'হাইকোর্ট কি যন্তর মন্তর?' আই-প্যাক মামলার শুনানিতে চড়ল রাজনৈতিক পারদ, কী পর্যবেক্ষণ SCর?
বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র বলেন, 'হাইকোর্টে যা যা হয়েছে তা নিয়ে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন।'
আই-প্যাক তদন্ত সংক্রান্ত মামলায় এবার কলকাতা হাইকোর্টের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করল সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত বলেছে, 'হাইকোর্টে যা যা হয়েছে তা নিয়ে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন।' গত ৯ জানুয়ারি অর্থাৎ আইপ্যাক-কাণ্ডের ঠিক পরের দিন কলকাতা হাইকোর্টে ছিল মামলার শুনানি। ইডি ও তৃণমূল- দুই পক্ষের করা মামলার শুনানি হওয়ার কথা ছিল বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের বেঞ্চে। সেদিন কেন হাইকোর্টে শুনানি করা গেল না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে শীর্ষ আদালত।

কলকাতা হাইকোর্টে হট্টগোল
বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র ও বিচারপতি বিপুল পাঁচোলির বেঞ্চে হয় আইপ্যাক তল্লাশি সংক্রান্ত মামলার শুনানি। সেখানেই উঠে আসে কলকাতা হাইকোর্টের প্রসঙ্গে। আদালতে জানানো হয়, সেদিন এজলাসে এত বেশি হট্টগোল হয়েছিল, এত ভিড় ছিল যে শুনানি করা সম্ভব হয়নি। এই পরিস্থিতির কথা শুনেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। রাজ্যের তরফে সিনিয়র আইনজীবী কপিল সিব্বল সওয়াল করেন, 'হাইকোর্ট এই বিষয়টি শুনতে পারে, তাই এই মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে শোনার প্রয়োজন কেন?' তখন বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র বলেন, 'হাইকোর্টে যা যা হয়েছে তা নিয়ে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন।' শুধু তাই নয়, বিচারপতি আরও বলেন, 'হাইকোর্ট কী যন্তর মন্তর?' যন্তর মন্তরের সামনে যেভাবে বিক্ষোভ-ধরনা চলে, কলকাতা হাইকোর্টের সেদিনের পরিস্থিতিকে তার সঙ্গেই তুলনা করা হয় এদিন সুপ্রিম কোর্টে। তবে ওই ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি হবে না বলে সুপ্রিম কোর্টকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন সিব্বল। বুধবারই যে হাইকোর্টে এই মামলার শুনানি হয়েছে, তাও সুপ্রিম কোর্টে জানান তিনি। তাঁর সওয়াল, 'যদি এই আদালত মামলাটি শোনে, তবে ধরে নিতে হবে যে হাই কোর্ট এই মামলা শুনতে অক্ষম। এই ধারণা তৈরি হবে।'
এদিন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, 'সেদিন একজন মন্ত্রী ৫০০ জন সমর্থককে নিয়ে এজলাসে বসেছিলেন। তিনি হই হট্টগোল করতে গিয়েছিলেন?' প্রয়োজনে প্রমাণ হিসেবে হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটের ছবি দেবেন বলেও জানান তুষার মেহতা। কপিল সিব্বলও হাইকোর্টের সেদিনের ঘটনার কথা মেনে নেন। কলকাতা হাইকোর্টের ঘটনা প্রসঙ্গে সিব্বল মন্তব্য নিয়ে বিচারপতি মিশ্র বলেন, 'আমাদের মুখে কোনও কথা বসাবেন না। আমরা এমন কিছু ধরে নিচ্ছি না।' অপর আইনজীবী অভিষেক মনুসিঙ্ঘভিও বলেন, 'কোনও রকম উত্তেজনা বা বিশৃঙ্খলা ছাড়াই, গতকাল ইডি নিজেই শুনানি পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছিল।' তখন বিচারপতি মিশ্র বলেন, 'আজ যা হাইকোর্টে হয়েছে তা কাল অন্য কোনও কোর্টে হতে পারে। এই ঘটনা ঘটা উচিত হয়নি।'
ইডির সওয়াল
অন্যদিকে, এদিন শুনানিতে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতে বলেন, 'এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আগেও যখন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা আইন মেনে কাজ করেছে, তখনই মুখ্যমন্ত্রী নিজে তল্লাশির জায়গায় ঢুকে পড়েছেন। এটা খুবই ভয়ংকর একটা প্যাটার্ন।' ইডির আরও অভিযোগ, আই-প্যাক অফিসে এমন কিছু নথি ছিল যা তদন্তের পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সলিসিটর জেনারেলের বক্তব্য, 'প্রমাণ ছিল যে অপরাধমূলক নথি ওই জায়গায় রয়েছে। স্থানীয় পুলিশকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী ও শীর্ষ পুলিশ কর্তারা বড় বাহিনী নিয়ে গিয়ে সেই নথি অনুমতি ছাড়াই তুলে নেন। এটা চুরির সমান।' ইডি আরও দাবি করে, তল্লাশির সময় এক ইডি অফিসারের মোবাইল ফোনও সাময়িকভাবে নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সলিসিটর জেনারেলের মতে,'এই ধরনের ঘটনা তদন্তকারী অফিসারদের ভয় দেখাবে। তাঁদের মনোবল ভেঙে যাবে। ভবিষ্যতে কেউ নির্ভয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারবে না।' একই সঙ্গে ইডির পক্ষ থেকে আদালতে আবেদন জানানো হয়, অভিযানে বাধা দেওয়ার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারদের সাসপেন্ড করে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হোক। বিচারপতি মিশ্র জানতে চান, আদালত কী সরাসরি সাসপেনশনের নির্দেশ দেবে? উত্তরে সলিসিটর জেনারেল বলেন, 'আদালত শুধু উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিন।' তবে ইডি বারবার দাবি করা সত্ত্বেও রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার বা কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মার বিরুদ্ধে কোনও নির্দেশ এদিন দেয়নি সর্বোচ্চ আদালত।
