TMC rebel MPs: দলত্যাগ বিরোধী আইন: তৃণমূলের বিদ্রোহীদের নতুন ঠিকানা NCPI, জানুন সংযুক্তির নেপথ্য রসায়ন
TMC rebel MPs: সংবিধানের দশম তফসিলের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনও রাজনৈতিক দল অন্য দলের সঙ্গে একীভূত হলে এবং সেই সিদ্ধান্তকে আইনসভার অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য সমর্থন করলে, সংশ্লিষ্ট সাংসদ বা বিধায়করা অযোগ্য ঘোষিত হবেন না। এই বিধানটি প্রকৃত রাজনৈতিক সংযুক্তিকরণকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য রাখা হয়েছিল।
TMC rebel MPs: পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে হারের পর থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসে ফাটল দেখা দেয়। বিধানসভার পর সেই ভাঙন সরাসরি আঘাত হানে লোকসভাতেও। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের 'বিদ্রোহী' ২০ সংসদ সদস্য রবিবার নয়া দিল্লিতে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে জানিয়েছেন, তাঁরা এবার লোকসভায় আলাদা আসন নিয়ে বসতে চান। তবে তৃণমূল বা নতুন তৃণমূলের নাম নিয়ে বসা যে সম্ভব হবে না, সেই ইঙ্গিত পাওয়ার পর ২০ 'বিদ্রোহী' সাংসদ ত্রিপুরা-ভিত্তিক স্বল্প-পরিচিত দল 'ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া' (এনসিপিআই)-র সঙ্গে মিশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তবে ঘটনা হলো, জাতীয় তো বটেই, রাজ্য রাজনীতির মঞ্চেও কার্যত অখ্যাত এই এনসিপিআই–এর জন্ম ২০২২ সালে, পশ্চিমবঙ্গেরই হাওড়ায়। সংসদীয় রাজনীতিতে তাদের যোগদানের ইতিহাস বলতে ২০২৩ ও ২০২৪–এ ত্রিপুরায় কয়েকটি আসন থেকে বিধানসভা ও লোকসভা ভোটে লড়াই। দলটির কোনও বিধায়ক বা সাংসদ নেই। এবার লোকসভায় ২০ জন সংসদ সদস্য পেয়ে দেশের অখ্যাত এক রাজনৈতিক দল এখন ভারতের পঞ্চম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটা বড় অংশের দাবি, অদূর ভবিষ্যতে সম্ভাব্য আইনি জটিলতা এড়ানোর জন্যই তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদরা রবিবার এই ‘মাস্টারস্ট্রোক’ দিয়েছেন-যেখানে দলত্যাগ বিরোধী আইন অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পথ না থাকে। মাস দু’য়েক আগে রাঘব চাড্ডা-সহ আম আদমি পার্টির সাত জন রাজ্যসভা সাংসদ বিজেপিতে যেভাবে মিশে গিয়েছিলেন, ঠিক সেই পদ্ধতি মেনেই এনসিপিআই-এর সঙ্গে ‘মার্জার’ করেছে তৃণমূলের লোকসভার বিদ্রোহী সাংসদ ব্লক।
কী বলছে দলত্যাগ বিরোধী আইন?
কোনও একটি রাজনৈতিক দলের আইনসভার (এক্ষেত্রে সংসদের) মোট নির্বাচিত সদস্য বা সাংসদদের মধ্যে কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য যদি অন্য কোনও দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বা মিশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তবেই সেটি বৈধ ‘সংযুক্তিকরণ’ বা ‘মার্জার’ হিসেবে গণ্য হবে। সংবিধানের দশম তফসিলের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনও রাজনৈতিক দল অন্য দলের সঙ্গে একীভূত হলে এবং সেই সিদ্ধান্তকে আইনসভার অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য সমর্থন করলে, সংশ্লিষ্ট সাংসদ বা বিধায়করা অযোগ্য ঘোষিত হবেন না। এই বিধানটি প্রকৃত রাজনৈতিক সংযুক্তিকরণকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য রাখা হয়েছিল। তবে ছোট ছোট গোষ্ঠীতে ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা রুখতেই আগের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদটি ২০০৩ সালের ৯১তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাতিল করা হয়। আগে এক-তৃতীয়াংশ সদস্য আলাদা হলে তা বৈধ বিভাজন হিসেবে গণ্য হতো। ফলে বর্তমানে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনে বৈধ সংযুক্তিকরণই দলত্যাগ বিরোধী আইনের একমাত্র ব্যতিক্রম হিসেবে স্বীকৃত।
২০ জন সাংসদ, একটি অখ্যাত দল
