কখনও বেঁধেছেন নতুন সুর, আবার কখনও কেটেছে তাল, কেমন ছিল আশা ভোঁসলের সুরেলা জীবন সফর?
এমন কিছু কণ্ঠস্বর যা থেকে যায় যুগ যুগ ধরে, আশা ভোঁসলে তেমনই একজন শিল্পী। তিনি চলে গেলেও তাঁর কন্ঠ থেকে যাবে তাঁর ভক্তদের মনে মণিকোঠায়। রবিবার ৯২ বছর বয়সে মুম্বইয়ে প্রয়াত হলেন আশা ভোঁসলে।
এমন কিছু কণ্ঠস্বর যা থেকে যায় যুগ যুগ ধরে, আশা ভোঁসলে তেমনই একজন শিল্পী। তিনি চলে গেলেও তাঁর কন্ঠ থেকে যাবে তাঁর ভক্তদের মনে মণিকোঠায়। রবিবার ৯২ বছর বয়সে মুম্বইয়ে প্রয়াত হলেন আশা ভোঁসলে। তিনি এমন একজন গায়িকা যাঁর কর্মজীবন কয়েক দশক, বিভিন্ন ধারা এবং প্রজন্ম জুড়ে বিস্তৃত ছিল। নতুন প্রজন্মের কাজেও তিনি সমান ভাবে প্রাসঙ্গিক ছিলেন।

১৯৩৩ সালে মহারাষ্ট্রের সাংলিতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার ছিল সঙ্গীতময়। তাঁর বাবা ছিলেন নাট্য অভিনেতা ও শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী দীননাথ মঙ্গেশকর। দিদি কিংবদন্তি গায়িকা লতা মঙ্গেশকর। তাই একেবারে শুরু থেকেই তিনি সঙ্গীতের আবহে বড় হয়েছেন। সঙ্গীতকে সঙ্গী করেই তাঁর জীবন সফর। তবে তিনি ঐতিহ্যের ভার বহন করলেও, নিজের স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করার জন্য দৃঢ় সংকল্প নিয়েছিলেন। তাই তিনি নিজেকে সঙ্গীতের কোনও একটি নির্দিষ্ট ধারায় বেঁধে না রেখে নানা সময় নানা নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করতেন।
১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে সুরকার ওপি নায়ারের সঙ্গে তাঁর যৌথ কাজ হিন্দি সিনেমার কিছু স্বতন্ত্র গানের সৃষ্টি করে। 'আইয়ে মেহেরবান' ( হাওড়া ব্রিজ , ১৯৫০) এবং 'ইয়ে হ্যায় রেশমি জুলফোঁ কা আঁধেরা' ( মেরে সনম , ১৯৬৫)-এর মতো গানগুলো তাঁদের আধুনিকতা এবং স্বতন্ত্র মনোভাবের জন্য খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শ্রোতার মনে জায়গা করে নেয়। প্লেব্যাক গায়কীর কোনও নির্দিষ্ট শৈলীতে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে, তিনি ক্যাবারে গান, লোকসংগীত, রোমান্টিক সুর এবং পরবর্তীকালের গজলও সাবলীল ভাবে উপস্থাপন করেছেন।
তারপর তাঁর জীবনে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায় আর. ডি. বর্মনের এক নতুন সফরে সামিল হন আশা। একসঙ্গে হিট হিট সব গান উপহার দেন। পরবর্তীকালে তাঁকেই বিয়ে করেন। 'তিসরি মঞ্জিল' (১৯৬৬) ছবির 'আজা আজা ম্যায় হুঁ পেয়ার তেরা' ও 'ও হাসিনা জুলফো ওয়ালি' , ' উমরাও জান ' (১৯৮১) ছবির ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’, 'ইজাজত' (১৯৮৭) ছবির 'মেরা কুছ সামান'- এর মতো গানগুলি কেবল আশার বহুমুখী প্রতিভার ফলই নয়, বরং তাঁর আবেগী মনের সূক্ষ্মতাও দিকটিও সকলে সামনে এনেছিল।
তাঁকে প্রায়ই বলতেন যে তিনি তাঁর কর্মজীবনে পরিকল্পনা করে কিছু করেননি। কেবল যা পেয়েছেন তাই গেয়েছেন, যা তাঁর বিনয় ও সহজাত প্রবৃত্তি পরিচয় দেয়। তাঁর কাছে গান ছিল একটি অনুশাসন, কোনও ঐতিহ্য নয়।
গানের ব্যাপ্তি যাই হোক না কেন, তিনি তা আন্তরিকতায় পূর্ণ করে দিতেই। আর তাই বুঝি তাঁর প্রাণের সুর শ্রোতাদের মনকেও ছুঁয়ে যেত। তাঁর ম্যাজিকাল ভয়েস উচ্ছ্বাস জাগাতো তাঁর ভক্তদের মনে। তিনি একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, বেঁচে থাকার জন্য তিনি সব ধরনের গান গেয়েছেন এবং পথ চলতে চলতে একসময় সেগুলোর মধ্যেই নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন।
সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে আশা ভোঁসলে একাধিক ভাষায় হাজার হাজার গান রেকর্ড করেছেন। হিন্দি সিনেমার গণ্ডি পেরিয়ে আঞ্চলিক বহু ভাষাতেই গান গেয়েছেন। তাঁর বাংলা গানের সম্ভারও ব্যাপক। 'তোমারই চলা পথে', ‘মন বলছে কেউ আসবে’, ‘এ মন আমার হারিয়ে যায় কোনখানে’, 'কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে', আকাশের চাঁদ মাটির বুকেতে', 'এমন মধুর সন্ধ্যায়', 'কথা দিলাম' এই সব গান আজও বাঙালিদের মনের আরাম। এখনও নানা পুজো প্যান্ডেলে এই সব গান বাজতে শোনা যায়।
তাঁর প্রাপ্ত পুরস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার এবং ২০০৮ সালে পদ্মবিভূষণ পেয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে তিনি উদীয়মান গায়কদের উৎসাহিত করার জন্য প্রতিযোগিতামূলক পুরস্কার থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। ভারতীয় সঙ্গীতের স্মৃতিতে তাঁর কণ্ঠস্বর গেঁথে আছে। তাই তিনি মৃত্যুর চেয়েরও বড়। তিনি প্রয়ানের পর বেঁচে থাকবেন তাঁর অনুরাগীদের মননে।
E-Paper

