অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স কি মাঝপথেই থামিয়ে দিচ্ছেন? ডেকে আনছেন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের ভয়াবহ বিপদ
ওষুধ খাওয়া শুরু করার দু-তিন দিনের মাথায় একটু ভালো বোধ করলেই অনেকে নিজ থেকেই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া বন্ধ করে দেন। আবার অনেকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ দোকান থেকে নিজের ইচ্ছামতো অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া শুরু করেন।
শরীর খারাপ হলে বা ব্যাকটেরিয়ার মারাত্মক সংক্রমণ ঘটলে চিকিৎসকরা প্রায়শই অ্যান্টিবায়োটিক (Antibiotic) খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। সময়মতো ও নিয়ম মেনে সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক খেলে যেকোনো মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন থেকে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা সম্ভব। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেকেরই একটি ভয়ঙ্কর প্রবণতা দেখা যায়—অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স শেষ না করা।

ওষুধ খাওয়া শুরু করার দু-তিন দিনের মাথায় একটু ভালো বোধ করলেই অনেকে নিজ থেকেই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া বন্ধ করে দেন। আবার অনেকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ দোকান থেকে নিজের ইচ্ছামতো অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া শুরু করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র মতে, অ্যান্টিবায়োটিকের চিকিৎসায় সামান্য এই অনিয়ম মানবদেহে ডেকে আনছে 'অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স' (AMR - Antimicrobial Resistance) বা সুপারবাগ তৈরির মারাত্মক ভয়াবহ ঝুঁকি।
অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার আগে কোন কোন বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি এবং সঠিক নিয়ম না মানলে শরীরে ঠিক কী কী ক্ষতি হতে পারে—তা নিয়ে একটি বিস্তারিত চিকিৎসা সংক্রান্ত সচেতনতামূলক প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।
১. কোর্স মাঝপথে থামিয়ে দিলে শরীরে ঠিক কী ঘটে?
যখন চিকিৎসক আপনাকে ৫ বা ৭ দিনের অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স দেন, তখন তার মূল লক্ষ্য থাকে শরীরের সমস্ত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া পুরোপুরি ধ্বংস করা।
- ব্যাকটেরিয়া শক্তিশালী হয়ে ওঠা: প্রথম ২-৩ দিনে তুলনামূলক দুর্বল ব্যাকটেরিয়াগুলো মারা যায়, ফলে আমরা শারীরিকভাবে কিছুটা সুস্থ বোধ করি। কিন্তু শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়াগুলো তখনও শরীরে টিকে থাকে।
- রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার জন্ম: মাঝপথে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিলে বেঁচে থাকা ব্যাকটেরিয়াগুলো ওষুধটির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করে ফেলে। পরবর্তীতে একই অ্যান্টিবায়োটিক খেলে তা আর ওই ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করতে পারে না।
- ভবিষ্যতের জটিলতা: এর ফলে ভবিষ্যতে সাধারণ ইনফেকশন হলেও সাধারণ কোনো অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। তখন আরও শক্তিশালী এবং ব্যয়বহুল প্রোটোকলের সাহায্য নিতে হয়, যা শরীরের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
২. অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার আগে যেসব বিষয়ে খেয়াল রাখা বাধ্যতামূলক
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনোই নয় (No Self-medication): সর্দি, কাশি, সাধারণ ফ্লু বা জ্বর হলে অনেকেই নিজের মনমতো বা ফার্মেসির পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া শুরু করেন। মনে রাখবেন, সাধারণ ঠান্ডা-লাগা বা ফ্লু হয় ভাইরাস (Virus) দিয়ে, যার ওপর অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই। অ্যান্টিবায়োটিক কেবল ব্যাকটেরিয়া (Bacteria) মারতে কাজ করে। অনাবশ্যক অ্যান্টিবায়োটিক খেলে শরীরের প্রয়োজনীয় ‘ভালো ব্যাকটেরিয়া’ নষ্ট হয়ে যায়।
- কোর্স সম্পূর্ণ শেষ করা (Complete the Full Course): চিকিৎসক যত দিনের কোর্স (৩ দিন, ৫ দিন বা ৭ দিন) দেবেন, ঠিক তত দিনই ওষুধ চালিয়ে যেতে হবে। শরীরে উপসর্গ পুরোপুরি মিলিয়ে গেলেও ডাক্তারের নির্দিষ্ট করা শেষ দিন পর্যন্ত ওষুধ খাওয়া বাধ্যতামূলক।
- সময়সূচি কড়াভাবে মেনে চলা (Maintain Fixed Timings): অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা নির্ভর করে রক্তে এর নির্দিষ্ট মাত্রার ওপর। যদি ৮ ঘণ্টা পর পর ওষুধ খাওয়ার নিয়ম থাকে, তবে প্রতি ৮ ঘণ্টা অন্তরই তা খেতে হবে। সময় এদিক-ওদিক হলে ওষুধের প্রভাব কমে যায় এবং ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার সুযোগ পায়।
- খাবারের সাথে সম্পর্কের খেয়াল রাখা: কিছু অ্যান্টিবায়োটিক খালি পেটে খেতে হয়, আবার কিছু খাবার খাওয়ার পর। বিশেষ করে দুগ্ধজাত খাবার (দুধ, দই, ছানা) বা ক্যাফেইনের সাথে নির্দিষ্ট কিছু অ্যান্টিবায়োটিক খেলে তার শোষণক্ষমতা কমে যায়। তাই ওষুধ খাওয়ার সময় চিকিৎসকের থেকে সঠিক নিয়ম জেনে নেওয়া জরুরি।
- অ্যান্টাডাসিড বা অন্যান্য ওষুধের সাথে বিরতি রাখা: গ্যাসের ওষুধ বা কোনো এন্টাসিড অ্যান্টাসিড সিরাপের সাথে সরাসরি অ্যান্টিবায়োটিক খেলে তার কার্যকারিতা নষ্ট হতে পারে। দুটি ওষুধের মধ্যে অন্তত ১ থেকে ২ ঘণ্টার ব্যবধান রাখা উচিত।
- পুরনো বা অন্যের ওষুধ ব্যবহার না করা: পরিবারের অন্য কারো একই উপসর্গ থাকলে বা আপনার কাছে আগের কোনো অসুখের পুরোনো অ্যান্টিবায়োটিক বেঁচে থাকলে তা কখনোই নিজের মনমতো খাবেন না। কারণ এক এক ধরণের সংক্রমণের জন্য আলাদা অ্যান্টিবায়োটিক ও আলাদা ডোজের প্রয়োজন হয়।
৩. অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার সময় স্ক্যাল্প ও পেটের যত্ন
অ্যান্টিবায়োটিক ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার সাথে সাথে পেটের প্রয়োজনীয় বা ভালো ব্যাক্টেরিয়া (Gut Microbes)-কেও ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে অনেকের ডায়রিয়া, গ্যাসের সমস্যা বা অম্বল দেখা দেয়।
- অ্যান্টিবায়োটিক চলার সময় ও তার পরে দই, ইসবগুল, ঘোল বা প্রোবায়োটিক (Probiotic) জাতীয় খাবার খাওয়া উচিত।
- প্রচুর পরিমাণে জল পান করা জরুরি, যাতে ওষুধের মেটাবোলাইটস শরীর থেকে সহজে বেরিয়ে যেতে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিক আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক অলৌকিক আবিষ্কার, কিন্তু এর অনিয়ন্ত্রিত ও অসচেতন ব্যবহার এই ওষুধকেই কার্যহীন করে তুলছে। সামান্য সচেতনতা ও চিকিৎসকের নির্দেশ শতভাগ মেনে চলাই পারে আপনাকে ও আপনার পরিবারকে যেকোনো মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