রবিবার সকালে অবশ্য এমন ‘কৌশলগত আশ্রয়’–এর কোনও আঁচ ছিল না কালীঘাটের কাছে। দুপুরে দিল্লি যাওয়ার আগে সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার জানিয়েছিলেন, তাঁরা একসঙ্গে ২০ থেকে ২২ জনও থাকতে পারেন। যদিও রবিবার বিকেলে দিল্লি পৌঁছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বিজেপি থেকে বাংলার দায়িত্বপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে যখন বিদ্রোহী সাংসদরা বৈঠকে বসেন, তখন সেখানে উপস্থিতি ছিল ১৮ জনের। ফ্লাইট লেট- এই কারণে বৈঠকে ছিলেন না দুই তৃণমূল সাংসদ খলিলুর রহমান এবং আবু তাহের খান৷ পরে তাঁরা দিল্লিতে পৌঁছন এবং বিদ্রোহী ব্লকের ২০ জন সাংসদ একজোট হয়ে লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে এনসিপিআই-তে মিশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সম্বলিত চিঠি তাঁর হাতে তুলে দেন৷ তবে ত্রিপুরার রাজনৈতিক মহলে খুব একটা পরিচিত নাম নয় ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (এনসিপিআই)। এমনকী রাজ্যের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকের কাছেও দলটির সাংগঠনিক কাঠামো বা নেতৃত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য নেই। তবে ২০২৩ সালের ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে এই দলের উপস্থিতি দেখা গিয়েছিল। ধলাই জেলার চৌমানু এবং উনকোটি জেলার কৈলাসহর-এই দুই কেন্দ্রে এনসিপিআই প্রার্থী দেয়। যদিও নির্বাচনী লড়াইয়ে দলটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেনি। দুই কেন্দ্র মিলিয়ে তাদের প্রার্থীরা মোট ৮২২টি ভোট পান, যা মোট ভোটের মাত্র ০.০৩ শতাংশ।
এই ভাঙনের ফলে লোকসভায় বিরোধী শিবিরের বেঞ্চ যে অনেকটাই হালকা হতে চলেছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। ২৮ থেকে এক ধাক্কায় ৮-এ নেমে আসায় লোকসভায় তৃণমূলের দর কষাকষির ক্ষমতা অনেকটাই কমে গেল। অন্যদিকে, রাজ্যসভায় ইতিমধ্যেই দলটির আসন সংখ্যা ১৩ থেকে কমে ১০-এ নেমে এসেছে। এর বিপরীতে লোকসভায় এনডিএ-র আসন সংখ্যা ২৯৪ থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৩১৪-তে, যদিও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন থেকে তারা তখনও ৪৬টি আসনে পিছিয়ে থাকবে। তবে উচ্চকক্ষ বা রাজ্যসভায় সেই ম্যাজিক সংখ্যা ছুঁতে এই শাসক জোটের আর মাত্র আটটি আসনের প্রয়োজন পড়বে। অন্যদিকে, বিদ্রোহী শিবিরের এই চালের পাল্টা হিসেবে ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের আইনি ব্যাখ্যাকে হাতিয়ার করেছে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। রবিবারই লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করেন তৃণমূল সাংসদ কীর্তি আজাদ এবং সাগরিকা ঘোষ। তাঁরা দলের সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি চিঠি স্পিকারের হাতে তুলে দেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, 'আইনসভায় কোনও দলের অস্তিত্ব তৈরি হয় মূল রাজনৈতিক দলটির মাধ্যমে। রাজনৈতিক দলের অবাধ্য হয়ে কোনও সদস্য বা সদস্য গোষ্ঠী নিজেদের স্বাধীন দল হিসেবে দাবি করতে পারেন না।'
তৃণমূলের মূল যুক্তি হলো, দলত্যাগ বিরোধী আইনের মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে ‘পলিটিক্যাল পার্টি’ বা মূল রাজনৈতিক দলের ওপর, ‘লেজিসলেচার পার্টি’ বা আইনসভার সদস্যদের ওপর নয়। ফলে এই ২০ জন সাংসদ নিজেদের ইচ্ছামতো অন্য দলের সঙ্গে মিশে যাওয়ার দাবি করলেই তা স্পিকারের সরাসরি মেনে নেওয়া উচিত নয়। তৃণমূলের সংসদীয় দল ভাঙার এই কৌশলকে তীব্র কটাক্ষ করে কপিল সিব্বল সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, 'তৃণমূলের বিদ্রোহীরা ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন পার্টির সঙ্গে মিশে যাবে! ভারতীয় গণতন্ত্র এখন ‘থিয়েটার অফ দ্য অ্যাবসার্ড’ (প্রহসনের থিয়েটার) হয়ে উঠেছে। একটা চরম রসিকতা!' আইনজীবীদের অনেকের মতে, দলত্যাগ বিরোধী আইনকে ফাঁকি দিতে বিদ্রোহীরা যেভাবে হাওড়ার এক নামসর্বস্ব নথিভুক্ত দলের সাইনবোর্ড ব্যবহার করছেন, তাকেই ‘অ্যাবসার্ড’ বা অদ্ভুতুড়ে বলে ব্যাখ্যা করেছেন সিব্বল।
