'পাঁচালি’ প্রচারে কড়া প্রহরা! ছাব্বিশের মহারণের আগে 'তিন অস্ত্রে' বাজি ধরল নবান্ন
তৃণমূলের সর্বোচ্চ স্তরের নেতৃত্ব বিশ্বাস করেন রাস্তা, পানীয় জল, আলো সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা।
ভোটের মুখে উন্নয়নকে সামনে রেখে নতুন করে ময়দানে নামছে নবান্ন। মাথার উপর পাকা ছাদ আর বাড়ির দোরগোড়ায় ঝকঝকে রাস্তা-এই দু’টি মৌলিক চাহিদাকে সামনে রেখে তিনটি কর্মসূচি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান করতে মরিয়া রাজ্য সরকার। ফেব্রুয়ারির মধ্যেই যাতে সাধারণ মানুষ চোখে দেখতে পান ‘কাজ হচ্ছে’, সেই নির্দেশ জেলাগুলিতে পাঠানো হয়েছে। প্রশাসনের পাশাপাশি শাসকদল তৃণমূল ও পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাক-তিন পক্ষই এখন একই লক্ষ্যে সক্রিয়।

তৃণমূলের সর্বোচ্চ স্তরের নেতৃত্ব বিশ্বাস করেন রাস্তা, পানীয় জল, আলো সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা। তারপরে বাকি সব কিছু। সেই সূত্র ধরেই ‘মাথায় ছাদ’ ও ‘দোরগোড়ায় রাস্তা’-এই দু’টি বিষয়কে ভোটের আগে ফোকাসে আনতে মাঠে নেমেছে জেলা প্রশাসন। শাসক দলের এক শীর্ষ নেতার কথায়, 'এই পথেই গত লোকসভা ভোটে বিজেপির মেরুকরণকে ভোঁতা করা গিয়েছিল।' যদিও এবার পরিস্থিতি আলাদা-বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, আরজি কর পর্বে জনরোষ-সব মিলিয়ে সমীকরণ জটিল। তবু পুরনো পথেই নতুন ভোটে যেতে চাইছে তৃণমূল।
প্রথম স্তম্ভ-আবাসন
আগের দফায় ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পে ১২ লক্ষ পরিবারকে অর্থ দিয়েছে রাজ্য সরকার। এবার বিধানসভা নির্বাচনের আগে আরও ১৬ লক্ষ পরিবার পাবে প্রথম কিস্তির ৬০ হাজার টাকা। রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী প্রদীপ মজুমদার বলেন, ‘এখনও তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। তবে জানুয়ারি মাসেই আবাসের প্রথম কিস্তির অর্থ উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি পৌঁছে যাবে।' সব মিলিয়ে ২৮ লক্ষ পরিবার পাকা ঘরের আর্থিক সহায়তা পাচ্ছে বা পেয়ে গিয়েছে। এরমধ্যে ১২ লক্ষ পরিবার দুই কিস্তিই পেয়েছে। ১৬ লক্ষ পরিবার ভোটের আগে পেতে চলেছে প্রথম কিস্তির ৬০ হাজার টাকা। তৃণমূলের আশা, অর্থনৈতিক ভাবে প্রান্তিক অংশের যে ২৮ লক্ষ পরিবার মাথায় পাকা ছাদ পাচ্ছে বা পেয়েছে, তার প্রভাব ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হবে।শাসক দলের হিসেব অনুযায়ী, গড়ে একটি পরিবারে চার জন ধরলে সুবিধাভোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় সওয়া ১ কোটি। যদিও প্রশাসনের একাংশের মতে, পরিবারের সবাই ভোটার নন-ফলে বাস্তব সংখ্যা কিছুটা কম হতে পারে। তবু প্রান্তিক অর্থনীতির এত বড় অংশের উপর প্রভাব যে ভোটে পড়বে, তা নিয়ে তৃণমূল আশাবাদী। পঞ্চায়েত দফতরের এক আমলার বক্তব্য, প্রতি পরিবারের সকলেই ভোটার হবেন তা নয়। ফলে সংখ্যাটা ১ কোটির নীচে থাকবে।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তম্ভ-রাস্তা
বাড়ির পাশাপাশি দোরগোড়ায় ঝকঝকে রাস্তা যাতে সাধারণ মানুষ চাক্ষুষ করতে পারেন, তার জন্যেও জোড়া কর্মসূচি চালাচ্ছে নবান্ন। ‘আমাদের পাড়া, আমাদের সমাধান’ প্রকল্পে বুথপিছু ১০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেছে রাজ্য সরকার। যে প্রকল্পে একেবারে পাড়ার রাস্তা, সৌরবাতি, ছোট সেতু নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। পাশাপাশি, বড় রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য ‘পথশ্রী-৪’ শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পে সারা রাজ্যে মোট ২০ হাজার কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে।
এই তিন কর্মসূচি দ্রুত এগোতে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও সতর্ক থাকার বার্তা দিয়েছে তৃণমূল। পঞ্চায়েত ও পুরসভা স্তরে বিপুল সংখ্যক জনপ্রতিনিধি তৃণমূলের-এটাই নবান্নের ভরসা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রচারের সুরও ঠিক করা হয়েছে-কেন্দ্র টাকা বন্ধ করলেও রাজ্য থামেনি। সরকার নিজের কোষাগার থেকে অর্থ দিয়ে এই কাজ করছে। তৃণমূলের ভাষায়, ‘মোদী নিচ্ছে, দিদি দিচ্ছে।' উল্লেখ্য, গত চার-পাঁচ বছর ধরে যে যে কেন্দ্রীয় প্রকল্পে রাজ্যের বরাদ্দ বন্ধ রয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ গোটা তৃণমূল সরব, তারমধ্যে অন্যতম আবাস যোজনা এবং গ্রামসড়ক যোজনা।ইতিমধ্যেই তাঁর সরকার দেড় দশকে কী কাজ করেছে তার খতিয়ান হিসাবে ‘উন্নয়নের পাঁচালি’ প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই পাঁচালিতে কণ্ঠ দিয়েছেন ইমন চক্রবর্তী। সেই পাঁচালি প্রচারে বক্স বাজিয়ে পড়ায় পড়ায় ঘুরছে তৃণমূলের মহিলা বাহিনী। চাটাই পেতে এক জায়গায় গোল করে মহিলাদের বসিয়ে বসে পাঁচালি শোনানো হচ্ছে। যেখানে সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার।' আর এই প্রচার ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা, তার তদারকি করছে আইপ্যাকের টিম। তৃণমূলের মতো সমান্তরাল বাহিনী নামিয়েছে পরামর্শদাতা সংস্থাও। গ্রামাঞ্চলে গ্রাম পঞ্চায়েত ভিত্তিক প্রচারে নজরদারি চালাচ্ছে তারা। ভোট যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট-এবার উন্নয়নই তৃণমূলের মূল অস্ত্র। আর সেই অস্ত্রের ধার কতটা ভোটবাক্সে ফল দেবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
E-Paper

