দিল্লির বুকে মেঘালয় আনারস উৎসবের ধামাকা! ইকমার্স চুক্তি থেকে দুবাইয়ে রফতানি—বাণিজ্যিক বিপ্লবে মেঘালয়ের কৃষকের
Meghalaya Pineapple Festival: এই উৎসবের উদ্বোধন করেন কেন্দ্রীয় উত্তর-পূর্বাঞ্চল উন্নয়ন (DoNER) ও যোগাযোগ মন্ত্রী শ্রী জ্যোতিরাদিত্য এম সিন্ধিয়া। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মেঘালয়ের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শ্রী কনরাড কে সাংমা এবং সরকারের উচ্চপদস্থ আমলারা।
দিল্লির বুকে মেঘালয়ের সুমিষ্ট আনারসের জয়জয়কার! সম্প্রতি মেঘালয় সরকারের কৃষি ও কৃষক কল্যাণ দপ্তরের উদ্যোগে দেশের রাজধানী দিল্লির ‘দিল্লি হাট’-এ মহাসমারোহে শুরু হয়েছে ‘৪র্থ মেঘালয় আনারস উৎসব ২০২৬’ (4th Meghalaya Pineapple Festival)। বিগত ১০ জুলাই ২০২৬ তারিখে তিন দিনব্যাপী (১০-১২ জুলাই) এই মেগা উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। তবে এটি কেবল একটি ফলের উৎসব নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে মেঘালয়ের কৃষি খাতের আমূল পরিবর্তন, ই-কমার্স জায়ান্ট ফ্লিপকার্ট (Flipkart)-এর সাথে ঐতিহাসিক চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় আনারসের এক অভাবনীয় সাফল্যের গল্প।

মেঘালয়ের পাহাড়ি উপত্যকায় উৎপাদিত আনারস তার অনন্য সুগন্ধ, কম অম্লতা (Low Acidity) এবং চরম মিষ্টি স্বাদের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। এই আনারসের ব্রিক্স ভ্যালু (Brix Value) হলো ১৬-১৮, যা জাতীয় গড় মিষ্টির তুলনায় অনেকটাই বেশি। রি ভোই, গারো হিলস, খাসি হিলস এবং জয়ন্তীয়া হিলসের বৃষ্টিস্নাত উপত্যকায় চাষ করা এই আনারস আজ মেঘালয়ের হাজার হাজার কৃষক পরিবারের জীবিকার মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
হাই-প্রোফাইল উদ্বোধন ও ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর
এই উৎসবের উদ্বোধন করেন কেন্দ্রীয় উত্তর-পূর্বাঞ্চল উন্নয়ন (DoNER) ও যোগাযোগ মন্ত্রী শ্রী জ্যোতিরাদিত্য এম সিন্ধিয়া। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মেঘালয়ের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শ্রী কনরাড কে সাংমা এবং সরকারের উচ্চপদস্থ আমলারা।
উৎসবের উদ্বোধনী মঞ্চেই মেঘালয় সরকার দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করে—একটি ই-কমার্স জায়ান্ট ফ্লিপকার্ট (Flipkart) এবং অন্যটি ন্যাশনাল ই-মার্কেট সার্ভিসেস লিমিটেড (NeML)-এর সাথে। এই চুক্তির ফলে মেঘালয়ের আনারস চাষিরা এখন সরাসরি ভারতের বড় বড় সংগঠিত খুচরা বিক্রেতা, প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতা এবং ডিজিটাল মার্কেটের সাথে যুক্ত হতে পারবেন।