আইনি বিতর্ক
আম আদমি পার্টি এবং তৃণমূল কংগ্রেস-উভয় দলের বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে এমন একটি সাংবিধানিক প্রশ্ন, যার স্পষ্ট কোনও মীমাংসা সংবিধানের দশম তফসিলে নেই: অনুচ্ছেদ ৪অনুযায়ী দল মার্জার বা একীভূতকরণের জন্য কী মূল রাজনৈতিক দলটির পক্ষ থেকে বাস্তব কোনও সিদ্ধান্তের প্রয়োজন, নাকি আইনসভায় থাকা দুই-তৃতীয়াংশ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ব্লক বা জোটের সিদ্ধান্তই এর জন্য যথেষ্ট? অনুচ্ছেদ ৪-এর শব্দবন্ধে স্পষ্ট করে ‘মূল রাজনৈতিক দল’-এর উল্লেখ রয়েছে, যার অর্থ হলো সামগ্রিক দলীয় সংগঠন, কেবল কোনও কক্ষে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা নন। অনুচ্ছেদ ৪ এই দুটির মধ্যে একটি কাঠামোগত পার্থক্য রেখা টেনে দিয়েছে: একটি ‘রাজনৈতিক দল’ নির্বাচনে প্রার্থী দাঁড় করায় এবং হুইপ জারি করে; আর ‘লেজিসলেচার পার্টি’ বা সংসদীয় দল হলো নির্বাচনের পর জয়ী হওয়া সেই প্রার্থীদের সমষ্টি। এই দুটিকে যদি একে অপরের পরিপূরক বা সমার্থক হিসেবে গণ্য করা হয়, তবে তার অর্থ দাঁড়াবে-নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যে দলের প্রতীকে বা সমর্থনে জিতে এসেছেন, তাঁদের সেই মূল দলের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করার আইনি অধিকার চলে আসবে, অথচ তাঁরা দলত্যাগ বিরোধী আইন থেকে সম্পূর্ণ সাংবিধানিক সুরক্ষাও দাবি করতে পারবেন।
স্পিকারের ভূমিকা ও আইনি জটিলতা
আপাতত তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের ভাগ্য পুরোপুরি ঝুলে রয়েছে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সিদ্ধান্তের ওপর। এই মার্জার বা একীভূতকরণের দাবিটি খতিয়ে দেখার আগে তিনি প্রথমে ওই ২০ জন সাংসদের স্বাক্ষর যাচাই করবেন। দলত্যাগ বা অযোগ্য ঘোষণার প্রশ্নে স্পিকার-কিংবা আম আদমি পার্টির ক্ষেত্রে সমান্তরাল প্রক্রিয়ায় রাজ্যসভার চেয়ারম্যান হলেন প্রথম সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ। আদালত এই সিদ্ধান্তের আইনি পর্যালোচনা করতে পারে মাত্র। চূড়ান্ত কোনও রায় বা রুলিং না আসা পর্যন্ত এই বিদ্রোহীরা এক অদ্ভুত ও জটিল আইনি দোলাচলের মধ্যে থাকবেন: খাতায়-কলমে তাঁরা এখনও সেই দলেরই সদস্য, যে দলের প্রতীকে বা টিকিটে তাঁরা নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর অর্থ হলো, তাঁরা এখনও তৃণমূলের জারি করা হুইপ মানতে বাধ্য এবং এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে তাঁরা যদি দলের নির্দেশের বিরুদ্ধে ভোট দেন বা কোনও কাজ করেন, তবে তা তাঁদের অযোগ্য প্রমাণের জন্য অতিরিক্ত নতুন ভিত্তি বা কারণ হিসেবে গণ্য হতে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয়, সংবিধানের দশম তফসিলে স্পিকার বা চেয়ারম্যানের জন্য এই ধরনের দলত্যাগ বিরোধী পিটিশনের নিষ্পত্তি করার কোনও সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া নেই। আর এই আইনি ফাঁক বা খামতির কারণেই যে কোনও গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় অধিবেশন চলাকালীন এই ধরনের অস্পষ্টতা বা ধোঁয়াশা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়।
২০০৩ সালে দলত্যাগের আইনটিকে আরও কঠোর করতে যদি ‘স্প্লিট’ বা দল ভাঙার বিধানটি বাতিল করা হয়ে থাকে, তবে ‘মার্জার’ বা একীভূতকরণের এই ব্যতিক্রমী ধারাটিই এখন সংগঠিত দলবদলের প্রধান সুড়ঙ্গ বা রাস্তা হয়ে উঠেছে। গত এপ্রিল মাসে আপ-এর ঘটনাটি ছিল এর প্রথম পরীক্ষা। আর এবার ২০ জন আইনপ্রণেতা, সাংসদহীন একটি দল এবং নেপথ্যে ক্ষমতায় আসার অপেক্ষায় থাকা এনডিএ সরকার-তৃণমূলের এই বর্তমান বিদ্রোহটি নিঃসন্দেহে সেই আইনের আরও এক বড় পরীক্ষা।
E-Paper

