মিষ্টি বা চিনি বেশি খেলে কি টাক পড়ার আশঙ্কা বাড়ে? কী বলছে বিজ্ঞান
সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক আন্তর্জাতিক চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ (Dermatologists) এবং পুষ্টিবিদদের গবেষণায় উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। অতিরিক্ত মিষ্টি বা চিনি জাতীয় খাবার খাওয়ার সাথে দ্রুত চুল পড়া এবং মাথার স্ক্যাল্প খালি হয়ে টাক পড়ার গভীর পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে।
রসগোল্লা, সন্দেশ, চকোলেট, কোল্ড ড্রিন্কস কিংবা প্রতিদিনের কাপ ভর্তি চিনি দেওয়া চা—মিষ্টিজাতীয় খাবার খেতে পছন্দ করেন না, এমন মানুষ খুব কমই আছেন। মিষ্টি বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার কেবল ওজন বৃদ্ধি বা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায় না, বরং এটি মানবদেহের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। তবে আপনি কি জানেন, অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার এই জনপ্রিয় অভ্যাসটি আপনার মাথার চুল পাকা ও চিরতরে টাক পড়ার অন্যতম গোপন কারণ হতে পারে?

সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক আন্তর্জাতিক চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ (Dermatologists) এবং পুষ্টিবিদদের গবেষণায় উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। অতিরিক্ত মিষ্টি বা চিনি জাতীয় খাবার খাওয়ার সাথে দ্রুত চুল পড়া এবং মাথার স্ক্যাল্প খালি হয়ে টাক পড়ার গভীর পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে। চিনি কীভাবে মাথার চুলের ক্ষতি করে এবং টাক পড়ার হার বাড়িয়ে দেয়, তা নিয়ে একটি বিস্তারিত বিজ্ঞানভিত্তিক স্বাস্থ্য প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।
১. অতিরিক্ত চিনি বা মিষ্টি খাওয়ার সাথে টাক পড়ার গভীর জৈবিক সম্পর্ক
ক) 'গ্লাইকেশন' প্রক্রিয়া এবং এনজাইম নষ্ট হওয়া (Advanced Glycation End-products):
আমরা যখন অতিরিক্ত চিনি বা মিষ্টি খাই, তখন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা একধাক্কায় অনেকটা বেড়ে যায়। এই অতিরিক্ত গ্লুকোজ শরীরের প্রোটিনের (যেমন—কেরাটিন ও কোলাজেন) সাথে যুক্ত হয়ে এক ধরণের ক্ষতিকর যৌগ তৈরি করে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘গ্লাইকেশন’ (Glycation) বলা হয়। চুল তৈরি হয় মূলত ‘কেরাটিন’ নামক প্রোটিন দিয়ে। গ্লাইকেশনের ফলে চুলের এই কেরাটিন প্রোটিন শক্ত ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে, যার ফলে চুলের গোড়া দুর্বল হয়ে দ্রুত চুল ঝরে পড়ে।
খ) ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও পুরুষ হরমোনের দাপট (DHT Production):
অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার ফলে রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা অনবরত বেশি থাকে, যা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে শরীরে ‘ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স’ (Insulin Resistance) তৈরি হয়। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ফলে পুরুষ ও নারীদের শরীরে ডাইহাইড্রোটোস্টোস্টেরন বা ‘ডিএইচটি’ (DHT - Dihydrotestosterone) নামক হরমোনের প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যায়। এই ডিএইচটি হরমোন মাথার চুলের ফোলিকল বা লোমকূপগুলোকে সংকুচিত করে দেয়, যার ফলে চুল ধীরে ধীরে পাতলা হতে হতে একসময় সেই জায়গা সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে পুরুষ ও মহিলাদের মাথায় স্থায়ী টাক পড়া (Androgenetic Alopecia) শুরু হয়।
গ) স্ক্যাল্পে রক্ত সঞ্চালন হ্রাস ও প্রদাহ (Scalp Inflammation):
অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার খেলে রক্তনালীগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং শরীরের ভেতরে এক ধরণের নীরব প্রদাহ বা ইনফ্লেমেশনের সৃষ্টি হয়। এর ফলে মাথার ত্বকে বা স্ক্যাল্পে রক্ত সঞ্চালন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। রক্ত সঞ্চালন কমে গেলে চুলের গোড়ায় প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টি উপাদান পৌঁছাতে পারে না, যার ফলে চুল পুষ্টিহীনতায় ভুগে অকালেই ঝরে যায়।
ঘ) স্ক্যাল্পে ফাঙ্গাস ও খুশকির তাণ্ডব:
মিষ্টি বা চিনিযুক্ত খাবার শরীরে ইস্ট (Yeast) এবং 'ম্যালাসেসিয়া' নামক ফাঙ্গাসের প্রিয় খাদ্য। অতিরিক্ত মিষ্টি খেলে স্ক্যাল্পের সেবাম বা তেল নিঃসরণ বাড়ে এবং সেখানে ক্ষতিকর ফাঙ্গাসের বংশবৃদ্ধি ঘটে। এর ফলে মাথায় তীব্র খুশকি, চুলকানি ও সেবোরিক ডার্মাটাইটিস দেখা দেয়, যা চুল পড়ার গতিকে ত্বরান্বিত করে।
২. চুল পড়া ও টাক পড়ার হাত থেকে বাঁচতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
- রিফাইন্ড সুগার পুরোপুরি বর্জন: সাদা চিনি, কোল্ড ড্রিংকস, প্রসেসড ফাস্টফুড, পেস্ট্রি ও অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস বদলে ফেলুন।
- প্রাকৃতিক মিষ্টির বিকল্প বেছে নেওয়া: চিনির বদলে সীমিত পরিমাণে গুড়, মধু বা প্রাকৃতিক তাজা ফলমূল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- প্রোটিন ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার: খাদ্যতালিকায় প্রোটিন (ডিম, মাছ, ডাল, বাদাম) এবং ভিটামিন সি ও ই সমৃদ্ধ শাকসবজি রাখুন, যা চুলের গোড়া মজবুত রাখতে সাহায্য করে।
চুল আমাদের বাহ্যিক সৌন্দর্যের অন্যতম প্রধান অঙ্গ। অহেতুক মিষ্টি ও অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার লোভ সামলাতে না পারলে কেবল ওজন বা সুগারই বাড়বে না, বরং মাথার চুল হারিয়ে অকালেই বার্ধক্য নেমে আসতে পারে। তাই সুন্দর ও ঘন চুল বজায় রাখতে আজই অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করুন।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


