মেধাবী চিকিৎসক থেকে ভবঘুরে! দক্ষিণ কলকাতার সৌরভের এক করুণ কাহিনী

সৌরভ ঘোষের পাড়ায় পৌঁছে খোঁজখবর নিতেই সামনে আসে আসল রহস্য।

Published on: Jan 30, 2026, 22:11:53 IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

দক্ষিণ কলকাতার নাকতলা, রামগড় এবং বাঘাযতীন এলাকার সরু গলিতে, প্রায়শই এক ভবঘুরে যুবককে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। আর স্বাভাবিক ভাবেই এলোমেলো চুল, লম্বা দাড়ি, ময়লা পোশাক পড়া যুবকটিকে পথচারীদের এড়িয়ে চলেন। এলাকার অধিকাংশ বাসিন্দার কাছে তিনি শুধুমাত্র মানসিক ভারসাম্যহীন হিসেবে পরিচিত। কিন্তু তাঁর নেপথ্যে যে করুণ কাহিনী রয়েছে, তা প্রকাশ্যে আসতেই বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছেন বাসিন্দারা।

দক্ষিণ কলকাতার সৌরভের এক করুণ কাহিনী
দক্ষিণ কলকাতার সৌরভের এক করুণ কাহিনী

টাইমস নাউ-এর প্রতিবেদন অনুসারে, কখনও যদি কেউ ওই যুবককে একটি ডায়েরি বা নোটবুক এবং পেন দেন অত্যন্ত খুশি হয় সে। সারাদিন ধরে সেই নোটবুকের পাতায় বিভিন্ন ওষুধের নাম লিখে রাখে। যদি তাঁকে কোনও অসুস্থতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তাহলে সে তার নোটবুকের পাতায় একের পর এক ওষুধ বা ইনজেকশনের নাম লিখতে শুরু করে।পৃষ্ঠার শেষে, তিনি তার ডিগ্রি এবং একটি রেজিস্ট্রেশন নম্বর উল্লেখ করতেও ভোলেন না। যা দেখে অনেকেই অবাক হন যে একজন মানসিক ভারসাম্যহীন রোগী কীভাবে এত ওষুধের নাম জানেন বা কীভাবে তার চিকিৎসা বিজ্ঞান এমন জ্ঞান রয়েছে। টাইমস নাউ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ওই যুবকের পাড়ায় পৌঁছয়।

তাঁর পাড়ায় পৌঁছে খোঁজখবর নিতেই সামনে আসে আসল রহস্য। আজ এই এলাকায় যিনি মানসিক ভারসাম্যহীন রোগী হিসেবে পরিচিত, তিনি দুই দশক আগে একজন নামে চিকিৎসক ছিলেন। তিনি আর কেউ নন, ডাঃ সৌরভ ঘোষ। তিনি ২০০৩ সালের দিকে কলকাতার বিখ্যাত মেডিকেল কলেজ নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে তার মেডিকেল পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। শৈশবে সৌরভ অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন সৎ ও ভদ্র ছেলে হিসেবে পাড়ায় সৌরভ ঘোষের যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। তাঁর বাবা রেলে চাকরি করতেন এবং প্রাইভেট টিউটরও ছিলেন। বাবা-মা ছাড়াও বাড়িতে তাঁর এক দিদি এবং ছোট ভাই ছিল। তাঁরাও মেধাবী পড়ুয়া ছিলেন। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তিন ভাইবোনের মধ্যে মানসিক সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। সৌরভের দিদি সাথী ঘোষও মেডিকেল নিয়ে পড়াশোনা করেন। কিন্তু পরে মানসিক অসুস্থতার কারণে তাঁর জীবনে বিশেষ প্রভাব পড়ে। কয়েক বছর আগে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এবং পরে মৃত্যু হয়।

সৌরভের ছোট ভাই গৌরব ঘোষও একজন মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি রাজ্যের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন। কিন্তু পরে মানসিক অসুস্থতার কারণে তাঁর মৃত্যু হয়। অবশ্য তাঁদের বাবা-মা অনেক আগে মারা গিয়েছিলেন। এদিকে, সৌরভ ঘোষ তার পরিবারের একের পর এক দুর্যোগের মধ্যে বেড়ে ওঠেন। সৌরভের ছোটবেলার বন্ধু পৃথ্বীশ চক্রবর্তী টাইমস নাউকে বলেন, '১৯৯৭ সালে নাকতলা হাইস্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর, সৌরভ জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় দুর্দান্ত নম্বর পান এবং রাজ্য সরকার পরিচালিত কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পান।' প্রতিবেশীরাও টাইমস নাউকে জানান, সৌরভ অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে মেডিকেল পাশ করেন এবং একজন কার্ডিয়াক সার্জন হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর মানসিক সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। তার এক প্রতিবেশী বলেন, সৌরভ ধীরে ধীরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তাঁর অসুস্থতার কারণে ভবিষ্যৎও অন্ধকারে চলে যায়। তারপর থেকে, ডাঃ সৌরভ ঘোষ তার বাড়ির এক তলায় এক কোণে একটি নোংরা ঘরে বসবাস করছেন।

যে যুবকটির একদিন রোগীদের চিকিৎসা এবং খ্যাতি অর্জন করে বিলাসবহুল জীবনযাপন করার কথা ছিল, সে এখন ঘরের এক নোংরা কোণে পড়ে রয়েছে। তাঁর দেখাশোনা করার মতো কেউ নেই। সৌরভের বাড়ির দেওয়ালে অসংখ্য লেখা রয়েছে। দেওয়ালগুলো ভালো করে দেখলে বোঝা যায় যে, দেওয়ালে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালের নাম লেখা রয়েছে। আবার, একটি দেওয়ালে তাঁর নাম, রেজিস্ট্রেশন নম্বর এবং মেডিকেল ডিগ্রি লেখা ছিল। তার প্রতিবেশীরা জানিয়েছে, সৌরভ যখনই পেন পায়, তখনই সে দেওয়ালে তাঁর নাম, রেজিস্ট্রেশন নম্বর এবং ডিগ্রি লিখে রাখে। কয়েকজন প্রতিবেশী সৌরভকে তিনবেলা খাবার দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। একজন প্রতিবেশী দাবি করেছেন যে তারা অতীতে অনেকবার সৌরভের চিকিৎসা করার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু তাতে কোনও লাভ হয়নি। তিনি তিনবার বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। মুদি দোকানের মালিক শঙ্কর বলেন, 'যদিও সৌরভ আজ মানসিক রোগী, তবুও তাঁর প্রতিটি ওষুধের নাম মনে আছে. যখনই কেউ তাকে কোনও ওষুধের পরামর্শ দিতে বলেন, তখন উত্তর দিতে সৌরভের ২ সেকেন্ডও সময় লাগে না।'