WB Govt Employees: বিতর্কের মুখে ‘অগণতান্ত্রিক’ নির্দেশিকা থেকে কাদের বাদ দিল শুভেন্দু সরকার?
Administrative Directive:গত বুধবার মুখ্যসচিব মনোজ অগরওয়ালের জারি করা ওই নির্দেশিকা রাজ্যের সমস্ত দফতর, কমিশনার, জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে।
Administrative Directive: রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠন হয়েছে এখনও একমাস হয়নি। এর মধ্যেই রাজ্য সরকারি আধিকারিক ও কর্মচারীদের পাশাপাশি এবার শিক্ষকদের বাকস্বাধীনতার ওপরও কি কোপ বসাতে চাইছে সরকার? প্রশাসনিক তথ্য প্রকাশ এবং জনসমক্ষে মতামত দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন করে কড়া আচরণবিধি জারিকে কেন্দ্র করে এমনই গুরুতর অভিযোগ তোলেন শিক্ষকদের একাংশ। রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপকে ‘অগণতান্ত্রিক’ এবং ‘কণ্ঠরোধের চেষ্টা’ বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাঁরা। একইসঙ্গে অবিলম্বে এই নির্দেশিকা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে সরব হয় বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন। তারপর সেই নির্দেশিকার আওতা থেকে সরকার-পোষিত বা স্বায়ত্তশাসিত স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে বাদ দিয়েছে রাজ্য সরকার। অর্থাৎ শিক্ষকরা সমালোচনা করতে পারবেন।

নতুন নির্দেশিকায় কী বলা হয়েছে?
গত বুধবার মুখ্যসচিব মনোজ অগরওয়ালের জারি করা ওই নির্দেশিকা রাজ্যের সমস্ত দফতর, কমিশনার, জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে। আইএএস, ডবলিউবিসিএস, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ সার্ভিসের আধিকারিকদের পাশাপাশি রাজ্যের অন্যান্য সরকারি কর্মচারী, জেল কর্মী, সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বোর্ড, পুরসভা, পুর নিগম ও স্বশাসিত সংস্থার কর্মীদের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, সরকারের পূর্ব অনুমতি ছাড়া কোনও সরকারি কর্মী কোনও সংবাদমাধ্যম আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারবেন না। এছাড়াও সংবাদমাধ্যমের কাছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে কোনও সরকারি তথ্য, নথি বা প্রশাসনিক কাগজপত্র তুলে দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রেডিও বা অন্য সম্প্রচার মাধ্যমেও কোনও কথা বলার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। সরকারি কর্মীদের কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিরূপ মন্তব্য বা সমালোচনা করা থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
সরব শিক্ষকদের একাংশ
বুধবার প্রাথমিক নির্দেশিকা সামনে আসতেই সরব হয়েছেন শিক্ষকদের একাংশ। রাজ্যের প্রথম সারির এক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপক বলেন, 'পৃথিবীর নানা প্রান্তের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। কোথাও এই ধরনের কোনও ফতোয়া দেখিনি।' অবশ্য কলকাতার এক শিক্ষক দাবি করেন, তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় এসে এ ভাবেই ফতোয়া জারি করেছিল। সরকারি কলেজের এক অধ্যাপককে কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়েছিল বলেও তাঁর দাবি। সেই নোটিসের উত্তরে ওই অধ্যাপক স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, সার্ভিস রুল-এ কোথাও মত প্রকাশের স্বাধীনতায় সরকারি হস্তক্ষেপের কথা বলা হয়নি। কারণ তা ভারতীয় সংবিধানের পরিপন্থী।
সার্ভিস রুল কী বলছে?
সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক মন্তব্য বা সরকারি গোপন নথি প্রকাশ্য করলে তা অপরাধ হিসাবে গণ্য হয়। গণমাধ্যমে মতপ্রকাশ করলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে শুধুমাত্র অবগত করার কথা বলা হয়েছে। ওই অধ্যাপক তা করেছিলেন। কারণ দর্শানোর নোটিস পেয়ে উচ্চ শিক্ষা দফতরকে উত্তরও দেন তিনি। তারপর ১৫ বছর ধরে একই ভাবে গণমাধ্যমে নিজের মতপ্রকাশ করে আসছেন তিনি। সরকার তাঁর বিরুদ্ধে আর কোনও পদক্ষেপ করেনি। এই দৃষ্টান্ত তুলে ধরে শিক্ষকদের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বিজেপি সরকার যে ভাবে সরাসরি মতপ্রকাশে হস্তক্ষেপ করতে চাইছে তা অসাংবিধানিক। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন ওয়েবকুটা-র রাজ্য সম্পাদক নিলয়কুমার সাহা বলেন, 'এক অগণতান্ত্রিক সরকারকে সরিয়ে এই সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন ঘটবে। কিন্তু ক্ষমতায় এসেই এ ভাবে আদেশনামা প্রকাশ করে গণতন্ত্রের কণ্ঠ রোধের চেষ্টা অভিপ্রেত নয়।' সংগঠনের পক্ষ থেকে তিনি এই সরকারি আদেশনামা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
বলে রাখা প্রয়োজন, স্কুলের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য। তাই স্কুল শিক্ষকদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে ক্ষোভ। এক শিক্ষক বলেন, 'শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজতে চাইছে সরকার। তাতে আমরা সমর্থনও করছিলাম। কিন্তু এ ভাবে আমাদের মুখ চেপে ধরলে তো কোনও উন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকারের কোনও পদক্ষেপ ভুল হলে সেটা বলা যাবে না? তা হলে আর গণতন্ত্র কোথায়?' এই প্রসঙ্গে বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, 'গতকাল সরকারের এই নির্দেশিকা দেখে আমরা তো হতবাক। যে সরকার গণতান্ত্রিক ভাবে, গণতন্ত্রের কথা বলে ক্ষমতায় এল, ১৫ দিন না হতেই সেই গণতন্ত্রের, বাক্স্বাধীনতার কণ্ঠ রোধ করার চেষ্টা শুরু করল। এটাই কি শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের অকুণ্ঠ সমর্থনের প্রতিদান!' তাঁর দাবি, রাজ্যের শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীরা মধ্যশিক্ষা পর্ষদের ২০১৮ সালের আচরণ বিধি অনুযায়ী পরিচালিত হয়ে থাকেন। তাই এই নির্দেশ মানার কোনও বাধ্যবাধকতা তাঁদের নেই।
তবে রাজ্য রাজনীতিতে এই নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করে তুমুল শোরগোল তৈরি হলেও, প্রশাসন সূত্রের খবর, কোনও নতুন আইন জারি করছে না পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ক্ষমতায় এসে বিজেপি সরকার পুরনো আইনই ফের একবার মনে করিয়ে দিতে চাইছে। পরবর্তীতে সেই নির্দেশিকার আওতা থেকে সরকার-পোষিত বা স্বায়ত্তশাসিত স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে বাদ দিয়েছে রাজ্য সরকার। অর্থাৎ শিক্ষকরা সমালোচনা করতে পারবেন।
E-Paper

