প্যান্টের পিছনের পকেটে মানিব্যাগ রাখেন? অজান্তেই ডেকে আনছেন পক্ষাঘাত ও মেরুদণ্ডের মারাত্মক বিপদ
অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞ (Orthopedics) ও স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞদের (Neurologists) মতে, প্যান্টের পিছনের পকেটে মোটা মানিব্যাগ রেখে বসার এই ভুল অভ্যাসটি মানবদেহের মেরুদণ্ড, কোমর এবং পায়ের স্নায়ুর অপূরণীয় ক্ষতি করে।
প্রতিদিনের দৌড়ঝাঁপ ও ব্যস্ততম জীবনে পুরুষদের ফ্যাশন ও অভ্যাসের অন্যতম অঙ্গ হলো প্যান্টের পিছনের পকেটে মোটা মানিব্যাগ রাখা। টাকা-পয়সা, এটিএম কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং নানা ধরণের দরকারি নথিতে ঠাসা সেই মানিব্যাগ পকেটে রেখেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অফিসে বসে কাজ করা, বাইক চালানো কিংবা চাকাওয়ালা চেয়ারে বসে থাকা অনেকেরই নিত্যদিনের অভ্যাস। আপাতদৃষ্টিতে এই অভ্যাসকে খুব স্বাভাবিক ও সুবিধাজনক মনে হলেও, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান কিন্তু একে অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞ (Orthopedics) ও স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞদের (Neurologists) মতে, প্যান্টের পিছনের পকেটে মোটা মানিব্যাগ রেখে বসার এই ভুল অভ্যাসটি মানবদেহের মেরুদণ্ড, কোমর এবং পায়ের স্নায়ুর অপূরণীয় ক্ষতি করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই বিশেষ শারীরিক সমস্যাটিকে বলা হয় ‘ওয়ালেট নিউরোপ্যাথি’ (Wallet Neuropathy) বা ‘পীরিফর্মিস সিন্ড্রোম’ (Piriformis Syndrome)। এই ক্ষতিকর অভ্যাসের ফলে শরীরে কী কী মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে একটি বিস্তারিত স্বাস্থ্য প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।
১. পেছনের পকেটে মানিব্যাগ রাখার প্রধান শারীরিক ঝুঁকি ও জটিলতা
ক) মেরুদণ্ডের সামঞ্জস্য নষ্ট ও পেষণ (Spinal Misalignment):
যখন একজন ব্যক্তি প্যান্টের পিছনের পকেটে মোটা মানিব্যাগ রেখে কোনো সমতল চেয়ার বা আসনে বসেন, তখন তাঁর নিতম্বের (Pelvis) একপাশ অন্যপাশের চেয়ে কিছুটা উঁচুতে অবস্থান করে। এর ফলে শরীরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে মেরুদণ্ড অস্বাভাবিকভাবে বেঁকে যায়। দিনের পর দিন টানা এভাবে বসার ফলে মেরুদণ্ডের হাড় ও ডিক্সের ওপর অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে স্থায়ী ‘স্কোলিওসিস’ (Scoliosis) বা মেরুদণ্ড বাঁকা হয়ে যাওয়ার সমস্যা তৈরি করে।
খ) সাইয়াটিক স্নায়ুতে তীব্র চাপ ও সাইয়াটিকা (Sciatica):
আমাদের মানবদেহের সবচেয়ে দীর্ঘ ও মোটা স্নায়ুটি হলো ‘সাইয়াটিক নার্ভ’ (Sciatic Nerve), যা কোমর থেকে শুরু হয়ে নিতম্বের ভেতর দিয়ে দুই পায়ের পাতা পর্যন্ত বিস্তৃত। পিছনের পকেটে মানিব্যাগ রেখে বসলে সেই শক্ত মানিব্যাগটি সরাসরি সাইয়াটিক নার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে কোমর থেকে শুরু করে উরু, হাঁটু এবং পায়ের পাতা পর্যন্ত তীব্র ব্যথা, ঝিনঝিন করা বা পা অবশ হয়ে যাওয়ার মতো মারাত্মক সমস্যা দেখা দেয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘সাইয়াটিকা’ বলা হয়।
গ) পিরিফর্মিস সিন্ড্রোম (Piriformis Syndrome):
নিতম্বের গভীরে অবস্থিত একটি ছোট পেশী হলো ‘পীরিফর্মিস’। মানিব্যাগের অনবরত চাপে এই পেশীটি শক্ত হয়ে সংকুচিত হয়ে যায় এবং প্রদাহের সৃষ্টি করে। যেহেতু সাইয়াটিক নার্ভটি এই পেশীর ঠিক নিচ দিয়েই প্রবাহিত হয়, তাই পীরিফর্মিস পেশীর এই প্রদাহ সরাসরি নার্ভকে চেপে ধরে। এর ফলে হাঁটাচলা করতে বা সোজা হয়ে দাঁড়াতে তীব্র যন্ত্রণার মুখোমুখি হতে হয়।
ঘ) দীর্ঘস্থায়ী কোমর ও পিঠের ব্যথা (Chronic Lower Back Pain):
বসার সময় নিতম্ব অসম অবস্থায় থাকার কারণে শরীরের নিম্নাংশের সমস্ত পেশী (Lower Back Muscles) অতিরিক্ত প্রসারিত হতে বাধ্য হয়। এর ফলে কোমরের পেশীগুলো স্থায়ীভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং প্রতিদিন কাজ শেষে বা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পর কোমরে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণা অনুভূত হয়।
২. এই বিপদ থেকে মুক্ত থাকার সহজ ও কার্যকরী উপায়
- সামনের পকেটে মানিব্যাগ রাখা: প্যান্টের পিছনের পকেটের পরিবর্তে মানিব্যাগ সর্বদা সামনের পকেটে বা জ্যাকেটের ভেতরের পকেটে রাখার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- স্লিম ওয়ালেট বা কার্ড হোল্ডার ব্যবহার: অপ্রয়োজনীয় কাগজ বা ক্যাশ টাকা জমিয়ে মানিব্যাগ মোটা না করে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় ২-১টি কার্ড ও কম টাকা রাখার মতো স্লিম ওয়ালেট ব্যবহার করুন।
- বসার আগে মানিব্যাগ বের করা: যদি পিছনের পকেটে মানিব্যাগ রাখতেই হয়, তবে টেবিলে বা চেয়ারে বসার আগে অবশ্যই পকেট থেকে মানিব্যাগটি বের করে টেবিলে রাখুন।
- ব্যাগ বা ব্যাকপ্যাক ব্যবহার: প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও মানিব্যাগ বহনের জন্য ছোট সাইড ব্যাগ বা ব্যাকপ্যাক ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ ও আধুনিক বিকল্প।
সামান্য অসচেতনতা বা অলসতার কারণে নিজেদের শরীরের এমন বড় ক্ষতি করা একেবারেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আজই পিছনের পকেটে মোটা মানিব্যাগ রাখার বিপজ্জনক অভ্যাস ত্যাগ করুন এবং সুস্থ ও যন্ত্রণামুক্ত জীবনযাপন নিশ্চিত করুন।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


