Oncologist on Lifestyle Cancer: কমবয়সিদেরও লাইফস্টাইল ক্যানসার বাড়ছে, রোখার লড়াই রোজই, কীভাবে? জানালেন বিশেষজ্ঞ
আজ বিশ্ব ক্যানসার দিবস। আর সেই বিশেষ দিনে ভারতের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ক্রমবর্ধমান একটি সমস্যা নিয়ে কথা বললেন ব্রডওয়ে মণিপাল হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। কীভাবে সেই লাইফস্টাইল ক্যানসার নিয়ে মুখ খুললেন?
ক্যানসার শুধু বার্ধক্যের রোগ - এই ধারণা ক্রমশ পালটে যাচ্ছে। সারা ভারতে এখন ৩০ বছর বা ৪০ বছরের কোঠায় থাকা বহু মানুষ এমন সব ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন, যা আগে মূলত বেশি বয়সিদের মধ্যেই দেখা যেত। এই পরিবর্তন কাকতালীয় নয়; এটি আধুনিক জীবনযাত্রা, জীবনযাপনের প্রভাবেরই প্রতিফলন। বিশেষত তরুণ প্রজন্মের ক্ষেত্রে সেই বিষয়টা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্যানসার পর্যবেক্ষক সংস্থার তথ্য বলছে, বর্তমানে শনাক্ত হওয়া ক্যানসারের একটি বড় অংশই পরিবর্তনযোগ্য জীবনধারা ও পরিবেশগত ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত। নগরায়ন, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, বসে কাজ করার প্রবণতা, কম বয়সেই তামাক ও অ্যালকোহলের সংস্পর্শ, স্থূলতা এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ - সবমিলিয়ে ভারতের ক্যানসারের চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
লাইফস্টাইল ক্যানসার কী?
লাইফস্টাইল ক্যানসার বলতে সেই সব ক্যানসারকে বোঝায়, যেখানে দৈনন্দিন অভ্যেস ও পরিবেশগত সংস্পর্শ রোগের ঝুঁকি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জেনেটিক কারণও উপেক্ষা করা যায় না। তবে এই ক্যানসারগুলির বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য বা নিয়ন্ত্রণযোগ্য আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত ।
ভারতে মূলত কী ধরনের লাইফস্টাইল-সম্পর্কিত ক্যানসার হয়?
১) মুখগহ্বর ও মাথা-ঘাড়ের ক্যানসার: ধূমপান, ধোঁয়াবিহীন তামাক, সুপারি ও অ্যালকোহল সেবনের সঙ্গে সরাসরি যোগ আছে মুখগহ্বর ও মাথা-ঘাড়ের ক্যানসার।
২) ফুসফুসের ক্যানসার: ধূমপায়ী ছাড়াও দূষিত বায়ু ও প্যাসিভ স্মোকিংয়ের কারণে নন-স্মোকারদের মধ্যেও বাড়ছে ফুসফুসের ক্যানসারের প্রবণতা।
৩) স্তন ক্যানসার: কমবয়সি মহিলাদের মধ্যে বৃদ্ধি পাচ্ছে স্তন বা ব্রেস্ট ক্যানসার। স্থূলতা, বিপাকীয় সমস্যা, দেরিতে সন্তানধারণ ও কম শারীরিক সক্রিয়তার মতো বিষয়গুলি এই ক্যানসারের সম্ভাব্য কারণ।
৪) কোলোরেক্টাল ক্যানসার: কম ফাইবারযুক্ত খাদ্য, প্রসেসড খাবার, স্থূলতা ও বসে থাকা জীবনযাপনের ফল ।
৫) লিভার ক্যানসার: অ্যালকোহল সেবন, ফ্যাটি লিভার ও বিপাকীয় রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত ।
৬) এন্ডোমেট্রিয়াল ও প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার: স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘমেয়াদি জীবনধারাগত কারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অল্প বয়সে ক্যানসার বাড়ার পিছনে জীবনযাপনের পরিবর্তন
কমবয়সিদের মধ্যে এই ধরনের ক্যানসার যে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা গুরুতর জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ভারতের দ্রুত সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তন দৈনন্দিন জীবনকে আমূল বদলে দিয়েছে। দীর্ঘ কাজ, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, অনিয়মিত খাওয়া-দাওয়া, পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রমের অভাব ও ব্যাহত ঘুমের মতো বিষয়গুলি যেন ‘নিউ নর্ম্যাল’ হয়ে উঠেছে।
তামাক ব্যবহার এখনও ভারতে প্রতিরোধযোগ্য ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ- মুখগহ্বর, ফুসফুস ও খাদ্যনালির ক্যানসারের জন্য দায়ি। তামাকের সঙ্গে অ্যালকোহল যুক্ত হলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। পাশাপাশি, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার ও পরিশোধিত চিনি-নির্ভর খাদ্যাভ্যাস স্থূলতা ও বিপাকীয় রোগ বাড়াচ্ছে - যা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও হরমোনের ভারসাম্যহীনতার মাধ্যমে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় । পরিবেশগত কারণও গুরুত্বপূর্ণ; শহুরে এলাকায় বায়ুদূষণ ও দূষকের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ শ্বাসতন্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে ।
প্রতিরোধযোগ্য বোঝা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অনুমান, নির্দিষ্ট জীবনধারা ও পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করলে প্রায় অর্ধেক ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব । ভারতে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ তরুণদের মধ্যে ক্যানসারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে । তবে কমবয়সীদের মধ্যে ক্যানসার প্রায়ই দেরিতে ধরা পড়ছে—এটি ইঙ্গিত দেয় যে ক্যানসারকে ভবিষ্যতের সমস্যা নয়, বরং বর্তমানের প্রতিরোধযোগ্য সমস্যা হিসেবে দেখার সময় এসেছে।
বিশ্ব ক্যানসার দিবস: প্রতিরোধের দিকে নজর
বিশ্ব ক্যানসার দিবস চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধ ও আগাম শনাক্তকরণের গুরুত্ব তুলে ধরার সুযোগ ।
১) মৌলিক ধাপ: ধূমপান ত্যাগ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ ও পর্যাপ্ত ঘুম ।
২) প্রয়োজনীয় উদ্যোগ: বয়সভিত্তিক স্ক্রিনিং, কর্মক্ষেত্রে ওয়েলনেস প্রোগ্রাম, স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং পরিবেশগত কার্সিনোজেন থেকে সুরক্ষার জন্য সরকারি নীতি অপরিহার্য ।
কমবয়সি ভারতীয়দের মধ্যে লাইফস্টাইল ক্যানসারের বৃদ্ধির প্রবণতা রুখতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, নীতিনির্ধারক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সামনের পথটা কেমন?
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ক্যানসারের বাড়তে থাকা হার একটি সতর্কবার্তা। যা আবার একইসঙ্গে একটি সুযোগও তৈরি করে। ভারত প্রতিক্রিয়াশীল চিকিৎসা মডেল থেকে প্রতিরোধভিত্তিক ব্যবস্থার দিকে এগোতে পারে। এই বিশ্ব ক্যানসার দিবসে বার্তা স্পষ্ট: ক্যানসার প্রতিরোধ হাসপাতাল থেকে নয় - শুরু হয় প্রতিদিনের ছোট-ছোট সিদ্ধান্ত থেকে। ক্যানসার মোকাবিলার ভবিষ্যৎ শুধু উন্নত চিকিৎসায় নয়, বরং এমন এক সমাজ গড়ায় যেখানে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই নিয়ম।
E-Paper











