোফাইল থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে বম্বের ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতে ভর্তি হন তিনি। সেখান থেকে মেটালার্জিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেটেরিয়াল সায়েন্স নিয়ে বি.টেক করেছেন তিনি। বি টেক করার পর কিছুদিন অ্যাক্সিস ব্যাঙ্কে ইন্টার্নশিপ করেন তিনি। এরপরে ২০১২ সালে তথ্য ও প্রযুক্তি সংস্থা ডেলয়েটে কাজ শুরু করেন তিনি। এরপরই রাজনীতি নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। ২০১৩ সালে সিটিজেনস ফর অ্যাকাউন্টেবল গভর্নেন্স নামের একটি সংস্থা তৈরি করেন তিনি। ২০১৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত কাজ করেন। সংস্থাটি কাজ করত গুজরাটে। সে সময় প্রশান্ত কিশোরের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। এই প্রশান্ত কিশোরকে মুখ করেই ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি বা আইপ্যাক তৈরি করেন প্রতীক জৈন। সরকারিভাবে প্রতীকের সঙ্গে আই-প্যাকের সহ প্রতিষ্ঠাতা ভিনেশ চান্দেল ও ঋষিরাজ সিং। ২০১৫ থেকেই প্রতীকের সংস্থা আই-প্যাক বিভিন্ন রাজ্যে ভোটকুশলী হিসাবে কাজ করছে। এরমধ্যে রয়েছে বিহার, পাঞ্জাব, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং বাংলা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাফল্যের সঙ্গে। এখন বাংলায় তৃণমূলের পরামর্শদাতা হিসাবে কাজ করছেন প্রতীক জৈন।
মুখ্যমন্ত্রী ও ইডি টানাপোড়েন
সংবাদ সংস্থা পিটিআই-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালেই প্রতীকের বাড়ি এবং সল্টলেকের অফিসে হানা দেয় ইডি। ঠিক তখনই কেন্দ্রীয় সংস্থার ঘেরাটোপের মধ্যেই সশরীরে অকুস্থলে পৌঁছে গিয়ে ইডি আধিকারিকদের সামনে দিয়েই সবুজ ফাইল, ল্যাপটপের হার্ডডিস্ক ও ফোন নিয়ে বেরিয়ে যান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, ইডি আসলে তদন্তের নামে দলের নির্বাচনী কৌশল এবং গোপন নথিপত্র হাতাতে এসেছে। শুধু মুখ্যমন্ত্রী একা নন, তাঁর পাশাপাশি প্রতীকের অফিসে পৌঁছে যান কলকাতা পুলিশের কমিশনার মনোজ ভার্মা। পরে সেখানে হাজির হন রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার। বিধাননগরের মেয়র কৃষ্ণা চক্রবর্তী, রাজ্যের মন্ত্রী সুজিত বসু এবং বিধাননগরের পুলিশ কমিশনারকেও দেখা যায় প্রতীকের অফিসে।
এরপরেই সরাসরি বিজেপি তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘অমিত শাহ বাংলা জিততে হলে লড়াই করে জিতুন। আমাদের পার্টির আইটি সেল। কেন রেইড করবেন? অমিত শাহ নির্বাচনের মাধ্যমে জিতে দেখান। কেন আইটি রেইড? ইলেকশন কমিশন বিজেপির নির্দেশে হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমে কাজ করছে। কোনও লিখিত নির্দেশ নেই।' মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেন, ‘প্রতীকের বাড়িতে, অফিসে এসে এই রেইড। আমি মনে করি এটা অপমান সব আইটি দফতরের কর্মীদের। এটা গণতন্ত্রের হত্যা। স্বাধীনতার হত্যা। প্রধানমন্ত্রীকে বলব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণ করুন। নির্বাচনের পুরো স্ট্র্যাটেজি চুরি করা হয়েছে।’ বিজেপির উদ্দেশ্যে তাঁর হুঙ্কার, ‘এবার আসন সংখ্যা 0 হবে।'
আদালতে প্রতীক জৈনের পরিবার
ইডির তল্লাশি অভিযানের বিরোধিতা করে পাল্টা কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হল আইপ্যাক কর্ণধার প্রতীক জৈনের পরিবার। মামলা করতে চেয়ে হাইকোর্টের বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তারা। ইতিমধ্যে মামলা দায়েরের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার এই মামলার শুনানির সম্ভাবনা। বৃহস্পতিবার সকালে ইডির অভিযানের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতীকের লাউডন স্ট্রিটের বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে তিনি সল্টলেকে আইপ্যাকের দফতরেও যান। বেশ কিছু নথি এবং মোবাইল ও ল্যাপটপ নিয়ে নিজের গা়ড়িতে তোলেন তিনি। আর তাঁর এই অভিযানের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। এবার পাল্টা প্রতীকের পরিবার তাদের বিরুদ্ধে আদালতে গেল। দু’টি মামলাই শুক্রবার শোনা হতে পারে।
E-Paper

