২০০২-র তালিকায় নাম নেই! উত্তর থেকে দক্ষিণ- SIR আতঙ্কে রাজ্যজুড়ে মৃত্যুমিছিল
রাজ্যজুড়ে এসআইআর ঘিরে এই ‘আতঙ্ক’ এখন রাজনৈতিক চাপানউতোরের কেন্দ্রবিন্দুতে।
শিয়রে এসআইআর বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন। আর সেই সংশোধনীর গেরোয় পড়ে ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কায় কী শেষ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক প্রাণ? উত্তর থেকে দক্ষিণ- রাজ্যের তিন প্রান্তে তিনটি মৃত্যুর খবর ঘিরে এই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠেছে। ২০০২-এর ভোটার তালিকায় এই তিন জনের নামই ছিল না। প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরিবারের স্পষ্ট দাবি, এসআইআর নিয়ে শুনানি শুরু হওয়ার পরেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তাঁরা।

কালিয়াগঞ্জে দিনমজুরের মৃত্যু
উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জের মৃত ব্যক্তির নাম লক্ষ্মীকান্ত রায় (৫৩)। তাঁর বাড়ি বোঁচাডাঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েতের চান্দইলে। মৃতের পরিবারের অভিযোগ, ২০০২-এর ভোটার তালিকায় লক্ষ্মীকান্ত, তাঁর স্ত্রী ও ছেলের নাম না থাকায় আগামী ১৯ জানুয়ারি তাঁদের বিডিও অফিসে শুনানির জন্য ডাকা হয়। তারপর থেকেই আতঙ্কে ভুগছিলেন দিনমজুর লক্ষ্মীকান্ত। সোমবার হাটের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু লোকজনে ভরা ধনকৈল্য হাটের মাঝে আচমকা মাথা ঘুরে পড়ে যান। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তাঁর। যার জেরে কালিয়াগঞ্জের সীমান্তবর্তী ধনকৈল্য হাটের ঘটনায় তুমূল চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। তড়িঘড়ি লক্ষ্মীকান্তকে উদ্ধার করে কালিয়াগঞ্জ স্টেট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন আগেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, মৃত লক্ষ্মীকান্ত রায় পেশায় দিনমজুর। কালিয়াগঞ্জের বোচাডাঙ্গার চান্দলের বাসিন্দা। স্ত্রী ও পুত্র রয়েছে। মৃতের ছেলে হীরু রায়ের দাবি, 'এসআইআরের শুনানির ডাক পেয়েছিলেন। তারপর থেকে ভীষণ আতঙ্কে খাওয়াদাওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলেন বাবা। ভয়ে বাইরে আর কাজে যেতেন না।' পরিবার সূত্রের দাবি, ২০০২ সালের ভোটারের তালিকায় লক্ষ্মীকান্ত রায় ও অন্যাদের নাম নেই। যদিও গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকবার ওই প্রৌঢ় ভোট দিয়েছিলেন। এই ঘটনায় জেলা পরিষদের পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ তৃণমূলের নিতাই বৈশ্য সরাসরি নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন,‘আরও একটা তরতাজা প্রাণ কেড়ে নিল নির্বাচন কমিশন।’ অন্যদিকে বিজেপি নেতা গৌরাঙ্গ দাসের বক্তব্য, ‘তৃণমূল বাজার গরম করতে অযথা রং চড়াচ্ছে।’
পূর্ব মেদিনীপুরে এসআইআর আতঙ্ক
