কম ঘুমোচ্ছেন আর ওজন বাড়ছে? অনিদ্রা ও মেদ বৃদ্ধির মধ্যে রয়েছে অদৃশ্য ও ভয়ঙ্কর সম্পর্ক
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও স্থূলতা বিষয়ক পুষ্টিবিদদের (Obesity Experts) মতে, ঘুমের অভাবের সাথে শরীরের মেদ বৃদ্ধির সরাসরি জৈবিক ও হরমোনজনিত গভীর যোগাযোগ রয়েছে।
ওজন কমানোর কথা উঠলেই আমরা সাধারণত খাদ্যাভ্যাস বা ডায়েট কন্ট্রোল এবং কঠোর শারীরিক ব্যায়ামের ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দিই। কিন্তু প্রতিদিন প্রচুর কায়িক পরিশ্রম ও মেপে মেপে খাওয়া সত্ত্বেও অনেকেরই কাঙ্ক্ষিত ওজন কমে না, বরং পেটের চর্বি বা মেদ দিন দিন বাড়তেই থাকে। এর আসল কারণ লুকিয়ে থাকতে পারে আপনার রোজকারের বিছানায়! রাত জেগে ফোন ঘাঁটা, কাজের মানসিক চাপ কিংবা অনিদ্রার কারণে যদি প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হয়, তবে অজান্তেই কিন্তু শরীরের ওজন দ্রুত বাড়তে শুরু করে।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও স্থূলতা বিষয়ক পুষ্টিবিদদের (Obesity Experts) মতে, ঘুমের অভাবের সাথে শরীরের মেদ বৃদ্ধির সরাসরি জৈবিক ও হরমোনজনিত গভীর যোগাযোগ রয়েছে। পর্যাপ্ত না ঘুমালে কীভাবে ওজন বৃদ্ধি পায় এবং এই চক্র থেকে বাঁচার উপায় কী, তার একটি বিস্তৃত পুষ্টি ও স্বাস্থ্য প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।
১. ঘুমের অভাবে যেভাবে হু হু করে ওজন বাড়ে
ক) 'ঘে্রলিন' ও 'লেপটিন' হরমোনের ভারসাম্যহীনতা:
আমাদের শরীরে ক্ষুধা ও তৃপ্তির অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে মূলত দুটি হরমোন—‘ঘে্রলিন’ (Ghrelin) এবং ‘লেপটিন’ (Leptin)। ঘে্রলিন ব্রেনকে খাওয়ার সংকেত দেয় বা ক্ষুধা বাড়ায়, আর লেপটিন পেট ভরে যাওয়ার বার্তা দেয়। রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরে ঘে্রলিন হরমোনের ক্ষরণ মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যায় এবং লেপটিনের মাত্রা মারাত্মকভাবে কমে যায়। ফলে ঘুম থেকে ওঠার পর সারা দিন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষুধা অনুভুত হয় এবং মানুষ না চাইতেও বারবার খাবার খেতে বাধ্য হয়।
খ) উচ্চ ক্যালরি ও মিষ্টি খাবারের প্রতি তীব্র আকর্ষণ (Junk Food Cravings):
পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে শরীর তাৎক্ষণিক শক্তির খোঁজে বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবার, প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকস, মিষ্টি, কোল্ড ড্রিংকস এবং চর্বিজাতীয় ফাস্টফুড খাওয়ার তীব্র তাগিদ অনুভব করে। রাত জাগার কারণে অনেকেই মাঝরাতে প্রসেসড স্ন্যাকস বা ‘লেট-নাইট বিঞ্জিং’ (Late-night Binging)-এ অভ্যস্ত হয়ে পড়েন, যা সোজা মেদে পরিণত হয়।
গ) মেটাবলিজম বা হজম প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যাওয়া:
ঘুম হলো শরীরের মেরামত ও মেটাবলিজম সচল রাখার প্রাকৃতিক সময়। রাত জেগে থাকলে বা কম ঘুমালে শরীরের মেটাবলিক রেট বা বিপাক হার লক্ষণীয়ভাবে কমে যায়। এর ফলে শরীর খাবার থেকে পাওয়া ক্যালরিকে শক্তিতে রূপান্তরিত না করে চর্বি বা ফ্যাট হিসেবে জমা করতে শুরু করে, বিশেষ করে পেটের অংশে চর্বি জমতে থাকে।
ঘ) 'কর্টিসল' হরমোন বৃদ্ধি ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স:
ঘুমের অভাব শরীরকে এক ধরণের মানসিক ও শারীরিক চাপের মুখে ঠেলে দেয়। ফলে শরীরে ‘কর্টিসল’ (Cortisol) নামক স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণ বাড়ে। শরীরে অতিরিক্ত কর্টিসল জমা হলে তা ইনসুলিনের কার্যক্ষমতা ব্যাহত করে (Insulin Resistance), যার ফলে রক্তে চিনির মাত্রা বাড়ে এবং শরীর অতিরিক্ত ফ্যাট ধরে রাখতে বাধ্য হয়।
ঙ) ক্লান্তি ও শারীরিক কায়িক পরিশ্রমের অভাব:
রাতে ঘুম ঠিকমতো না হলে সারাদিন শরীরে অলসতা, ক্লান্তি ও অনিচ্ছা চেপে বসে। ফলে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় হাঁটাচলা, ব্যায়াম বা শরীরচর্চা করার মতো শক্তি ও উৎসাহ শরীর পায় না। ফলে খরচ না হওয়া ক্যালরি জমা হয়ে দ্রুত ওজন বাড়িয়ে দেয়।
২. ওজন নিয়ন্ত্রণে রেখে ভালো ঘুমের জন্য কিছু জরুরি পরামর্শ
- নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস: প্রতিদিন রাতে অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করুন এবং ছুটির দিনসহ প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যান ও ঘুম থেকে উঠুন।
- ঘুমানোর ১ ঘণ্টা আগে স্ক্রিন অফ করা: ঘুমানোর অন্তত ১ ঘণ্টা আগে মোবাইল, ল্যাপটপ বা টিভির নীল আলো (Blue Light) থেকে দূরে থাকুন। স্ক্রিনের আলো মস্তিষ্কের মেলাটোনিন হরমোন উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করে ঘুম তাড়িয়ে দেয়।
- রাতে ভারী খাবার ও ক্যাফেইন এড়ানো: সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত চা, কফি বা অ্যালকোহল পান এড়িয়ে চলুন এবং রাতে ঘুমানোর অন্তত ২-৩ ঘণ্টা আগে হালকা ও সহজপাচ্য রাতের খাবার খেয়ে ফেলুন।
ওজন কমানোর সমীকরণে সুষম খাদ্য ও ব্যায়ামের মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিদিনের পর্যাপ্ত ঘুম। সুস্থ থাকতে ও অতিরিক্ত মেদ ঝরাতে তাই আজ থেকেই রাত জাগার কুঅভ্যাস বদলে সুনিদ্রাকে প্রাধান্য দিন।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


