টক বা সুস্বাদু খাবার দেখলেই জিভে জল আসে কেন? জানুন এর পিছনে বিজ্ঞানের বিস্ময়কর ব্যাখ্যা
আমাদের মুখের ভেতরে প্রধানত তিন জোড়া প্রধান লালাগ্রন্থি (Salivary Glands) থাকে। সাধারণ অবস্থায় এই গ্রন্থিগুলো মুখকে সিক্ত রাখতে এবং কথা বলতে সাহায্য করার জন্য অল্প পরিমাণে লালা ক্ষরণ করে।
কাঁচা আম, তেঁতুল, আচার কিংবা গোলগাপ্পার নাম শুনলেই বা চোখের সামনে দেখলেই আচমকা মুখে লালা বা জল চলে আসা এক অত্যন্ত পরিচিত অভিজ্ঞতা। কেবল খাবারের গন্ধ নয়, এমনকি কোনো টক খাবারের কথা মনে মনে ভাবলেও বা ছবিতে দেখলেও আমাদের অজান্তেই জিভে জল চলে আসে। এটি কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়, বরং আমাদের স্নায়ুতন্ত্র, মস্তিষ্ক এবং পরিপাকতন্ত্রের এক দারুণ মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরবৃত্তীয় মেলবন্ধন।

কেন টক বা সুস্বাদু খাবার দেখলে আমাদের মুখে এই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং এর পেছনে বিজ্ঞানের কী কী গোপন কারণ লুকিয়ে রয়েছে— জেনে নিন।
আমাদের মুখের ভেতরে প্রধানত তিন জোড়া প্রধান লালাগ্রন্থি (Salivary Glands) থাকে। সাধারণ অবস্থায় এই গ্রন্থিগুলো মুখকে সিক্ত রাখতে এবং কথা বলতে সাহায্য করার জন্য অল্প পরিমাণে লালা ক্ষরণ করে। কিন্তু টক বা সুস্বাদু খাবারের উপস্থিতিতে এই লালা ক্ষরণের পরিমাণ হঠাৎ বহুগুণ বেড়ে যায়। এর পেছনে কাজ করে আমাদের মস্তিষ্কের এক বিশেষ সংকেত ব্যবস্থা।
১. কনডিশন্ড রিফ্লেক্স বা অর্জিত প্রতিবর্ত ক্রিয়া
জীববিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রতিক্রিয়াকে বলা হয় ‘কনডিশন্ড রিফ্লেক্স’ (Conditioned Reflex)। বিখ্যাত রাশিয়ান বিজ্ঞানী ইভান পাভলভ (Ivan Pavlov) প্রথম এই তত্ত্বটি আবিষ্কার করেছিলেন।
আমরা শৈশব থেকেই জানি যে টক খাবার বা খাবারের স্বাদ কেমন হয়। আমরা যখন প্রথমবার তেঁতুল বা কাঁচা আম খাই, তখন মস্তিষ্কে সেই টক স্বাদের স্মৃতি, ঘ্রাণ এবং অভিজ্ঞতার একটি স্থায়ী মানচিত্র বা নিউরাল পাথওয়ে তৈরি হয়ে যায়। পরবর্তীতে যখনই আমরা সেই খাবারটি আবার দেখি বা তার গন্ধ পাই, মস্তিষ্ক সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো স্মৃতি সক্রিয় করে তোলে এবং লালাগ্রন্থিগুলোকে সংকেত পাঠিয়ে সচল করে তোলে।
২. পাচনতন্ত্রকে পূর্বপ্রস্তুতি দেওয়া
জিভে জল আসা আসলে আমাদের শরীরের একটি আগাম প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা। মস্তিষ্ক যখন চোখের দৃষ্টি বা নাকের ঘ্রাণের মাধ্যমে বুঝতে পারে যে সামনে খাবার এসেছে, তখন সে মনে করে খুব শীঘ্রই খাবারটি পাকস্থলীতে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।
খাবার হজম করার প্রধান উপাদান হলো লালা বা লালারস (Saliva)। লালায় থাকে ‘অ্যামাইলেজ’ (Amylase) নামক বিশেষ উৎসেচক বা এনজাইম, যা মুখের ভেতরেই খাবারের শর্করা ভাঙতে শুরু করে। তাই মস্তিষ্ক শরীরকে হজমের জন্য প্রস্তুত করতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে লালা ক্ষরণ শুরু করিয়ে দেয়।
৩. অম্লতা বা অ্যাসিডিটি থেকে মুখের সুরক্ষা
টক জাতীয় খাবারে প্রচুর পরিমাণে সাইট্রিক অ্যাসিড বা টারটারিক অ্যাসিডের মতো প্রাকৃতিক অম্ল থাকে। অতিরিক্ত শক্তিশালী অম্ল মুখের ভেতরের কোমল টিস্যু এবং দাঁতের এনামেলকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। লালা হলো কিছুটা ক্ষারীয় (Alkaline) প্রকৃতির।
যখনই মস্তিষ্ক কোনো টক খাবার দেখতে পায়, তখন অম্লের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দাঁত ও মুখের ভেতরের অংশকে রক্ষা করার জন্য বেশি করে লালা ক্ষরণ করায়, যাতে মুখের ক্ষারীয় ও অম্লীয় ভারসাম্য (pH Balance) বজায় থাকে।
৪. স্বাদের সুবাস ও দৃষ্টিশক্তির প্রভাব
আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়ের মধ্যে চোখ ও নাকের সাথে মস্তিষ্কের টেস্ট সেন্টারের গভীর যোগাযোগ রয়েছে। কেবল খাবারের দৃশ্য বা সুবাস পেলেই মস্তিষ্কের 'হাইপোথ্যালামাস' অংশ সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং লালাগ্রন্থিতে বার্তা পাঠায়। তাই কোনো মুখরোচক টক খাবারের ছবি দেখলেও বাস্তব খাবারের মতোই জিভে জল চলে আসে।
টক খাবার দেখে জিভে জল আসা কেবল মানসিক অনুভূতি বা খাবারের প্রতি লোভ নয়; এটি আমাদের মস্তিষ্কের প্রখর স্মৃতিশক্তি, লালাগ্রন্থির তৎপরতা এবং পরিপাকতন্ত্রের এক অলৌকিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নিদর্শন। বিজ্ঞানের এই অপূর্ব শারীরিক প্রক্রিয়াই আমাদের খাবার খাওয়ার আনন্দকে দ্বিগুণ করে তোলে।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