পিছিয়ে নেই পূর্ব মেদিনীপুরও। কোলাঘাট থানার শহিদ মাতঙ্গিনী ব্লকের বরনান গ্রামে থাকতেন মৃত্যুঞ্জয় সরকার (৭৩)। মৃত্যুঞ্জয়ের এক ছেলে ও তিন মেয়ে। ছেলে, পেশায় শ্রমিক মন্টুর দাবি, এসআইআর-এর কাজ শুরুর পর থেকেই মৃত্যুঞ্জয় মানসিক চাপে ভুগছিলেন। গত ৪ জানুয়ারি বিডিও অফিসে এসআইআর সংক্রান্ত শুনানিতে ডাকা হলে সেখানে ১৯৭১ সালের দলিল-সহ অন্যান্য নথি দেখান মৃত্যুঞ্জয়। শুনানি থেকে ফিরে আরও ভেঙে পড়েন। পরিবার জানিয়েছে, রবিবার রাতে হঠাৎ বুকে ব্যথা শুরু হলে তাঁকে তমলুকের তাম্রলিপ্ত মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সোমবার, ১২ জানুয়ারি সকালে তাঁর মৃত্যু হয়। স্থানীয় পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য, তৃণমূল নেতা সৌমেন অধিকারী বলেন, ‘আমরা অনেক ভাবেই তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। কেন্দ্র সরকার যে ভাবে বাংলার মানুষের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করছে, তারই শিকার হলেন এই প্রবীণ ব্যক্তি।’ তমলুক সাংগঠনিক জেলার বিজেপি সম্পাদক তাপস পাত্র বলেন, ‘৭৩ বছর বয়স। বয়সজনিত কারণেও স্বাভাবিকভাবে তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তৃণমূল যে কোনও মৃত্যুকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার চেষ্টা করছে।’
বাদুড়িয়ায় বৃদ্ধার মৃত্যু
উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়ার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা অনিতা বিশ্বাস (৭৫)-এর মৃত্যু নিয়েও একই অভিযোগ উঠেছে। ৭ জানুয়ারি অসুস্থ হয়ে পড়েন। বসিরহাট জেলা হাসপাতালে রবিবার রাত ১১টা নাগাদ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় অনিতার। তাঁর ছেলে কাশীনাথ মায়ের মৃত্যুর জন্য এসআইআর-কেই দায়ী করে বলেন, ‘২০০২-এর ভোটার তালিকায় আমাদের সবার নাম থাকলেও মায়ের নাম ছিল না। মা খুব চিন্তা করছিল। বলেছিল, আমাকে এখান থেকে চলে যেতে হবে।’ গত ৫ জানুয়ারি শুনানিতে ডাকা হয়েছিল বৃদ্ধাকে। ওই দিন নথিপত্র জমা দিয়েও আশ্বস্ত হতে পারেননি বৃদ্ধা। তাঁর খবর পেয়েই পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন তৃণমূলের বসিরহাট জেলা সভাপতি বুরাহানুল মুকাদ্দিম শাহনাওয়াজ সরদার ও স্থানীয় নেতৃত্ব। বুরহানুল মুকাদ্দিন বলেন, ‘২০০২-এর আগে ও পরে তো ওঁর নাম তালিকায় ছিল। পরিবারের সকলের নাম আছে।’
উল্লেখ্য, রাজ্যজুড়ে এসআইআর ঘিরে এই ‘আতঙ্ক’ এখন রাজনৈতিক চাপানউতোরের কেন্দ্রবিন্দুতে। শাসক দল তৃণমূলের দাবি, ২০০২-এর তালিকার দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষকে অহেতুক হেনস্থা করছে কমিশন। পাল্টা বিজেপির বক্তব্য, সরকারি প্রক্রিয়ার সঙ্গে মৃত্যুর কোনও সম্পর্ক নেই, মানুষের ভয় ভাঙানোর বদলে তৃণমূল উল্টে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। কিন্তু রাজনীতির এই দড়ি টানাটানির মাঝে বাদুড়িয়া থেকে কালিয়াগঞ্জ- কান্নার সুরটা সব জায়গাতেই এক। নথির গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খেতে খেতে সাধারণ মানুষের প্রাণ যাওয়া কী তবে দস্তুর হয়ে দাঁড়াল? উত্তর খুঁজছে আমজনতা।
E-Paper











