‘অ্যায় মেরে ওয়াতন কে লোগোঁ’—নেহরুর চোখে জল এনে দিয়েছিল যে গান! জানুন ইতিহাস ও গানের কথা
১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কীভাবে রচিত হয়েছিল এই বিশেষ গান? কেন প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু গানটি শুনে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি?
ভারতের দেশাত্মবোধক গানের ইতিহাসে ‘অ্যায় মেরে ওয়াতন কে লোগোঁ’ (Ae Mere Watan Ke Logo) এক চিরস্মরণীয় ও আবেগঘন স্থান দখল করে রয়েছে। গানটি বাজলেই দেশের প্রতিটি নাগরিকের চোখে ভেসে ওঠে সীমান্ত রক্ষা করতে গিয়ে জীবন দেওয়া বীর জওয়ানদের প্রতিচ্ছবি, বুক ভরে ওঠে দেশপ্রেমে। পণ্ডিত প্রদীপ (Kavi Pradeep)-এর রচিত এবং সি রামচন্দ্রের (C. Ramchandra) সুরারোপিত এই গানটি প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী লতা মঙ্গেশকরের (Lata Mangeshkar) অমর কণ্ঠে এক অতুলনীয় উচ্চতা লাভ করেছিল।

কিন্তু আপনি কি জানেন, এই গানটির জন্ম হয়েছিল এক চরম জাতীয় বিপর্যয় ও শোরগোলের সময়ে? ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কীভাবে রচিত হয়েছিল এই বিশেষ গান? কেন প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু গানটি শুনে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি? এই কালজয়ী গানের পেছনের রোমাঞ্চকর ইতিহাস ও বিশেষ দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো।
১. সৃষ্টির পটভূমি: ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধ
১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধের সময় ভারতের সেনাবাহিনী এক চরম কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। যুদ্ধে ভারতীয় সেনার বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ও বহু বীর জওয়ানের শহিদ হওয়ার ঘটনায় সমগ্র দেশজুড়ে এক গভীর শোকের ছায়া ও নৈরাশ্যের সৃষ্টি হয়েছিল।
সেই জাতীয় সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশবাসী ও সেনাবাহিনীর মনোবল ফিরিয়ে আনতে এবং শহিদদের স্মৃতিকে শ্রদ্ধা জানাতে মুম্বাই চলচ্চিত্র জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সেই উদ্যোগেরই ফসল ছিল এই অবিস্মরণীয় গানটি।
সিগারেটের প্যাকেটের ফয়েল পেপারে প্রথম রচনা: কবি প্রদীপ যখন গানটির কথা ভাবছিলেন, তখন তিনি মুম্বাইয়ের মাহিম সৈকতে হাঁটছিলেন। হঠাৎই তাঁর মনে গানটির লাইনগুলো ভেসে ওঠে। সাথে কোনো কাগজ না থাকায় তিনি এক পথচারীর কাছ থেকে দেশলাই এবং সিগারেটের প্যাকেটের ভেতরের অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল পেপার চেয়ে নিয়ে লিখে ফেলেছিলেন গানের শুরুর সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তিগুলো!
২. গানটির কথা:
কবি প্রদীপের লেখায় ভারতীয় বীর জওয়ানদের সর্বোচ্চ ত্যাগের স্মরণে রচয়িতার সেই অমর অনুভূতি ব্যক্ত হয়েছে:
অ্যায় মেরে ওয়াতান কে লোগোঁ, তুম খুব লাগা লো নারা,
ইয়ে শুভ দিন হ্যায় হাম সব কা, লেহরা লো তেরঙ্গা পেয়ারা।
পর মত ভুলো সীমা পর, বীরোঁ নে হ্যায় প্রাণ গঁবায়ে।
কুছ ইয়াদ উনহেঁ ভি কর লো, কুছ ইয়াদ উনহেঁ ভি কর লো,
জো লউট কে ঘর না আয়ে, জো লউট কে ঘর না আয়ে।
অ্যায় মেরে ওয়াতান কে লোগোঁ, জরা আঁখ মেঁ ভর লো পানি,
জো শহীদ হুয়ে হ্যায় উনকি, জরা ইয়াদ করো কুরবানি।
অ্যায় মেরে ওয়াতান কে লোগোঁ, জরা আঁখ মেঁ ভর লো পানি,
জো শহীদ হুয়ে হ্যায় উনকি, জরা ইয়াদ করো কুরবানি।
