'মেসি মাঠে ঢোকার পর...,' যুবভারতী-কাণ্ডে নয়া মোড়, অ্যাকাউন্টের টাকা ফ্রিজের পরেই বিস্ফোরক শতদ্রু
ক্রীড়াপ্রেমীদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে গত ১৩ ডিসেম্বর কলকাতায় পা রেখেছিলেন লিওনেল মেসি।
‘গোট ট্যুর’ শেষে দেশ ছেড়েছেন লিওনেল মেসি। কিন্তু কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে তাঁর অনুষ্ঠান ঘিরে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, তার রেশ এখনও কাটেনি। এই ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্তকে জেরা করে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য জানতে পেরেছেন তদন্তকারীরা। যুবভারতীর সেই বিশৃঙ্খলা কেন তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে এবার মুখ খুললেন শতদ্রু নিজেই।

গত ১৩ ডিসেম্বর, শনিবার কলকাতা বিমানবন্দর থেকে শতদ্রু দত্তকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন আদালত তাঁকে ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেয়। জানা গিয়েছে, যুবভারতীর মেসি অনুষ্ঠান ঘিরে বিশৃঙ্খলার কারণ জানতে তদন্তকারীরা টানা জেরা করেছেন শতদ্রুকে। গত ১৩ ডিসেম্বর যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে লিওনেল মেসির কলকাতা সফরের অনুষ্ঠানে অন্যতম অতিথি ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ঢোকার পরে মাঠ পরিক্রমার কথা ছিল মেসির। কিন্তু বাস্তবে তার আগেই মেসিকে নিয়ে উদ্যোক্তারা মাঠে হাঁটা শুরু করেন। কার অনুমতিতে সে দিন পূর্বনিধারিত কর্মসূচি বদলেছিল, তা জানতে চান রাজ্য সরকারের তৈরি বিশেষ তদন্তকারী দলের (সিট) সদস্যরা। এ বিষয়ে অনুষ্ঠানের মূল আয়োজক, পুলিশ হেফাজতে থাকা শতদ্রু দত্তর কাছ থেকে কোনও জবাব মেলেনি বলে সূত্রের খবর।
শনিবারই সে দিনের বিশৃঙ্খলা ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তদন্তের গতি বাড়িয়েছে সিট। শতদ্রুর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে থাকা প্রায় ২২ কোটি টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে অনুষ্ঠানের দিন বিক্রি হওয়া প্রায় ২২-২৫ কোটি টাকার টিকিটের অর্থ যাতে আয়োজক সংস্থার অ্যাকাউন্টে না ঢোকে, তা নিশ্চিত করতে চাইছেন তদন্তকারীরা। এমনকী, অনলাইন টিকিট বিক্রির দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাকে সিট জানিয়েছে, টিকিট বিক্রির টাকা যেন শতদ্রুকে না দেওয়া হয়। শুক্রবার শতদ্রুর রিষড়ার বাড়িতে তল্লাশি চালান সিটের অফিসাররা। সেই অভিযানে মেসির অনুষ্ঠান সংক্রান্ত একাধিক নথি এবং বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়। ওই নথি খতিয়ে দেখার পরেই আর্থিক লেনদেনের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করা হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, 'গ্রাউন্ড পাস' সংক্রান্ত বিষয়ও। প্রাথমিক ভাবে মাঠে প্রবেশের জন্য প্রায় ১৫০টি গ্রাউন্ড পাস নির্ধারিত থাকলেও পরে ওই সংখ্যা তিন গুণ বাড়ানো হয় বলে অভিযোগ। কার নির্দেশে এই সংখ্যা বাড়ানো হয়েছিল, কে বা কারা মাঠে ঢোকার অনুমতি পেয়েছিলেন এবং কীসের ভিত্তিতে-এ সব প্রশ্নের উত্তর জানতে শুক্রবার রাতে শতদ্রুকে দীর্ঘক্ষণ জেরা করেন সিটের অফিসারেরা।
সূত্রের খবর, জেরার সময় শতদ্রু দত্ত তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, প্রভাবশালী এক নেতার নির্দেশে পাসের সংখ্যা তিনগুণ বাড়ানো হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ কিছু করার ছিল না। সিটকে দেওয়া বয়ানে শতদ্রু আরও জানান, যুবভারতীতে পৌঁছনোর পরে ৭০-৮০ জন মানুষ মেসিকে ঘিরে ধরেন। সেই ভিড়ে ছিলেন মূলত মন্ত্রী ও ক্লাবকর্তারা। এক সময়ে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে, মাঠের ভিতরে লোকজনের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কির অবস্থা তৈরি হয়। বিষয়টি মেসিরও পছন্দ হয়নি। গ্যালারি থেকে দর্শকরা মেসিকে ঠিকমতো দেখতে পাননি বলে অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এক রকম বাধ্য হয়ে মাঠ থেকেই শতদ্রু ঘোষণা করেন, কেউ যেন ফুটবল তারকাকে ঘিরে না ধরেন। কিন্তু, এতে বিশেষ লাভ হয়নি বলে জেরায় দাবি করেছেন ওই আয়োজক। এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে তাঁর সংস্থার একাধিক কর্মী এবং সে দিন মাঠে উপস্থিতদের ধাপে ধাপে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তবে, এই লিস্টে রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস আছেন কি না, সে বিষয়ে সিটের তরফে সরকারি ভাবে কিছু জানানো হয়নি।
উল্লেখ্য, ক্রীড়াপ্রেমীদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে গত ১৩ ডিসেম্বর কলকাতায় পা রেখেছিলেন লিওনেল মেসি। ঠাসা কর্মসূচি ছিল তাঁর। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যুবভারতীতে মেসিকে এক নজর দেখার জন্য ভিড় জমান দর্শকরা। দর্শকদের অভিযোগ, যুবভারতীতে ঢোকার পর থেকেই মেসিকে ঘিরে ছিলেন ভিআইপিরা। সেই সংখ্যাটা কম করে ১০০ জনের বেশি। এই কারণেই গ্যালারিতে বসে থাকা সাধারণ দর্শকরা প্রায় ২০ মিনিট ধরে মেসিকে দেখতে পাননি বলে অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনায় শতদ্রুর বিরুদ্ধে দু’টি মামলা রুজু করেছে পুলিশ। বিধাননগর দক্ষিণ থানায় স্বতঃপ্রণোদিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।
E-Paper

