Santali language: বাংলার অধ্যাপকের ইতালি জয়! সাঁওতালি ভাষা ও সাহিত্যে প্রথম আন্তর্জাতিক পুরস্কার ভারতীয়র
Santali language: ওই অধ্যাপক সাঁওতালি ভাষায় ভারতের সংবিধান অনুবাদ করেছিলেন। যা ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত হয়। অলচিকি লিপিতে অনূদিত ওই গ্রন্থ সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষজনকে তাদের সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।
Santali language: সাঁওতালি ভাষা ও সাহিত্যের অবদানের জন্য এই প্রথম আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেলেন এক ভারতীয় অধ্যাপক। পুরুলিয়ার সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাঁওতালি বিভাগের স্থায়ী সহকারী প্রফেসর ড: শ্রীপতি টুডু এই সম্মান পেলেন। ইতালির পিয়েদমোন্ত অঞ্চলে ১৮ তম আন্তর্জাতিক ওসতানা উৎসবে তরুণ লেখক হিসাবে ওসতানা পুরস্কার পান। চলতি মাসের ২৫ থেকে ২৮ জুন ওই উৎসব চলে। শেষ দিনে রবিবার এই সম্মাননা ওই অধ্যাপক তথা ভাষাবিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর আগে ২০১৪ সালে এই সম্মান পেয়েছিলেন বিখ্যাত ভাষাবিদ গণেশ এন. দেবী। সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের এই পুরস্কার দ্বিতীয় ভারতীয় এবং সাঁওতালি ভাষার ইতিহাসে প্রথম।

এর আগে রাষ্ট্রপতি দ্রোপদী মুর্মুর থেকে পুরস্কার ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছ থেকেও প্রশংসা পেয়েছেন ড: শ্রীপতি টুডু। এবার আন্তর্জাতিক পুরস্কার ইতালি থেকে পেলেন প্রফেসর শ্রীপতি টুডু। এর আগে তিনি স্পেনে চতুর্থ মাইনরিটিজ ল্যাঙ্গুয়েজ স্পিকার সামিটে সাঁওতালি ভাষার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন। সমগ্র বিশ্বজুড়ে বিপন্ন, সংখ্যালঘু ও আদিবাসী মাতৃভাষাগুলো সংরক্ষণ এবং সাহিত্য চর্চাকে উদযাপন করতে আন্তর্জাতিক ওসতানা উৎসবে পুরস্কার দেওয়া হয়ে থাকে। প্রতি বছর ওসতানা মিউনিসিপালিটি এবং 'চামব্রা ডক' নামের একটি সাংস্কৃতিক সংস্থার যৌথ উদ্যোগে এই আন্তর্জাতিক উৎসবের আয়োজন করা হয়। ড: শ্রীপতি টুডুর এই সম্মান বিশ্বমঞ্চে সাঁওতালি ভাষা ও অলচিকি লিপির মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দিল এমন কথাই বলছেন সাঁওতাল সমাজের মানুষজন। তাঁর কথায়, 'আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের নাম তুলে ধরতে পেরেছি। তুলে ধরতে পেরেছি সাঁওতালি ভাষা ও সাহিত্যকে। এটাই আমার কাছে সবচেয়ে গর্বের।' অধ্যাপককে নিয়ে গর্বিত গোটা দেশ। বর্তমানে তিনি রোমে রয়েছেন। ২ জুলাই রওনা দেবেন। ৩ তারিখ ফিরবেন কলকাতায়।
ওই অধ্যাপক সাঁওতালি ভাষায় ভারতের সংবিধান অনুবাদ করেছিলেন। যা ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত হয়। অলচিকি লিপিতে অনূদিত ওই গ্রন্থ সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষজনকে তাদের সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও মুগ্ধ শ্রীপতি টুডুর কাজে। ২০২২ সালের ২৯ মে ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, শ্রীপতি টুডুর সাঁওতালি ভাষায় এই কাজ প্রশংসার যোগ্য। বিশেষ করে, অলচিকি হরফে সংবিধানের অনুবাদ এক ঐতিহাসিক দলিল। সেই কাজের জন্য ২০২৩-এ রাজ্যের তৎকালীন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস তাঁকে সম্মানিত করেন। এই বছর অলচিকি হরফ আবিষ্কারের শততম বর্ষ। সেই উপলক্ষে ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রক তাঁকে বিশেষ সম্মান জানিয়েছে। চলতি বছরের মার্চে শিলিগুড়িতে আন্তর্জাতিক সাঁওতাল কাউন্সিলের তরফে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু তাঁকে ‘সাধু শামু মুর্মু’ পুরস্কারে সম্মানিত করেন। পেয়েছেন বেঙ্গালুরু অল সাঁওতালস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু পুরস্কার (২০২৫), অল ইন্ডিয়া সাঁওতালি রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক্সট্রা অর্ডিনারি অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড (২০২৩)।
রাজধানীতে প্রজাতন্ত্র দিবসের প্যারেডে প্রফেসর ড: শ্রীপতি টুডু আমন্ত্রিত থেকেছেন ভারত সরকারের বিশেষ অতিথি হিসেবে। তিনি শুধু ভাষাবিদ নন। কবি, গল্পকার এবং প্রাবন্ধিক। সাঁওতালি সাহিত্যের ইতিহাস, হ্যান্ড বুক অফ স্পোকেন সাঁওতালি, ছোটগল্পের সংকলন ‘ইসি জড় রুতি কাহানি’-সহ তাঁর নানা বই সমাদৃত হয়েছে। তালিকায় রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৬৫টি কবিতার সাঁওতালি অনুবাদ ‘রবিগালাং তুগেমড়’ শীর্ষক বই। তিনি সাঁওতালি ভাষাকে প্রাচীনত্বের ঘেরাটোপে না-রেখে আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল মাধ্যম এবং উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে নতুন প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় করার কাজ করছেন। প্রাচীন আদিবাসী দর্শনকে সমসাময়িক বিশ্বের উপযোগী করে তোলার এই অনন্য লড়াইকে স্বীকৃতি এই আন্তর্জাতিক সম্মান।
বাঁকুড়া জেলা খাতড়ার মুড়াগ্রামের বাসিন্দা শ্রীপতি টুডু প্রান্তিক কৃষক পরিবারের সন্তান। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনিই ছোট। তিনি বাঁকুড়া জেলার ঝিলিমিলি হাইস্কুল থেকে প্রথম ভাষা হিসেবে সাঁওতালি নিয়ে মাধ্যমিক ও বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর পন্ডিত রঘুনাথ মুর্মু স্মৃতি মহাবিদ্যালয় থেকে সাঁওতালি অনার্স নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১৩ সালে নেট কোয়ালিফাই করার পর তিনি গবেষণায় মনোনিবেশ করেন। ২০২৫ সালে বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাঁওতালি সাহিত্যে উপন্যাসের রূপ ও গঠন শিক্ষক গবেষণা পত্রের জন্য তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। এরমধ্যে ২০১৪ সালে ঝাড়গ্রামের নয়াগ্রাম পন্ডিত রঘুনাথ মুর্মু সরকারি মহাবিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। তারপর ২০১৬ সালে পুরুলিয়ার সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাঁওতালি ভাষার অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এখন তিনি কলকাতার 'ইনস্টিটিউট অব ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড রিসার্চ' (আইএলএসআর)-এর সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন।
ওসতানা উৎসবের মূল বিষয় ছিল, স্বাধীনতা প্রান্তিক সীমানায় বাস করে। জুরি কমিটি জানিয়েছে, অধ্যাপক কেবল প্রাচীন ঐতিহ্যের বৃত্তে আটকে থাকেননি। তিনি একদিকে যেমন সাঁওতালি ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছেন। তেমনই নিজের শিক্ষামূলক ইউটিউব চ্যানেল, এআই প্রযুক্তির ব্যবহার, আধুনিক ভিজুয়াল গ্রাফিক্সের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে লিপিকে সচল, আকর্ষণীয় করে তুলেছেন। যা ওসতানা কমিটির মূল ভাবনার সঙ্গে হুবহু মিলে গিয়েছে।
E-Paper

