ভাত রান্নার আগে চাল ভালো করে ধুয়ে নিতে বলা হয় কেন? এটি না করলে কী হতে পারে

কেবল চালের বাইরের ধূলিকণা বা নোংরা পরিষ্কার করাই কি এর একমাত্র উদ্দেশ্য, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে কোনো গভীর বৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্যগত কারণ?

Published on: Aug 18, 2026, 13:39:50 IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে ভাতের ভূমিকা অপরিহার্য। দুপুরে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত আর ডাল-তরকারি না হলে যেন বাঙালির আত্মাই তৃপ্ত হয় না। রান্নার স্বাদের পাশাপাশি পুষ্টি বজায় রাখতে রান্নাঘরে বিভিন্ন নিয়ম মেনে চলা হয়। যার মধ্যে প্রথম এবং প্রধান ধাপটি হলো—ভাত রান্নার আগে চাল অন্তত দু-তিনবার জল দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নেওয়া।

ভাত রান্নার আগে চাল ভালো করে ধুয়ে নিতে বলা হয় কেন? এটি না করলে কী হতে পারে
ভাত রান্নার আগে চাল ভালো করে ধুয়ে নিতে বলা হয় কেন? এটি না করলে কী হতে পারে

ছোটবেলা থেকেই আমরা মা-ঠাকুমাদের দেখেছি হাঁড়িতে চাল দেওয়ার আগে জল পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত ভালো করে চাল কচলে ধুতে। কিন্তু কেন এই নিয়ম? কেবল চালের বাইরের ধূলিকণা বা নোংরা পরিষ্কার করাই কি এর একমাত্র উদ্দেশ্য, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে কোনো গভীর বৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্যগত কারণ? ভাত রান্নার আগে চাল ধোওয়ার আসল বৈজ্ঞানিক কারণ, চাল না ধুয়ে রান্না করলে শরীরে ঠিক কী ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে এবং চাল ধোওয়ার সঠিক পদ্ধতি কী— জেনে নিন।

১. চাল ধোওয়ার পেছনে লুকিয়ে থাকা ৫টি প্রধান বৈজ্ঞানিক কারণ

ক) অতিরিক্ত স্টার্চ বা মাড় অপসারণ (Starch Removal): চালের দানাগুলোর ওপরে মুক্ত স্টার্চ বা শ্বেতসারের (Surface Starch) একটি প্রলেপ থাকে। চাল না ধুয়ে রান্না করলে এই অতিরিক্ত স্টার্চের কারণে ভাত অত্যন্ত চটচটে, আঠালো এবং গলানো বা ডেলা পাকিয়ে যায়। চাল ভালো করে ধুয়ে নিলে উপরের স্টার্চ ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে যায়, ফলে রান্না করা ভাত হয় একদম ঝরঝরে ও দেখতে আকর্ষণীয়।

খ) ধূলিকণা, পোকা ও রাসায়নিক প্রিজারভেটিভ দূর করা: ধান থেকে চাল তৈরি, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বস্তাবন্দি করা এবং বাজারে বিক্রির সময় চালে প্রচুর পরিমাণে ধুলোবালি, তুষ, সূক্ষ্ম নোংরা এবং ছোট ছোট পোকা মিশে যেতে পারে। এ ছাড়া দোকান বা গুদামে চাল দীর্ঘদিন ভালো রাখতে নানা ধরণের রাসায়নিক প্রিজারভেটিভ বা পাউডার ব্যবহার করা হয়। চাল ধুয়ে নিলে এসব ক্ষতিকর উপাদান সহজেই মুক্ত হয়।

গ) ক্ষতিকর 'আর্সেনিক' দূরীকরণ (Arsenic Reduction): এটি চাল ধোওয়ার সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যগত কারণ। চাল উৎপাদনে ব্যবহৃত মাটি ও ভূগর্ভস্থ জল থেকে প্রাকৃতিকভাবেই চালে প্রাকৃতিকভাবে বিষাক্ত ‘অজৈব আর্সেনিক’ (Inorganic Arsenic) জমতে পারে। আর্সেনিক মানবদেহের জন্য এক মারাত্মক কার্সিনোজেন বা ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ভাত রান্নার আগে চাল ভালো করে ধুয়ে নিলে বা ভিজিয়ে রাখলে চালের ক্ষতিকর আর্সেনিকের মাত্রা প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।

ঘ) মাইক্রোপ্লাস্টিক বা প্লাস্টিকের সূক্ষ্ম কণা মুক্ত করা: বর্তমান যুগে প্লাস্টিকের বস্তায় চাল প্যাকেজিং ও পরিবহন করার কারণে চালের মধ্যে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ (Microplastics) মিশে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে। আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, জল দিয়ে চাল ধোওয়ার ফলে চালের সাথে লেগে থাকা প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা ধুয়ে সাফ হয়ে যায়।

ঙ) হেভি মেটাল বা ভারী ধাতু দূর করা: ফসল ফলানোর সময় চাষে ব্যবহৃত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার থেকে কিছু পরিমাণ মেটাল যেমন—ক্যাডমিয়াম, সীসা (Lead) বা অ্যালুমিনিয়াম চালের ওপর জমতে পারে। ভালো করে জল দিয়ে ধুলে এই বিষাক্ত উপাদানগুলোর তীব্রতা অনেকটাই প্রশমিত হয়।

২. চাল ধোওয়ার সঠিক নিয়ম ও ভিজিয়ে রাখার কৌশল

  • কতবার ধোবেন: যতক্ষণ না চাল ধোওয়া জল পরিষ্কার বা স্বচ্ছ দেখাচ্ছে, ততক্ষণ হালকা হাতে ২ থেকে ৩ বার ধোওয়া উচিত। তবে অতিরিক্ত রগড়ে চাল ধোওয়া ঠিক নয়, কারণ এতে চালের বি-ভিটামিন (যেমন থায়ামিন বা বি১) নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
  • ভিজিয়ে রাখা (Soaking Rice): চাল ধোয়ার পর অন্তত ১৫ থেকে ৩০ মিনিট পরিষ্কার জলে ভিজিয়ে রাখা সবচেয়ে ভালো। এতে চালে থাকা আর্সেনিক আরও বেশি মাত্রায় দূর হয়, চালের এনজাইম সক্রিয় হয় এবং ভাত খুব দ্রুত ও ঝরঝরেভাবে সেদ্ধ হয়।

চাল ধোওয়া কেবল রান্নাঘরের কোনো সাধারণ ঐতিহ্য বা অভ্যাস নয়; এটি ভাতকে সুস্বাদু, ঝরঝরে ও সম্পূর্ণ বিষমুক্ত করার এক জরুরি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। তাই পরিবারকে ক্যানসার ও অন্যান্য শারীরিক ঝুঁকি থেকে মুক্ত রাখতে প্রতিবার ভাত রান্নার আগে চাল ভালো করে ধুয়ে ও ভিজিয়ে রান্না করুন।

  • Suman Roy
    ABOUT THE AUTHOR
    Suman Roy

    সুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More