পদ্মশিবিরে সার্জিকাল স্ট্রাইক তৃণমূলের? উত্তরবঙ্গের সাংসদকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ মমতার
দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে অনন্ত মহারাজের দূরত্ব বাড়ছিল। এদিন সরাসরি সরকারি মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রীর হাত থেকে সম্মান গ্রহণ এবং তাঁর পাশে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকায় রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
ছাব্বিশের মহারণের আগেই অস্বস্তি বাড়ল রাজ্য বিজেপির। শনিবার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে এক ফ্রেমে ধরা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিজেপির রাজ্যসভা সাংসদ অনন্ত মহারাজ। আর ভাষা দিবসের সরকারি মঞ্চেই রাজবংশী সম্প্রদায়ের উন্নয়ন ও প্রসারে বিশেষ অবদানের জন্য তাঁকে রাজ্যের সর্বোচ্চ সম্মান ‘বঙ্গবিভূষণ’-এ ভূষিত করেন মুখ্যমন্ত্রী। তারপরেই গেরুয়া শিবিরের বিরুদ্ধে একরাশ ক্ষোভ উগরে দিলেন অনন্ত মহারাজ।

দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে অনন্ত মহারাজের দূরত্ব বাড়ছিল। এদিন সরাসরি সরকারি মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রীর হাত থেকে সম্মান গ্রহণ এবং তাঁর পাশে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকায় রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। লোকসভা নির্বাচনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে এই ঘটনাকে উত্তরবঙ্গে বিজেপির বড়সড় ভাঙনের ইঙ্গিত হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে এদিন অনন্ত মহারাজ ছাড়াও বঙ্গবিভূষণ সম্মান পান শিবাজী চট্টোপাধ্যায়, নচিকেতা চক্রবর্তী, শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধ্যায়, গণেশচন্দ্র হালুই, লোপামুদ্রা মিত্র, বাবুল সুপ্রিয়, ইমন চক্রবর্তী এবং শ্রীজাত। তবে রাজনৈতিক মহলের সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল অনন্ত মহারাজকে নিয়ে। বঙ্গবিভূষণ সম্মান পেয়ে তিনি কী বলেন, সেদিকে তাকিয়ে ছিল সবাই।
কী বললেন অনন্ত মহারাজ?
রাজবংশীদের হয়ে কাজের জন্য অনন্ত মহারাজকে বঙ্গবিভূষণ সম্মান প্রদান করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সম্মান পাওয়ার পর নিজের একটি কবিতা পড়ে শোনান অনন্ত মহারাজ। সেখানে আর কিছু বলেননি তিনি। কিন্তু, সম্মান পাওয়ার পর বাইরে বেরিয়ে এসে বিজেপির বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন। কোচবিহার ও রাজবংশীদের জন্য বিজেপি কিছু করেনি বলে সরব হয়েছেন তিনি। অনন্ত মহারাজ বলেন, দিনের পর দিন তাঁরা স্রেফ বঞ্চনা, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। উত্তরবঙ্গে জন্য কোনও কাজ হয়নি। বিশেষ করে কোচ, রাজবংশী জনজাতির জন্য কাজ হয়নি। অনন্তের মন্তব্য এবং ভাব-ভাঙ্গি দেখে বিধানসভা ভোটের মুখে উত্তরবঙ্গের রাজনীতির অলিন্দে নতুন করে দলবদলের জল্পনা দানা বাঁধতে শুরু করেছে। এদিন মঞ্চে আবার অনন্ত মহারাজের দীর্ঘায়ু কামনা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, 'রাজবংশী ভাষার জন্য যেভাবে আন্দোলন করছেন করে যান। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। সমাজের কাজে সব সময় নিজেকে সেবায় নিয়োজিত রাখুন।'
বিজেপির প্রতিক্রিয়া
অনন্ত মহারাজের বঙ্গবিভূষণ সম্মান পাওয়া নিয়ে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, 'অনন্ত মহারাজ আমার সহকর্মী, আমার সতীর্থ। আমরা একইসঙ্গে রাজ্যসভায় পাশাপাশি বসি। আমার সতীর্থ যদি পুরস্কৃত হন, সম্মানিত হন, আমার কাছে এর চেয়ে আনন্দের কিছু নেই।' তবে বিজেপির বিরুদ্ধে অনন্ত মহারাজ যা বলেছেন, সেই নিয়ে প্রশ্নের জবাব দেননি তিনি।
উত্তরবঙ্গের তুরুপের তাস
২০২৩ সালের অগস্টে বাংলা থেকে বিজেপির টিকিটে রাজ্যসভার সাংসদ হন অনন্ত মহারাজ। তবে বেশ কিছুদিন ধরেই বিজেপির সঙ্গে তাঁর দূরত্ব সামনে এসেছে। এবার ভোটের আগে বঙ্গবিভূষণ সম্মান পাওয়ার পর অনন্ত মহারাজ যা বললেন, তাতে বিজেপি বেকায়দায় পড়বে কিনা, তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। বিধানসভা ভোটে কোচবিহারে রাজবংশী ভোট এখন কার দিকে ঝুঁকে, সেটাই দেখার। যদিও এই বিষয়ে অনন্ত মহারাজ বা তৃণমূল নেতৃত্বের তরফে সরাসরি দলবদল নিয়ে কোনও মন্তব্য করা হয়নি, তবে মঞ্চের এই রসায়ন তৃণমূলের শক্তিবৃদ্ধির স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে। এদিকে, উত্তরবঙ্গের রাজবংশী ভোটব্যাঙ্কে অনন্ত মহারাজের প্রভাব অনস্বীকার্য। এর আগে কোচবিহারে তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গেও তাঁর সুসম্পর্কের কথা কারও অজানা নয়। দীর্ঘকাল ধরে পৃথক রাজ্যের দাবি জানিয়ে আসা অনন্তর গলায় এ দিন মুখ্যমন্ত্রীর হাত থেকে সম্মান নেওয়ার সময় যে সৌজন্য দেখা গিয়েছে, তা বিশেষ ইঙ্গিতবাহী। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, উত্তরবঙ্গে হারানো জমি ফিরে পেতে অনন্তকে কাছে টানা তৃণমূলের বড় রাজনৈতিক চাল হতে পারে।
E-Paper

