মুখের ভিতর কামড় পড়ে রক্তপাত হলে চিনি দিতে বলে কেন? কতটা নিরাপদ এই ঘরোয়া টোটকা
ক্ষতের ওপর সরাসরি চিনি দিলে কেন যন্ত্রণার উপশম হয় বা রক্ত পড়া বন্ধ হয়? নাকি চিনি দেওয়া কেবলই এক বহুল প্রচলিত কুসংস্কার? মুখের ভেতরের ক্ষত নিরাময়ে চিনির এই ব্যবহার কতটা বৈজ্ঞানিক? জেনে নিন।
খাবারের টেবিলে অসাবধানতাবশত জিভ বা গালের ভেতরের নরম মাংসে নিজেরই দাঁতের তীব্র কামড় লাগেনি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। কামড় লাগার সাথে সাথেই মুখে এক তীব্র যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতির সৃষ্টি হয় এবং অনেক সময় ক্ষতস্থান থেকে রক্তপাত হতে শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের মা-ঠাকুমারা কিংবা বয়স্করা সাথে সাথে এক চিমটি চিনি বা গুড় মুখে ক্ষতস্থানে চেপে ধরে রাখার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, ক্ষতের ওপর সরাসরি চিনি দিলে কেন যন্ত্রণার উপশম হয় বা রক্ত পড়া বন্ধ হয়? নাকি চিনি দেওয়া কেবলই এক বহুল প্রচলিত কুসংস্কার? মুখের ভেতরের ক্ষত নিরাময়ে চিনির এই ব্যবহার কতটা বৈজ্ঞানিক, এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিচারে কতটা নিরাপদ এবং এর সঠিক বিকল্প ব্যবস্থা কী হওয়া উচিত— জেনে নিন।
১. মুখে কামড় পড়লে কেন চিনি দিতে বলা হয়? পেছনের আসল বিজ্ঞান
ক্ষতস্থানে চিনি প্রয়োগের ঘটনাটি কেবল লোককথা নয়, এর পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু বৈজ্ঞানিক ও জৈবিক কারণ:
ক) অসমোসিস (Osmosis) এবং ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস: চিনি বা সুক্রোজের (Sucrose) প্রধান গুণ হলো এটি আর্দ্রতা শুষে নেয়। যখন ক্ষতের ওপর ঘন চিনি চেপে রাখা হয়, তখন বিজ্ঞানসম্মত ‘অসমোসিস’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চিনি ক্ষতস্থানের সমস্ত জল বা আর্দ্রতা শুষে নেয়। ব্যাকটেরিয়া ও ক্ষতিকর জীবাণু বেঁচে থাকার জন্য জলের প্রয়োজন। আর্দ্রতা হারিয়ে গেলে ক্ষতস্থানে ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায় এবং জায়গাটি প্রাকৃতিক উপায়ে জীবাণুমুক্ত বা স্টেরিলাইজ হতে শুরু করে।
খ) এন্ডোরফিন হরমোন ক্ষরণ ও যন্ত্রণা হ্রাস: মুখে চিনি দিলে জিভের মিষ্টি স্বাদগ্রহণকারী সংবেদনশীল স্নায়ুগুলো সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে। মস্তিষ্কে হঠাৎ মিষ্টির অনুভূতির সংকেত পৌঁছালে ব্রেন ‘এন্ডোরফিন’ (Endorphin) নামক এক ধরণের প্রাকৃতিক ব্যথানাশক হরমোন নিঃসরিত করে। এটি কামড় লাগার তীব্র যন্ত্রণার অনুভূতির তীব্রতাকে সাময়িকভাবে কমিয়ে দেয়।
গ) রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করা: ক্ষতস্থানে দানা দানা চিনি চেপে রাখলে তা সাময়িকভাবে রক্তনালীর মুখের ওপর প্রলেপ বা ফিজিক্যাল ব্যারিয়ার তৈরি করে। এর ফলে তরল রক্তের গতি কিছুটা কমে এবং লালার সংমিশ্রণে জমাট বাঁধতে (Blood Clotting) সাহায্য করে।
২. মুখের ক্ষতে চিনি দেওয়া কতটা নিরাপদ? চিকিৎসকদের মতামত
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ডেন্টাল সার্জনদের মতে, এটি একটি সাময়িক ও প্রাকৃতিক ফার্স্ট-এইড বা প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে কাজ করলেও এটি সম্পূর্ণ ঝুঁকিহীন নয়।
- সংক্ষিপ্ত ব্যবহারে নিরাপদ: যদি হঠাৎ তীব্র কামড় লাগে এবং হাতের কাছে কোনো অ্যান্টিসেপ্টিক বা বরফ না থাকে, তবে তাৎক্ষণিক রক্তপাত থামাতে বা ব্যথা কমাতে এক চিমটি চিনি দেওয়া সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে নিরাপদ ও কার্যকর।
- ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি: যাঁরা অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে (Diabetes) ভুগছেন, তাঁদের মুখের ভেতরের রক্তনালী ও লালায় শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। চিনি দিলে রক্তে শর্করা না বাড়লেও মুখ ও মাড়িতে ফাঙ্গাল ইনফেকশন (যেমন—ওরাল ক্যান্ডিডায়াসিস) বা ফাঙ্গাসের আক্রমণ হতে পারে।
- দাঁতের ক্যাভিটি ও ব্যাকটেরিয়ার ভয়: মুখে দীর্ঘক্ষণ চিনি রাখলে দাঁতের ফাঁকে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলো মিষ্টি পেয়ে দ্রুত অম্ল বা অ্যাসিড তৈরি করে, যা পরবর্তীতে দাঁতের এনামেল নষ্ট করে ‘ক্যাভিটি’ বা ডেন্টাল ক্যারিজের সৃষ্টি করতে পারে।
৩. মুখে বা জিভে কামড় পড়লে চিনির চেয়েও উন্নত ৩টি নিরাপদ বিকল্প
- ক) বরফ বা ঠান্ডা জল (Ice Compression): একটি বরফের টুকরো পরিষ্কার কাপড়ে পেঁচিয়ে বা সরাসরি ক্ষতের জায়গায় চেপে রাখুন। বরফের তীব্র ঠান্ডা রক্তনালীকে সংকুচিত (Vasoconstriction) করে দ্রুত রক্ত পড়া বন্ধ করে এবং ফোলা ভাব ও যন্ত্রণাকে অবশ করে দেয়।
- খ) হালকা নুন-জলের কুলকুচি (Warm Salt Water Rinse): এক গ্লাস হালকা গরম জলে আধা চামচ নুন মিশিয়ে কুলকুচি করুন। নুন প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপ্টিক হিসেবে কাজ করে এবং মুখের ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে ক্ষত দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে।
- গ) খাঁটি মধু (Pure Honey): চিনির চেয়েও ক্ষত নিরাময়ে অনেক বেশি কার্যকর ও নিরাপদ হলো খাঁটি মধু। মধুতে প্রাকৃতিক ‘হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড’ ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান থাকে, যা কোনোরূপ সংক্রমণ ছাড়াই জিভ ও গালের ক্ষত দ্রুত সারিয়ে তোলে।
হাতের কাছে অন্য কিছু না থাকলে ক্ষতে এক চিমটি চিনি দেওয়া এক চমৎকার তাৎক্ষণিক ফার্স্ট-এইড। তবে ক্ষতটি যদি গভীর হয়, ২-৩ দিনের মধ্যেও ঘা না শুকায় বা অনবরত রক্ত পড়ে, তবে ঘরোয়া টোটকার ওপর ভরসা না করে দ্রুত একজন ডেন্টাল বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