মোদী থেকে নির্মলা সীতারামনের হাত ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে
মেঘালয়ের আনারস এখন আর শুধু ভারতের বাজারে সীমাবদ্ধ নেই, এটি পৌঁছে গেছে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বিশ্ব বাজারেও।
- প্রধানমন্ত্রীর উপহার: ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) সফরের সময় মেঘালয়ের এই প্রিমিয়াম কোয়ালিটির আনারস সেদেশের রাষ্ট্রপতিকে উপহার হিসেবে প্রদান করেছিলেন, যা আন্তর্জাতিক স্তরে মেঘালয়ের কৃষি ঐতিহ্যের এক মস্ত বড় স্বীকৃতি।
- দুবাইয়ে রফতানি: ২০২৬ সালের জুন মাসেই ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রী শ্রীমতী নির্মলা সীতারামন মেঘালয়ের ২ মেট্রিক টন আনারসের একটি বড় চালান দুবাইয়ের বিখ্যাত ‘লুলু রিটেল’ (Lulu Retail)-এর উদ্দেশ্যে ফ্ল্যাগ অফ বা রওনা করে দেন। মেঘালয় স্টেট অ্যাগ্রিকালচারাল মার্কেটিং বোর্ডের (MSAMB) মাধ্যমে ইতিমধ্যেই ১০০ মেট্রিক টনেরও বেশি আনারস দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা হয়েছে।
নারী শক্তি ও জিরং এফপিসি (Jirang FPC)-র রূপকথা
এই কৃষি বিপ্লবের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হলো নারী ক্ষমতায়ন। মেঘালয়ের ‘জিরং অর্গানিক অ্যাগ্রো ফার্মার প্রডিউসার কোম্পানি’ (Jirang FPC) এর অন্যতম বড় উদাহরণ। এই সংস্থায় বর্তমানে ১৮টি গ্রামের ৪৩৩ জন কৃষক যুক্ত আছেন, যার মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশই নারী। লুলু গ্রুপ, রিলায়েন্স রিটেল, সফল-মাদার ডেয়ারি এবং ব্লিনকিট (Blinkit)-এর মতো বড় সংস্থার সাথে সরাসরি যুক্ত হয়ে এই কোম্পানির বার্ষিক রাজস্ব ২০১৭-২১ সালের মাত্র ১.৫ লক্ষ টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ১.১৭ কোটি টাকায় গিয়ে পৌঁছেছে।
ভ্যালু অ্যাডিশন বা প্রক্রিয়াকরণে আয়ের বিপুল বৃদ্ধি
মেঘালয় সরকার কৃষকদের আয় বাড়াতে ‘ভ্যালু অ্যাডিশন’ বা প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। যেখানে সাধারণ বাজারে কাঁচা আনারস প্রতি কেজি ২২ টাকায় বিক্রি হয়, সেখানে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে এর মূল্য আকাশছোঁয়া করা সম্ভব হয়েছে:
- ফ্রোজেন কিউবস ও চুরাস্কো: রপ্তানিযোগ্য হিমায়িত আনারসের কিউব (Frozen Cubes) এবং রান্না করা চুরাস্কো আনারসের মাধ্যমে মূল্য যথাক্রমে প্রায় ৭০কিলো থেকে ৭০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।
- ফ্রিজ-ড্রাইড আনারস: আগামী দিনে বাজারে আসতে চলা ফ্রিজ-ড্রাইড (Freeze-dried) ভ্যারিয়েন্টের মাধ্যমে প্রতি কেজি আনারসের মূল্য ১,৫০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব, যা আসল মূল্যের তুলনায় প্রায় ৭০ গুণ বেশি! এই আধুনিক প্রক্রিয়াকরণের ফলে কৃষকদের ব্যক্তিগত আয় প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

সংস্কৃতি ও কৃষির মেলবন্ধন
দিল্লি হাটের এই উৎসবে কেবল আনারসের ব্যবসাই হচ্ছে না, বরং মুখ্যমন্ত্রীর ‘মেঘালয় গ্রাসরুটস মিউজিক প্রোগ্রাম’ (MGMP)-এর অধীনে মেঘালয়ের লোকসঙ্গীত ও সংস্কৃতির এক লাইভ পারফরম্যান্স প্রদর্শন করা হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে কীভাবে কৃষি, পর্যটন ও সংস্কৃতিকে এক সুতোয় বেঁধে টেকসই উন্নয়ন করা সম্ভব।
২০২৩ সালে শুরু হওয়া এই আনারস উৎসব মাত্র ৪টি সংস্করণের মধ্যেই ভারতের অন্যতম সফল অ্যাগ্রিকালচারাল ব্র্যান্ডিং প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। প্রথম বছরে দিল্লিতে যেখানে মাত্র ৭.৭ মেট্রিক টন আনারস আনা হয়েছিল, ২০২৫ সালে তা দ্বিগুণ হয়ে ১৫ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে গেছে। মেঘালয়ের এই মডেলটি প্রমাণ করে যে সঠিক দূরদর্শিতা ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের সুযোগ পেলে ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকেরাও বিশ্ব জয় করতে পারেন।
E-Paper

