নতুন বছরের সংকল্প কেন ক’দিনেই ভেস্তে যায়? ইচ্ছাশক্তির খামতি নয়, স্নায়ুবিজ্ঞানে লুকিয়ে আসল রহস্য

‘নতুন বছর, নতুন আমি’—এই বহুল প্রচলিত বাক্যটি জীবনের মোড় ঘোরানোর এক বিশাল সুযোগ মনে হলেও বাস্তবে কেন অধিকাংশ মানুষের সংকল্প ভেস্তে যায়?

Published on: Aug 31, 2026, 18:18:28 IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

প্রতি বছর জানুয়ারি মাস ঘনিয়ে আসলেই বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ নিজেদের কাছে একগুচ্ছ নতুন প্রতিশ্রুতি বা সংকল্প বানান। এই বছর নিয়ম করে জিমে যাওয়া হবে, মন দিয়ে বই পড়া হবে, খরচে লাগাম টেনে সঞ্চয় বাড়ানো হবে, অহেতুক দুশ্চিন্তা কমাবে এবং অবশেষে নিজের সেরা রূপটি সকলের সামনে তুলে ধরা হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জানুয়ারি শেষ হতে না হতেই এই শপথগুলোর বড় অংশই কর্পূরের মতো উবে যায়।

নতুন বছরের সংকল্প কেন ক’দিনেই ভেস্তে যায়? স্নায়ুবিজ্ঞানে লুকিয়ে আসল রহস্য
নতুন বছরের সংকল্প কেন ক’দিনেই ভেস্তে যায়? স্নায়ুবিজ্ঞানে লুকিয়ে আসল রহস্য

‘নতুন বছর, নতুন আমি’—এই বহুল প্রচলিত বাক্যটি জীবনের মোড় ঘোরানোর এক বিশাল সুযোগ মনে হলেও বাস্তবে কেন অধিকাংশ মানুষের সংকল্প ভেস্তে যায়? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে কোনো মানসিক দুর্বলতায় নয়, বরং মানুষের মস্তিষ্কের অদ্ভুত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বা ‘নিউরোপ্লাস্টিসিটি’ (Neuroplasticity)-র বৈজ্ঞানিক নিউরোসায়েন্সে।

১ জানুয়ারি ও নতুন শুরুর মনস্তাত্ত্বিক ছক

ক্যালেন্ডারের একটি নতুন বছর বা ১ জানুয়ারি তারিখটির মধ্যে এক বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক শক্তি কাজ করে। তারিখের এই পরিবর্তন মানুষের মনে একটি নতুন সাদা খাতার অনুভূতি তৈরি করে, যা আমাদের বিশ্বাস করাতে শুরু করে যে তারিখ বদলানোর সাথে সাথে আমরাও রাতারাতি বদলে যেতে পারব।

শুরুর দিকে যখন কাজের প্রতি প্রেষণা বা ‘মোটিভেশন’ উঁচুতে থাকে, তখন নতুন এই রুটিনটি বেশ রোমাঞ্চকর মনে হয়। কিন্তু ফেব্রুয়ারি বা মার্চ আসতে না আসতেই উৎসাহের ভাটা পড়ে এবং আমাদের অলক্ষে সেই পুরোনো অভ্যাসগুলো আবার ডালপালা মেলে ফিরে আসে। বিষয়টিকে বেশিরভাগ মানুষ নিজেদের ইচ্ছাশক্তি (Willpower) বা নিয়মানুবর্তিতার অভাব বলে মনে করেন। কিন্তু নিউরোসায়েন্স বলছে, আসল সমস্যা আমাদের ইচ্ছাশক্তির ঘাটতি নয়; সমস্যা হলো আমাদের আচরণের পরিবর্তন কীভাবে কাজ করে, সেই বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াটিকে না বোঝা।

নিউরোপ্লাস্টিসিটি: মস্তিষ্ক যেভাবে নিজেকে বদলায়

বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল যে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মস্তিষ্কের গঠন একবার তৈরি হয়ে গেলে তা আর পরিবর্তিত হয় না। তবে আধুনিক গবেষণা প্রমাণ করেছে যে জীবনের যেকোনো বয়সে মানব মস্তিষ্ক নিজের স্নায়বিক গঠন বদলে ফেলতে পারে। স্নায়ুতন্ত্রের এই রূপান্তরযোগ্য ক্ষমতাই হলো ‘নিউরোপ্লাস্টিসিটি’।

মস্তিষ্ক কিন্তু নিজে থেকে কোনো ‘ভালো অভ্যাস’ কিংবা ‘বাজে অভ্যাসের’ পার্থক্য বোঝে না; এটি কেবল বারবার ঘটে চলা অভিজ্ঞতার ছকে নিজেকে অভ্যস্ত করে তোলে। আপনি যদি নিয়মিত বাদ্যযন্ত্র বাজানো অনুশীলন করেন, মস্তিষ্ক সেই নির্দিষ্ট স্নায়ুতন্ত্রের পথকে শক্তিশালী করে তোলে। একইভাবে প্রতি মুহূর্তে ফোন চেক করার অভ্যাস থাকলে মস্তিষ্ক সেই নোটিফিকেশন কেন্দ্রিক মনোযোগে মানিয়ে নেয়।