রাজ্যের বক্তব্য
এরপর রাজ্যের তরফে আইনজীবী কপিল সিব্বল সওয়াল করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন বলেন, ২০২৪-এর ফেব্রুয়ারি মাসে কয়লা কেলেঙ্কারি নিয়ে শেষ পদক্ষেপ করেছে কেন্দ্রীয় সংস্থা। এখন ২০২৬ সালে নির্বাচনের ঠিক আগে হঠাৎ কয়লা কেলেঙ্কারি নিয়ে তদন্ত শুরু হল কেন? তিনি বলেন, '২০২১ সাল থেকে তৃণমূলের জন্য কাজ করছে আই-প্যাক। তাদের কাছে দলের গোপন নথি আছে। নির্বাচনের আগে সেখানে যাওয়ার কী প্রয়োজন ছিল ইডির। ২০২৪ সাল থেকে মামলা ইডির কাছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে যাওয়ার কী দরকার?' সিব্বল আরও জানান, ২০২৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কয়লা দুর্নীতি নিয়ে শেষ বিবৃতি মিলেছিল। তারপর থেকে কী করছিল ইডি, প্রশ্ন তোলেন তিনি। সিব্বল বলেন, 'নির্বাচনের মুখে এত আগ্রহ কেন? আগে তথ্য হাতিয়ে নিলে, নির্বাচনী লড়াই হবে কী করে। দলের চেয়ারপার্সন হিসেবে ওঁর (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) যাওয়ার অধিকার আছে। ভিডিও দেখালেই মিথ্যার পর্দাফাঁস হয়ে যাবে। আমরাও অত্যন্ত বিচলিত। দলের তথ্য যেখানে রয়েছে, দলের পার্টি অফিসের সেই অংশে কেন যাবে ইডি?'
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ
প্রতীক জৈনের ফ্ল্যাট ও আই প্যাক তল্লাশি কাণ্ডে এদিনের মতো শুনানি শেষ হল। প্রথম দিনের শুনানির পর অন্তর্বতী নির্দেশ ঘোষণার সময়ে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে জানিয়ে দিল, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার কাজে রাজ্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপের অভিযোগ শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বৃহত্তর আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিতে গিয়ে বিচারপতিরা এও জানিয়ে দেন, আইনের শাসন বজায় রাখতে এবং প্রতিটি সাংবিধানিক সংস্থাকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়ার স্বার্থেই এই বিষয়টি বিচার করা প্রয়োজন। বিচারপতি জে মিশ্রর কথায়, 'এখনকার দিনে সবাই সব কিছু জানতে পারে। এই মামলা ১০ মিনিট শুনেই রায় ঘোযণা করতে পারতাম। কিন্তু এত সওয়াল জবাব হল যে সুপ্রিম কোর্ট সবটাই রেকর্ডে রাখতে চায়। তারপর চূড়ান্ত একটা নির্দেশ দেওয়া হবে। নইলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আড়ালে অপরাধীদের রক্ষা করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।'
সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর বিচারপতিরা জানান, এই মামলায় কেন্দ্রীয় তদন্তে রাজ্য সংস্থার হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, 'আইনের শাসন বজায় রাখা এবং প্রতিটি সংস্থাকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়ার জন্য এই বিষয়টি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। নচেৎ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আড়ালে অপরাধীদের রক্ষা করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।' বিচারপতিরা আরও বলেন, কেন্দ্রীয় সংস্থার কোনও অধিকার নেই রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী কাজে হস্তক্ষেপ করার। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলেন যদি কোনও কেন্দ্রীয় সংস্থা সৎ উদ্দেশ্যে গুরুতর অপরাধের তদন্ত করে, তবে কি দলীয় কাজের অজুহাতে তাদের কাজ আটকে দেওয়া যায়? এই প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, এই মামলায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নোটিস দেওয়া হবে। দুই সপ্তাহের মধ্যে কাউন্টার হলফনামা জমা দিতে হবে রাজ্য সরকারকে। তাছাড়া ৮ জানুয়ারি যে দুইটি জায়গায় তল্লাশি হয়েছিল, সেখানকার সিসিটিভি ফুটেজ ও স্টোরেজ ডিভাইস সংরক্ষণ করতে হবে। পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত ইডি অফিসারদের বিরুদ্ধে চলতি সমস্ত পুলিশি তদন্ত স্থগিত থাকবে। দেশের শীর্ষ আদালতে মামলার পরবর্তী শুনানি ৩ ফেব্রুয়ারি।
E-Paper