তুম ভুল না যাও উনকো, ইসলিয়ে শুনো ইয়ে কাহানি,
জো শহীদ হুয়ে হ্যায় উনকি, জরা ইয়াদ করো কুরবানি।
জব ঘায়েল হুয়া হিমালয়, খতরে মেঁ পড়ী আজাদি,
জব তক থি সাস লড়ে ও,
জব তক থি সাস লড়ে ও, ফির আপনি লাশ বিছা দি।
সঙ্গীন পে ধর কর মাথা, সো গয়ে অমর বলিদানি,
জো শহীদ হুয়ে হ্যায় উনকি, জরা ইয়াদ করো কুরবানি।
জব দেশ মেঁ থি দিওয়ালি, ও খেল রহে থে হোলি,
জব হাম বৈঠে থে ঘরোঁ মেঁ,
জব হাম বৈঠে থে ঘরোঁ মেঁ, ও ঝেল রহে থে গোলি।
থে ধন্য জওয়ান ও আপনে, থি ধন্য ও উনকি জওয়ানি,
জো শহীদ হুয়ে হ্যায় উনকি, জরা ইয়াদ করো কুরবানি।
কোই শিখ কোই জাঠ মারাঠা, কোই শিখ কোই জাঠ মারাঠা।
কোই গুরখা কোই মাদ্রাজি, কোই গুরখা কোই মাদ্রাজি।
সরহদ পর মরনেওয়ালা,
সরহদ পর মরনেওয়ালা, হর বীর থা ভারতবাসী।
জো খুন গিরা পর্বত পর, ও খুন থা হিন্দুস্তানি,
জো শহীদ হুয়ে হ্যায় উনকি, জরা ইয়াদ করো কুরবানি।
থি খুন সে লথপথ কায়া, ফির ভি বন্দুক উঠাকে,
দশ দশ কো এক নে মারা, ফির গির গয়ে হোশ গঁবা কে।
জব অন্ত সময় আয়া তো,
জব অন্ত সময় আয়া তো, কেহ গয়ে কে অব মরতে হ্যায়।
খুশ রহনা দেশ কে প্যায়ারোঁ, খুশ রহনা দেশ কে প্যায়ারোঁ।
অব হাম তো সফর করতে হ্যায়, অব হাম তো সফর করতে হ্যায়।
ক্যায়া লোগ থে ও দিওয়ানে, ক্যায়া লোগ থে ও অভিমানী,
জো শহীদ হুয়ে হ্যায় উনকি, জরা ইয়াদ করো কুরবানি।
তুম ভুল না যাও উনকো, ইসলিয়ে কহি ইয়ে কাহানি,
জো শহীদ হুয়ে হ্যায় উনকি, জরা ইয়াদ করো কুরবানি।
জয় হিন্দ জয় হিন্দ জয় হিন্দ কি সেনা।
জয় হিন্দ জয় হিন্দ জয় হিন্দ,
জয় হিন্দ জয় হিন্দ জয় হিন্দ।
৩. ১৯৬৩ সালের ২৭ জানুয়ারি: দিল্লির ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে ঐতিহাসিক মুহূর্ত
১৯৬৩ সালের ২৭ জানুয়ারি দিল্লির ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে একটি বিশেষ জাতীয় দাতব্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। যেখানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন, প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু, ইন্দিরা গান্ধী এবং চলচ্চিত্র জগতের প্রখ্যাত তারকারা।
লতা মঙ্গেশকরের পরিবেশনা: সি রামচন্দ্রের পরিচালনায় সুরের মেলবন্ধনে যখন লতা মঙ্গেশকর মঞ্চে দাঁড়িয়ে গানটি গাওয়া শুরু করেন, তখন সমগ্র স্টেডিয়াম নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল।
নেহেরুর চোখের জল: গানটি শেষ হওয়ার পর ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। গান শেষে লতা মঙ্গেশকরকে ডেকে তিনি বলেছিলেন—"বেটি, আজ তুমনে মুঝে রুলা দিয়া।" (বাছা, আজ তুমি আমাকে কাঁদিয়ে দিলে)।
৪. লতাজির নাম নির্বাচন ও রয়্যালটির বিশেষ বার্তা
প্রথমে এই গানটির জন্য আশা ভোঁসলের নামও ভাবা হয়েছিল, কিন্তু কবি প্রদীপ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন যে এই গানটি একমাত্র লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠেই সর্বাপেক্ষা নিখুঁতভাবে ফুটে উঠবে। গানটির রেকর্ডিং ও পারফরম্যান্সের পর কবি প্রদীপ সিদ্ধান্ত নেন, এই গান থেকে প্রাপ্ত সমস্ত রয়্যালটি ও আয় ভারতের শহিদ হওয়া জওয়ানদের পরিবার ও আর্মি ওয়েলফেয়ার ফান্ডে দান করা হবে। আজও এই গানের রয়্যালটির অর্থ সেনাকল্যাণে ব্যবহৃত হয়।
‘অ্যায় মেরে ওয়াতন কে লোগোঁ’ কেবল একটি গান নয়, এটি ভারতের সার্বভৌমত্ব, বীর শহিদদের আত্মত্যাগ এবং জাতীয় ঐক্যের এক অনন্য রূপক।
E-Paper