একটি ঘন জঙ্গলের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে যেমন পথ তৈরি হয় এবং সেই পথে হাঁটা সহজ হয়ে যায়, মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্কও ঠিক একইভাবে কাজ করে। তাই নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে পুরোনো প্রতিষ্ঠিত অভ্যাসকে রাতারাতি বদলে ফেলা এত কঠিন ঠেকে।

স্বয়ংক্রিয় অভ্যাস ও পূর্বানুমানের খেলা

অভ্যাসের প্রধান কাজ হলো কোনো চেনা কাজের জন্য মস্তিষ্কের সচেতন চিন্তাভাবনার পরিশ্রম কমিয়ে নেওয়া। ব্রাশ করা বা প্রতিদিনের চেনা কাজগুলো আমরা চিন্তা না করেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে করে ফেলতে পারি। ঠিক একই স্বয়ংক্রিয়তা তৈরি হয়ে যায় খারাপ অভ্যাসের ক্ষেত্রেও। যেমন—একঘেয়ে লাগলেই ফোন স্ক্রোল করা, মানসিক চাপে স্ন্যাক্স খাওয়া বা রাত জেগে ফোন ঘাটা।

মস্তিষ্ক কেবল প্রাপ্ত সংকেতে সাড়া দেয় না; অতীতের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি সম্বন্ধে প্রতিনিয়ত পূর্বানুমান করতে থাকে। কাজ ফেলে রাখার পুরোনো অভ্যাস থাকলে নতুন কোনো কাজ সামনে এলেই মস্তিষ্ক অস্বস্তি তৈরি করে। সুতরাং, আপনার অভ্যাস বদলাতে হলে মস্তিষ্কের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই অতীত পূর্বানুমান এবং অভিজ্ঞতার প্রমাণকেই পাল্টে দিতে হবে।

আত্মপরিচয় (Identity) ও অভ্যাসের মেলবন্ধন

কোনো অভ্যাস বদলাতে হলে আমাদের আত্মপরিচয়ের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা অত্যন্ত জরুরি। মানুষ কেবল লক্ষ্যের পেছনে ছোট না, বরং নিজেকে নিয়ে নানা বিশ্বাস পোষণ করে—যেমন "আমি সকালে উঠতে পারি না" বা "আমার দ্বারা অংক হবে না"।

তবে মুখে কেবল "আমি সুশৃঙ্খল" বললেই কিন্তু মস্তিষ্ক তা মেনে নেয় না। আপনার আচরণই হলো নতুন আত্মপরিচয়ের মূল দলিল। নিজের কাছে দেওয়া ছোট ছোট কথা রাখা—যেমন অন্তত ১০ মিনিট হাঁটা, ৩ ঘণ্টার জায়গায় মাত্র ৫ পৃষ্ঠা বই পড়া বা ১টি প্যারাগ্রাফ লিখে ফেলা। ছোট এই পদক্ষেপগুলো বারবার জমতে জমতে মস্তিষ্কে প্রমাণ তৈরি করে এবং সময়ের সাথে সাথে নিজের প্রতি বিশ্বাস ও পুরোনো আত্মপরিচয় বদলে যেতে শুরু করে।

মোটিভেশন নয়, ধারাবাহিকতা ও পরিবেশ নিয়ন্ত্রণই চাবিকাঠি

অভ্যাস গড়ার ক্ষেত্রে ২১ দিনের প্রচলিত কথাটি কোনো বৈজ্ঞানিক নিয়ম নয়; ব্যক্তি ও কাজের ধরন ভেদে এই সময় আলাদা হতে পারে। হঠাৎ আসা অতিরিক্ত প্রেষণা বা ‘মোটিভেশনের’ ঝোঁকে ২ সপ্তাহ মারাত্মক পরিশ্রম করে ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে, কম পরিশ্রমে মাসের পর মাস কাজ চালিয়ে যাওয়া অনেক বেশি ফলদায়ক।

ইচ্ছাশক্তির ওপর ভরসা না করে চারপাশের পরিবেশ সাজানো অভ্যাস বদলের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। আচরণবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ঘর্ষণ’ বা ‘ফ্রিকশন’ নিয়ন্ত্রণ করা। বই পড়ার অভ্যাস করতে চাইলে ফোনটি দূরে রেখে বইটিকে চোখের সামনে তুলে রাখুন। ভালো কাজ শুরু করার ধাপ সহজ করুন আর খারাপ কাজের ক্ষেত্রে সামান্য জটিলতা তৈরি করে দিন।

একই সাথে, মস্তিষ্কের নতুন শিক্ষাকে স্থায়িত্ব দিতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম। কারণ ঘুম ও বিশ্রাম কাজের বিপরীত আলসেমি নয়; এটি মস্তিষ্কের শেখার ও অভিযোজনের এক অনিবার্য জৈবিক প্রক্রিয়া।

ক্যালেন্ডারের ১ জানুয়ারি কখনোই রাতারাতি আমাদের মস্তিষ্ক বদলে দিতে পারে না। তাই সংকল্প বা রেজোলিউশনের নাম "নতুন বছর, নতুন আমি" না রেখে হওয়া উচিত—"নতুন বছর, নতুন প্রমাণ"। প্রতিদিনের ছোট এক পদক্ষেপ, পরিবেশের সামান্য পরিবর্তন ও ধৈর্য ধরে করা অনুশীলনের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে জীবন বদলের আসল পথ তৈরি হয়।