দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে কাজ করা কি ধূমপানের চেয়েও মারাত্মক? জানুন আসল সত্য ও বৈজ্ঞানিক তথ্য
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশ দাবি করছেন— ‘Sitting is the new smoking’ অর্থাৎ দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় টানা বসে থাকার ক্ষতিকর প্রভাব ধূমপানের অভ্যাসকেও ছাপিয়ে যেতে পারে!
আধুনিক কর্পোরেট সংস্কৃতি ও কম্পিউটারনির্ভর জীবনযাত্রায় আমাদের দিনের সিংহভাগ সময় কাটে চেয়ারে বসে। সকালে অফিসের ল্যাপটপ অন করা থেকে শুরু করে টানা ৮-১০ ঘণ্টা ডেস্কে বসে কাজ করা—অনেকেরই নিয়মিত অভ্যাস। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) একাধিক গবেষণায় এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশ দাবি করছেন—"Sitting is the new smoking" অর্থাৎ দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় টানা বসে থাকার ক্ষতিকর প্রভাব ধূমপানের অভ্যাসকেও ছাপিয়ে যেতে পারে!

কিন্তু এই দাবিটি কতটা যৌক্তিক এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়টি কতটা সত্য? দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করার মারাত্মক শারীরিক প্রভাব এবং ধূমপানের সাথে এর তুলনামূলক বিশ্লেষণ নিয়ে একটি বিস্তারিত স্বাস্থ্য প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।
১. 'সিটিং ডিজিজ' বা দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করার প্রধান শারীরিক ঝুঁকি
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় দীর্ঘ সময় অলস বা স্থবির হয়ে বসে থাকার কুফলকে বলা হয় ‘সিটিং ডিজিজ’ (Sitting Disease)। টানা বসে থাকলে শরীরে যে যে মারাত্মক সমস্যা দেখা দেয়:
ক) মেটাবলিজম ও ফ্যাট বার্নিং ধীর হয়ে যাওয়া:
চেয়ারে বসার কয়েক মিনিটের মধ্যেই পায়ের বড় বড় পেশীর তড়িৎ সচলতা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে শরীরের ক্যালরি খরচের হার প্রতি মিনিটে মাত্র ১ ক্যালরিতে নেমে আসে এবং ফ্যাট ভাঙার উৎসেচক (Lipase) প্রায় ৯০ শতাংশ কমে যায়। এর ফলে দ্রুত মেদ বাড়ে ও মেদ ভুড়ি দেখা দেয়।
খ) হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি:
দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে রক্ত সঞ্চালন ধীর হয়ে যায় এবং রক্তনালীতে চর্বি জমার সুযোগ পায়। গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা দিনে ৮ ঘণ্টার বেশি বসে থাকেন, তাঁদের হৃদরোগে (Heart Attack) আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে দ্বিগুণ।
গ) টাইপ-২ ডায়াবেটিসের আশঙ্কা:
অবিরাম বসে থাকার ফলে কোষের ইনসুলিন সংবেদনশীলতা (Insulin Sensitivity) আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। এর ফলে অগ্ন্যাশয় বেশি ইনসুলিন তৈরি করতে বাধ্য হয়, যা দ্রুত টাইপ-২ ডায়াবেটিসে পরিণত হয়।
ঘ) মেরুদণ্ড, ঘাড় ও কোমরের স্থায়ী ক্ষতি:
অনবরত ডেস্কে বসে কাজ করলে মেরুদণ্ড, ঘাড় ও কোমরের ওপর অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হয়। এটি পরবর্তীতে সাইয়াটিকা, ডিস্ক প্রোল্যাপ্স এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যাক পিনের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
২. বসে থাকা কি সত্যিই ধূমপানের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর?
কথাটির পেছনের আসল বার্তাটি বোঝা জরুরি। ধূমপানে সরাসরি ক্ষতিকর নিকোটিন ও কার্সিনোজেন পেটে যায়, যা সরাসরি ক্যানসার ও ফুসফুসের পচন ঘটায়। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ বসে থাকাকে ধূমপানের সাথে তুলনা করার মূল কারণ হলো এর ‘নীরব ও সার্বজনীন নীরব প্রভাব’।
- সার্বজনীন প্রভাব: ধূমপান সবাই করেন না, কিন্তু বিশ্বের প্রায় ৮০-৯০% মানুষ প্রতিদিন দীর্ঘ সময় বসে কাজ করেন। ফলে পরোক্ষভাবে স্থূলতা, হৃদরোগ ও অকালমৃত্যুর চালিকাশক্তি হিসেবে বসে থাকা ধূমপানের চেয়েও বড় মহামারীর রূপ নিয়েছে।
- ব্যায়ামেও পুরোপুরি না কমা ঝুঁকি: চমকপ্রদ তথ্য হলো, দিনে ১ ঘণ্টা ব্যায়াম করলেও বাকি ৮-৯ ঘণ্টা একটানা বসে থাকার ক্ষতিকর প্রভাব পুরোপুরি দূর হয় না!
৩. বসে কাজ করার ক্ষতিকর প্রভাব কমানোর সহজ উপায়
- ২০-৩০ মিনিটের নিয়ম: প্রতি আধ ঘণ্টা পর পর চেয়ার ছেড়ে উঠুন। মাত্র ২ মিনিটের জন্য হেঁটে আসুন বা একটু স্ট্রাচিং করুন।
- স্ট্যান্ডিং ডেস্ক ও অ্যাক্টিভ সিটিং: কাজের ফাঁকে হেঁটে হেঁটে ফোনে কথা বলুন কিংবা কাজের মাঝে কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে কাজ করার অভ্যাস তৈরি করুন।
- পর্যাপ্ত জল পান: বেশি করে জল পান করলে স্বাভাবিকভাবেই আপনাকে ঘন ঘন উঠতে হবে, যা আপনার হাঁটাচলার সুযোগ করে দেবে।
"Sitting is the new smoking" বাক্যটি কোনো বাড়াবাড়ি নয়, বরং মানবসমাজকে পক্ষাঘাত ও হৃদরোগের হাত থেকে বাঁচাতে এক বড় সতর্কবার্তা। তাই কেবল ব্যায়ামের ওপর ভরসা না রেখে সারাদিন নিজেকে সক্রিয় ও সচল রাখাই সুস্থ জীবনের আসল চাবিকাঠি।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


